না হয় আমাকেই দিলি টাকাটা, গরিব মাকেও তো লোকে দেয় খেতে নাকি?
তেমন মা তো তুমি নও! এতদিন বলিনি, জামাইয়ের হাতে দেবে বলে একটা ফর্দ লিখেছিলাম, তার মধ্যে আফিং-এর কথাটা কে লিখিয়েছে বলতে পারো? নাতিকে তুতিয়ে পাতিয়ে তুমিই লিখিয়েছ। এ কি ভাল?
তোম্বা মুখ করে জিজিবুড়ি বলে, তোকেই বলতুম। তা তখন তুই শীতলাবাড়িতে গিয়েছিলি বলে–
আর মিথ্যে কথা বলে পাপের বোঝা বাড়িও না। টাকাপয়সা আমি আর দিতে পারব না, বলেই দিচ্ছি।
টাকাপয়সা কি তোরই থাকবে ভেবেছিস? ভাগাড়ে তো শকুনের নজর পড়েছে দেখতেই পাচ্ছি। বুদ্ধি থাকলে সাঁট করে দশ বিশ হাজার টাকা সরিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখলেও পারতিস। আখেরে কাজ হত।
তোমার কাছে টাকা রাখা মানে তো সাপের কাছে ব্যাঙ রাখা। আমার তো আর মতিচ্ছন্ন হয়নি! আমার টাকা আমার কাছেই থাকবে। আমার ভালর জন্য ভেবে আর চোখের জল ফেলো না তো।
রান্নাঘরটা মস্ত বড়। তার এক কোণে বসে মুক্তা মশলা বাটছিল। সে সাতে পাঁচে থাকে না। আজ হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে বলল, কেন বাপু রোজ এসে ঘ্যানঘ্যান করো। বাবা কি তেমন লোক?
জিজিবুড়ি ভস্ম করা চোখে মুক্তার দিকে চেয়ে বলল, এঃ, বড় আমার বাবা-উলি এলেন রে! বাঙাল আবার কবে তোর বাবাকেলে বাবা হল শুনি! বাঙাল হল মগেদের দেশের লোক, সাপ ব্যাঙ সব খায়, ওদের বামুন-কায়েত নেই। ছিষ্টিছাড়া জীব। কোন সুবাদে তাকে বাপ ডাকতে যাস শুনি! দেখছিস তো কেমন একে একে ছেলে মেয়ে আমদানি করে ঘট প্রতিষ্ঠা করে রাখছে। এরপর আমার মেয়েটাকে কাঁত করে লাথি মেরে যদি না তাড়ায় তো দেখিস! কপাল খারাপ না হলে, মরতে ওই লোকের সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে দিই! এখন বরাতে কী আছে কে জানে বাবা! আর মেয়েটাও আমার বোকার হদ্দ। নইলে বাঙালের সঙ্গে নাচে! গাল ভরে বাবা ডাকছিস। কোন সগগে তুলবে তোকে ওই ম্লেচ্ছটা শুনি!
মুক্তা তার নিজের মতো করে একটা সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে। রসিক সাহা তাদের বন্ধকী জমি উদ্ধার করে দিয়েছে, তাদের ভাঙা ঘর ছেয়ে দিয়েছে। মুক্তার মা-বাবা এই বুড়ো বয়সে বাঙালের জন্যই একটু সুখে আছে। তার ওপর মুক্তার জন্য পাত্রেরও খোঁজ করছে বাঙাল। বলে রেখেছে বিয়ের সব খরচ তার। কৃতজ্ঞতায় আপনা থেকেই বাবা বলে ডাকে মুক্তা, কেউ শিখিয়ে দেয়নি। আর বাবার প্রতি তার অসম্ভব পক্ষপাত।
জিজিবুড়ির দিকে চেয়ে সে বলল, বাবার মতো মানুষের কুচ্ছো গাইছ, কলিকাল বলে তোমার মুখে পোকা পড়ছে না। বাবার মতো মানুষ বলেই বাবা ডাকি। তাকে ডাকব না তো কি তোমাকে বাবা বলে ডাকব? রোজ এসে এ-বাড়িতে শেয়ালের মতো ঢুকে মেয়ের সংসার ভাঙার চেষ্টা করো, তুমি কেমনধারা মা? নিজের সংসারে তো আগুন লাগিয়ে বসে আছ, সেখানে সুন্দ উপসুন্দের লড়াই হচ্ছে রোজ। সব খবর রাখি।
দ্যাখ মুক্তা, তোর বড় আস্পদ্ধা হয়েছে কিন্তু! চিরটা কাল পরের বাড়ির এঁটো পাত কুড়িয়ে বড় হয়েছিস। তোর এত গুমোর কীসের রে! বলি বাঙালের খুঁটোর জোরে সাপের পাঁচ পা দেখলি নাকি? কার সঙ্গে কইছিস সে খেয়াল আছে?
তা থাকবে না কেন? খুব আছে। তুমি হলে তো বাবুর শাউড়ি। কিন্তু শাউড়ির যা ছিরি দেখছি তাতে ঘেন্না হয় বাপু। মান চাইলে মানী হতে হয়। এ বাড়ির দুধটুকু, সরটুকু, এ বাড়ির নারকোল, সুপুরি কোনটা না হলে তোমার চলে বলো তো! আমরা এঁটো পাত কুড়িয়ে বড় হয়েছি, আর তুমি?
আমাকে খুঁড়ছিস? এ আমার মেয়ের বাড়ি, তা জানিস? আমার হক আছে।
তা আমারই বা হক থাকবে না কেন! আমরা গতরপাত করে খেটে খাই, বুঝলে! তোমার মতো মাগুনে বেওয়া নই। হাতটি তো পেতেই আছ। আবার যারটা খাচ্ছ তার মুন্ডুও পাত করছ।
লহর তুলে হেসে কুটিপাটি হয়ে জিজিবুড়ি বলল, ওলো গতরওয়ালি লো! দেখিস আবার বেশি গতরের গুমোর করিসনি। পেট-টেট বাধিয়ে না বসিস। সোহাগ করে বাপ ডাকছিস ডাক, কিন্তু গতর সামলে!
মুক্তা এই অশ্লীল ইঙ্গিতে খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে বসে রইল। তারপর বাসন্তীর দিকে চেয়ে বলল, শুনলে বউদি, শুনলে! এখন যদি মুখ ছোটাই তাহলে তোমরা আমার দোষ দেখবে। ও তোমার মা, নইলে জিজ্ঞেস করতুম, ওই মুখ দিয়ে খায় না হাগে, এমন লোকের মুখ দেখলে গঙ্গায় নাইতে হয়।
বাসন্তী মায়ের দিকে চেয়ে বলল, দিন দিন তুমি কী হয়ে যাচ্ছো বলো তো! ভদ্রলোকের সমাজে মুখ দেখাও কী করে?
জিজিবুড়ি দমল না। মুখে বিষাক্ত হাসিটা ধরে রেখেই বলল, ও মা! খারাপ কথা কী আবার বললুম! সোমত্ম বয়সের মেয়ে, রূপযৌবন আছে, তাই সাবধান করে দেওয়া। বাঙাল মনিষিদের কি চরিত্তির থাকে রে বাপু!
মুক্তা ফুঁসে উঠে বলল, তোমার চরিত্তির ঠিক রাখ গিয়ে। শ্মশানে বাড়িয়ে বসে আছ, তবু মুখে একটা ভাল কথা শুনলুম না। জন্মে কখনও শুনিনি বাপু কেউ নিজের মেয়ের সর্বনাশ করার জন্য আদাজল খেয়ে লাগে। বলি ও ভালমানুষের মেয়ে, তোমার মতো গুয়ের পোকারা যদি ওই বাঙালের পাদোদক খায় তবে উদ্ধার হয়ে যায়। বুঝলে! এখন এ বাড়ি থেকে বিদেয় হও, নইলে আমি বাবাকে ডেকে এনে দেখাব তার শাউড়ি রোজ চোরের মতো এসে এ বাড়িতে কেন ঢোকে! তোমার লজ্জা হয় না এ বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোতে?
কথাগুলো গায়ে না মেখে জিজিবুড়ি উঠে পড়ল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, মা-মেয়ের কথার মধ্যে তুই আসিস কেন লা? ঝি-গিরি করছিস তাই কর। আর তোরও বলিহারি যাই বাসন্তী, কাজের লোককে মাথায় তুলছিস একদিন বুঝবি। কথায় বলে গোলামের ওষুধ হল পয়জার। মেনি বেড়ালের মতো মিউ মিউ করলে কি চলে? এসব নিকৃষ্ট মেয়েছেলেদের পায়ের তলায় দেবে রাখতে হয়।
