এখন যাও তো মা, আর অশান্তি কোরো না।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। পেটে ধরেছিলুম বলে সেই মায়ায় আসা। নইলে কে বাড়ি বয়ে জুতো খেতে আসে!
কেউ তোমাকে জুতো মারেনি মা, নিজের দোষে তুমিই জল ঘোলা কর।
খুব ভালমানুষের মতো, সব রাগ-টাগ ভুলে জিজিবুড়ি বলল, টাকাটার কথা একটু মনে রাখিস মা। কানু বলেছে না হয় সুদই দেবে। দু হাজার দিবি, দু মাস বাদে আড়াই হাজার ফেরত পাবি। টাকাটাও খাটল, ভাইটারও আয়-পয় হল।
কোণ থেকে ই..ই..ই.. বলে একটা দীর্ঘ শব্দ করল মুক্তা। তারপর বলল, পুলি পিঠের ন্যাজ বেরোবে গো! উনি দেবেন সুদ। খানেকা ঠিকানা নেহি, নও বাজে চান।
জিজিবুড়ি দরজার কাছ থেকে ফিরে বলল, তাতে তোর কী রে বেশে মেয়ে কোথাকার!
শুনলে বউদি! আমি বেশ্যে হলে ও কী?
বাসন্তী তাড়াতাড়ি দুজনের মাঝখানে পড়ে বলল, ওসব কানে তুলিসনি মুক্তা। কাজ করে যা। তুমি এবার বিদেয় হও তো মা।
জিজিবুড়ি চলে যাওয়ার পর বাসন্তী তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাঘরের পাশের গলিটাতে এসে দাঁড়াল। তার চোখ ফেটে জল আসছে। তার মা ওইরকম বটে, কিন্তু একটু কষ্টও তো হয় বাসন্তীর। মা তো লাথি ঝাঁটা খেয়েই ছেলেদের সংসারে পড়ে আছে। জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে।
.
৪৪.
এসব কী এনেছ?
ফলমূল বুড়িমা। সন্দেশও আছে।
অ্যাঁ! ফলমূল! আবার সন্দেশ!
হ্যাঁ গো বুড়িমা, এই যে আপেল, কমলালেবু, আঙুর, সবেদা, বেদানা, কলা। আর এই বাক্সে সন্দেশও আছে।
তা ভাল বাছা। দিয়েছ, দাও। কিন্তু দাম চাইবে না তো! আমার কিন্তু বাপু পয়সা-টয়সা নেই।
আরে না বুড়িমা, পয়সা লাগবে না। এমনিই দিচ্ছি, আজ স্বাধীনতা দিবস তো, তাই।
অ, তাই বলো! আজই তাহলে সেই অনামুখো, সৃষ্টিছাড়া দিন!
আহা, ওরকম করে কি বলতে আছে? আজকের দিনটায় আমাদের দেশ যে স্বাধীন হয়েছিল।
অতশত জানি না বাপু। এক দিন দুপুরে যতুর বাপ এসে ধপ করে দাওয়ায় বসে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে লেগেছিল। অত বড় মানুষটা, জীবনে তার চোখে জল দেখিনি। সেদিন কী হাউ হাউ করে কান্না! তারপর বলল, দেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে গো, এবার পোঁটলা পুঁটলি বাঁধো। দেশ ছাড়তে হবে। ঘরে ঘরে নিশানও তুলেছিল বটে লোকে, বাজি পটকা কম ফাটেনি। কিন্তু আমাদের তাতে কী বলো! স্বাধীন-টাধিন তো বুঝিনি বাবা, শুধু বুঝেছি, কিছু একটা হয়েছে। আমাদের এখন পাততাড়ি গোটাতে হবে।
ওসব অতীতের কথা বলে কী লাভ বুড়িমা? কিছু লোকের কষ্ট হয়েছিল একথা সত্যি। দেশ ভাগ হওয়ায় আমরাও কি দুঃখ পাইনি?
দুঃখের কপাল তো ভগবানের কাছ থেকেই নিয়ে এসেছি, সেজন্য কি আর কাঁদুনি গাইছি? শুধু বলছি, এই দিনটায় কারও ছিল পৌষমাস, কারও সব্বোনাশ। জিনিসপত্র বাঁধাহ্যাঁদা করতে করতেই কিছু লুটপাট হল, কারা যেন এসে চোটপাট করে শাসিয়ে গেল, খবদার ভিটে ছাড়বি না, কিন্তু বাপু, আমরা তো কথাটথা জানি না, আমাদের শুধু প্রাণের ভয়। শুধু প্রাণটুকুরই তো মায়া, কী বলল!
আজকের দিনে ওসব কথা থাক না বুড়িমা।
কেন বাছা, আজকে কি আমাদের মৌনীব্রত? কথা কইতে নেই বুঝি?
না না, তা নয়।
তাহলে একটু বলিই না হয় বাপু। প্রাণটা যে কেমন জিনিস তা কি জানো?
প্রাণের মায়া কার নেই বলো বুড়িমা?
সে বটে। আমাদেরও খুব ছিল। ডাকাতে, গুণ্ডায় ধরলে শুধু হাতে পায়ে ধরে বলেছি, প্রাণে মেরো বাপু। তা মারেনি বলেই তো বেঁচে আছি। বয়সের মেয়েকে টেনে নিয়ে যায়, জোয়ান ছেলেকে বল্লম দিয়ে খোঁচায়, চোখ রাঙিয়ে কতবার টিপছাপ নিয়ে যায়, আমরা কিছু বলিনি বাপু, রুখেও উঠিনি, শুধু ওই প্রাণের ভয়। শেষে সার বুঝেছি কী জানো?
কী বুড়িমা?
যদ্দুর বাপ যেদিন গলায় দড়ি দিল সেদিন হঠাৎ বুঝলুম যা নেই তার আবার মায়া কীসের বলো! আমাদের মোটে প্রাণই নেই, শুধু দেহটা অভ্যাসের বশে চলে। প্রাণ থাকলে সেটা কি এত সহ্য করতে পারত? নাড়ি ধরে যদি দেখ বাছা, দেখবে নাড়ি আমার চলছে না।
না বুড়িমা, তুমি তো দিব্যি বেঁচে আছ!
কী জানি বাপু, দিনকে দিন, রাতকে রাত বলে চিনতেই পারি না। তা বাপু, এই যে এত সুন্দর সুন্দর সব ফল-টল দিলে এসব কি আসল জিনিস?
আসল নয় তো কি নকল বুড়িমা?
কী জানি বাপু, কেষ্টনগরে নাকি মাটি দিয়ে কী সব বানায়, ঠিক আসলের মতো দেখতে। সে জিনিস নয় তো? এই অনেকটা আমাদের মতোই, মানুষের মতো দেখতে, কিন্তু মানুষ নয়।
আহা বুড়িমা, তোমার মাথাটাই গেছে, একটু খেয়েই দেখো না।
না বাছা থাক, দেখনসই জিনিস, একটু বরং দেখি।
.
অ বুড়িমা! বলি ঘুমোচ্ছ নাকি?
তা কে জানে বাছা। চোখ বুজলে কখনও মনে হয় ঘুমোচ্ছি, কখনও মনে হয় মরে গেছি। কোনটা তা বলতে পারি না।
ফলগুলো তো খাওনি দেখছি!
যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ও কি খাওয়ার জিনিস বাপু?
খাওয়ার জিনিস না তো কী?
জন্মে খাইনি। আপেল, আঙুর ওসব কি খায় বাছা?
খায় তো। খেলে শরীর ভাল হয়।
আমার হবে?
হবে না কেন?
মরা জিব বাছা, খেলে আবার ভিরমি খাই কিনা কে জানে। সকালে এক ডেলা পাউরুটি দিয়েছিল, আর দুধ, তা বেশ খেলুম বাছা, অনেকে দুধ মুখে দিয়ে ওয়াক তুলে বলছিল ও নাকি মোটে দুধই নয়, চকখড়ি গুলে নিয়ে এসেছে। তা বাপু, আমার কিন্তু খারাপ লাগেনি। দুপুরে বেশ ভাত দিয়েছিল অনেকটা। সঙ্গে এক টুকরো মাছ আর ডাল। সেও সবাই ছি ছি করছিল, বলছিল মাছ নাকি পচা, ডাল নাকি হলদে জল, ভাতে নাকি গন্ধ, তা বাছা, আমার তো কিছু খারাপ লাগল না।
