কাল রাতে রসিক মেয়েকে নিয়ে এসেছে। আসতেই পারে। বাসন্তী খুশিও হয়েছে খুব। দুই পরিবারের মন কষাকষি আর দূর হয়ে, পর হয়ে থাকা যদি একটু কম হতে থাকে তো বাসন্তী তার মধ্যে মন্দ কিছু দেখে না। কিন্তু সংসার হল আঁস্তাকুড়। এখানে ভালকে ভাল বলে দেখা, সোজাকে সোজা বলে ধরার তো রেওয়াজ নেই! এই যে মেয়ে এসেছে এ নিয়েও কথা হয় এবং হবে।
সকালে আঁশটে মুখ করে ওই যে মা এসে বসেছে, তার মানে পেটে জিলিপির প্যাঁচ চলছে। বাসন্তী নিজে যে একটু ভালমানুষ গোছের, তার যে প্যাঁচালো বুদ্ধি নেই, সে যে ঝগড়ুটে নয়, দজ্জাল নয়, সে যে মুখ খারাপ করতে পারে না এটা সে নিজেও জানে। কিন্তু মা তার এই ভালমানুষি একদম পছন্দ করে না। হয়তো তার মা চায় বাসন্তী তার মায়ের মতোই হোক। সংসারের আঁস্তাকুড় হাঁটকে জীবনটা কাটাক।
তাই অবশ্য হওয়ার কথা ছিল বাসন্তীর। ছেলেবেলা থেকে এক অশান্তির সংসারে সে বড় হয়েছে। মায়ে বাবায় বনিবনা হত না। তার দুই দাদা ডাগর হয়ে নানা বদমাইশিতে ঢুকে পড়ল। বাসন্তীর তো ভাল হওয়ার কথাই নয়। ভিতু স্বভাবের বাসন্তী বরাবর একটু বাপ-ঘেঁষা ছিল। বাবা কৃতী পুরুষ ছিল না বটে, কিন্তু লোক খারাপ ছিল না। বাসন্তীকে ভালও বাসত খুব। বোধহয় বাবা-ঘেঁষা হওয়াতেই তার স্বভাবে বাপের ছাপ পড়েছে বেশি। আর কপালগুণে বর পেল বাঙালকে। ভগবান সবটা দেন না, দিতে দিতেও খানিক কেড়ে রেখে দেন। তাই বাঙালের মতো বর পেলেও সবটা পেল না সে। বড়বউ খানিক দখল করে রাখল।
তা হোক। এতটাই কি আশা করেছিল সে! চারদিকে ফলন্ত, ভরাট সংসার, মা লক্ষ্মী উপচে পড়ছে চারদিকে। এতটাই কি হওয়ার কথা? নিষ্কন্টক নয় বটে, কিন্তু কাঁটা গাছের ফুলও কি কম ভাল!
বাসন্তী কচুরির পুর তৈরি করতে করতে ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছিল, কখন মা বিষ ওগরাবে।
গেলাসটা খালি করে রেখে দিয়ে জিজিবুড়ি বলল, তা বড়বউ কবে আসছে? এখন সুয়োরানি এসে পাটে বসলেই তো হয়।
বাসন্তীর বুক কেঁপে উঠল। তবে সে কিছু বলল না।
জিজিবুড়ি হঠাৎ ডুকরে উঠল, হরিবোল বাবা, হরিবোল। চুষিকাঠি ধরিয়ে এতকাল ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখে এবার লাথি ঝ্যাঁটা মারার সময় হয়ে এল।
বাসন্তী চোখ পাকিয়ে বলল, দুধ তো গিলেছ। এবার এসে গিয়ে।
যাচ্ছি মা যাচ্ছি। শুধু বলে যাই ওই হাড়গিলে চেহারার মেয়েটা কিন্তু মনিষ্যির চেহারায় শকুন। ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে ছাড়বে। একে একে আসছে সব সুয়োরানির দূত। মনে রাখিস।
বাসন্তী অখণ্ড মনোযোগে পুর মেখে উনুনে কড়াই চাপাল।
হঠাৎ সুর পালটে জিজিবুড়ি বলল, হাজার দুই টাকা দিবি?
অবাক হয়ে বাসন্তী বলে, দু হাজার টাকা! কেন?
ধার বলেই দে। দু মাস বাদে ফেরত দেবো।
দু মাস বাদে কি লটারি পাবে নাকি?
মায়ের পেটের দুটো ভাইয়ের জন্য তো আর কিছু করে দিলি না। কত করে বললুম, বাঙালকে ধরে বাজারের দোকানঘরটা করে দে। দুজনে মিলে করে কর্মে খেতে পারত। বাঙালের টাকাও শোধ হয়ে যেত এতদিনে। তা আর যখন হল না তখন আর কী করা! কানু বাড়িতেই ব্যবসা ফেঁদেছে একটা। ধূপকাঠি আর মাজন তৈরি করে বেচবে।
দাদারা আজকাল বাসন্তীর কাছে বিশেষ আসতে সাহস পায় না। একসময়ে যথেষ্ট লুটপাট করে বাসন্তীকে প্রায় পথে বসিয়ে দিয়েছিল। এখন পাত্তা না পেয়ে পেয়ে আর বিশেষ আসে না। তবু তার মধ্যেও মাঝে মাঝে নির্লজ্জের মতো এসে টাকা ধার চায়। বাসন্তী ধার দেয় না বটে, তবে দু-দশ টাকা দিয়ে বিদেয় করে দেয়। মিথ্যে করেই বলে, টাকাপয়সা আমার কাছে থাকে না, সব তোমাদের ভগ্নীপতির হেফাজতে। কথাটা ওরা বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু বেশি কিছু বলতেও পারে না। বলার মুখও নেই কিনা!
বাসন্তী বলল, টাকা নেই।
জিজিবুড়ি বিরস মুখে বলে, ধান-বেচা টাকাগুলো তো সদ্য হাতে পেলি।
সেটা হিসেবের টাকা। তোমার জামাই ব্যবসা করে খায়। সে হিসেব বুঝে নেয়। বেহিসেবি চলে না।
আজকালকার বাজারে দুটো হাজার টাকা কি একটা টাকা! নাহয় একটু বানিয়ে-ছানিয়ে যাহোক বলে দিবি। কানু বলেছে এ-টাকা সে ফেরত দেবে।
সে তো খুব ভাল কথা মা। ফেরত পেতে তো আমার হাড়ে দুব্বো গজাল। আর গিল্টি করা কথাগুলো বোলো না তো!
এরপর ভাই দুটো যদি চুরি-ডাকাতি করে খায় তাতে কি তোর মান বাড়বে নাকি!
আমার মান নিয়ে তোমাকে আর মাথা ঘামাতে হবে না। চুরি ডাকাতির কমটাই বা কী করেছে তারা শুনি?
জিজিবুড়ি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার ভয় কী জানিস? গলায় দড়ি-টড়ি না দিয়ে বসে।
তোমার ছেলে দেবে গলায় দড়ি! হাসালে মা। সে দড়ি এখনও তৈরি হয়নি।
জিজিবুড়ি আরও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেলে সে কি আর এমন মানুষ থাকবে? শত হলেও ভদ্রলোকের ছেলে তো। অভাবে পড়ে নাহয় অকাজ কুকাজ করে ফেলেছে। তা বলে এটা তো আর খারাপ নয়।
আমি অত তত্ত্বকথা জানি না মা। তোমার ছেলেদের আমার বিশ্বাস হয় না, জেনে রাখো। বহুবার বহু ছুতোয় টাকা নিয়ে মদ-গাঁজা খেয়েছে না হয় পেট পুজোয় গেছে।
তা কী করবে বল! অভাবের সংসার, এণ্ডি-গেণ্ডি ছেলেপুলে, সেগুলোকে তো আর ফেলে দিতে পারে না!
ছেলেপুলেই বা গণ্ডায় গণ্ডায় হয় কেন? অভাবের সংসার, এক পয়সা আয় নেই, অথচ দুই ছেলে দুই বউ জুটিয়ে আনল। জাত দেখলে না, বংশ দেখলে না, কোত্থেকে কাকে ধরে আনল খোঁজ নিলে না। তারপর বছর বছর বংশ বিস্তার করে যাচ্ছে। বেশ যা হোক।
