অ্যাই তোর এত বিচ্ছিরি নাম কেন রে? তোর পোশাকি নাম নেই?
না তো! আমার ইস্কুলের নাম তো মরণকুমার।
এ মা! তোর এনামটা ভাল লাগে?
নাঃ, একটুও না।
দাঁড়া, বাবাকে বলে তোর নামটা পালটে দিচ্ছি। কে এ-নাম রাখল বল তো!
বাবাই রেখেছিল। আমার একটা দিদি হয়ে মরে গিয়েছিল বলে নাকি এনাম রাখা হয়।
ধ্যেৎ, যত সব কুসংস্কার। তোর একটা ভাল নাম নিতে ইচ্ছে করে না?
এক গাল হেসে মরণ বলে, হ্যাঁ তো। আমার একটা নাম খুব পছন্দ।
কী নাম?
বিশ্বজিৎ
ধুর! বিশ্বজিৎ একটা নাম হল! এ তো পঞ্চাশ বছর আগের যুগের নাম।
কাঁচুমাচু হয়ে মরণ বলে, তাহলে?
পুঁটি একটু ভাবল। ভেবে বলল, অবিশ্যি মরণকুমার নামটা বেশ নতুন ধরনের কিন্তু। ইট হ্যাজ শার্প এজেস। বেশ ধারালো নাম। কোথায় শুনেছি বল তো এনামটা!
মরণ হেসে বলল, বাবা খুব ঢাকার মরণচাঁদের মিষ্টির দোকানের কথা বলে।
ওঃ ইয়েস! না, আফটার এ সেকেন্ড থট নামটা আমার খারাপ লাগছে না।
করুণ মুখে মরণ বলে, তাহলে নামটা বদলাতে বলবে না?
না। নামটার একটা অ্যাপিল আছে। তোর বিশ্বজিতের চেয়ে অনেক ভাল। অন্তত ভ্যাতভ্যাতে নাম নয়।
মরণ একটু আশার আলো দেখতে পেয়েছিল। আলোটা পট করে নিবে গেল।
কী পড়ছিস?
ইংরেজি।
আজ আর পড়তে হবে না। ওঠ।
কোথায় যাবে?
চল না। দোতলার বারান্দা থেকে দেখলাম, বাগানে একটা কুল গাছ রয়েছে। ঝেঁপে কুল এসেছে তাতে।
কুল! হ্যাঁ, কুল গাছ আরও আছে।
কুল খাস না?
মা খেতে দেয় না যে। কাঁচা কুলে নাকি অসুখ হয়। পাকলে খাই।
এ মা, ডাঁশা কুলের মতো জিনিস আছে!
অবাক হয়ে মরণ বলে, এই সকালে কুল খাবে? ভীষণ টক যে!
টক বলেই তো খাবো। তবে এখন নয়। দুপুরে ঝালনুন দিয়ে। গাছে শুঁয়োপোকা নেই তো!
খুব আছে। তবে আমার তাতে কিছু হয় না। কচু পাতার রস লাগিয়ে দিলেই কমে যায়।
চল তো, ঘুরে ঘুরে চারদিকটা দেখি।
মরণ সেটাই চায়। সে বই বন্ধ করে টপ করে উঠে পড়ল।
কোথায় যাবে দিদি?
আগে বেরোই তো, তারপর দেখা যাবে।
দিদিটা যে দেখতে খুব সুন্দর, তা নয়। রাতে ঘুমচোখে আর লজ্জায় ভাল করে দেখেনি। দিদিটা রোগা, মুখখানা ভাঙাচোরা, দাঁতগুলোও ভাল নয়। তা হোক, বেশ হাসিখুশি আছে। শিবঠাকুরের কাছে তো সে সুন্দর দিদি চায়নি। চেয়েছিল, যেন দাদা, দিদি আর বড়মা তাকে খুব ভালবাসে। সেটা হলেই হল।
মুখবাঁধা মস্ত মেটে কলসি নিয়ে বিপিন এসে বসেছে উঠোনের রোদে।
খেজুর রস খাবে না দিদি?
পুঁটি নাক কুঁচকে বলল, খেজুর রস? কেমন খেতে?
খুব ভাল। আমরা তো সবাই খাই।
পুঁটি বিপিনের দিকে সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল, খাবো? লোকটার জামাকাপড় যা ময়লা!
মরণ হেসে বলল, ও তো মাঠে কাজ করে। জামাকাপড়ে মাটি লেগে যায়।
পুঁটি খুঁতখুঁত করে বলল, কলসির মুখের ন্যাকড়াটার অবস্থা দেখেছিস? হাকুচ কালো।
ও তো রসের দাগ। খাও না, কিছু হবে না। আমরা তো রোজ খাই।
ওপর থেকে রসিক সাহা হাঁক মেরে বলল, আরে খা, খা। খেজুর রসে মেলা ভিটামিন।
উঠোনে নেমে হাম্মিকে রোদে হামা দিতে ছেড়ে দিয়ে রসিকও বসে গেল রস খেতে।
এক চুমুক খেয়ে পুঁটি স্বাদটা বুঝবার চেষ্টা করল একটু। তারপর বলল, দুর, ভ্যাতভ্যাতে স্বাদ। কোনও কিক নেই। এর চেয়ে কোক ভাল।
মরণ হি হি করে হেসে বলল, ভ্যাতভ্যাতে মানে কী দিদি?
ভ্যাতভ্যাতে! ভ্যাতভ্যাতে মানে ভ্যাতভ্যাতে। তার মানে হচ্ছে ভাতের মতো। তাও তো বিস্বাদ।
কিন্তু ভাত তো আমরা রোজ খাই।
হু, সে কথা ঠিক। কিন্তু শুধু ভাত হল ভ্যাতভ্যাতে। বুঝলি?
হেসে ঘাড় নাড়ল মরণ।
পুঁটি চারদিকে চেয়ে বলল, তোদের সবকিছুই ভ্যাতভ্যাতে, না রে?
মরণ ফের হি হি করে হাসল। বেশ দিদি। ভাল দিদি।
.
রান্নাঘরে উনুনের কাছটি ঘেঁষে জিজিবুড়ি বসা। একটা খয়েরি রঙের ময়লা, ছেঁড়া পুরনো আলোয়ানে মাথা-টাথা ঢেকে জবুথবু। হাতে নিত্যনৈমিত্তিক দুধ-চায়ের গ্লাস। মুখখানা গম্ভীর। তোম্বাপানা। ভিতরে বিষ জমেছে ঢের। বাসন্তী মায়ের চোখ দেখলেই টের পায়, এবার বিষ ওগরাবে। তবে বিষ ওগরানো ছাড়া তার মায়ের আর কিছু করারও নেই।
ছেঁড়া আলোয়ানটা দেখে কষ্টই হয় বাসন্তীর। সেই ছেলেবেলা থেকে শীতকালে মায়ের গায়ে ওই আলোয়ানটাই দেখে আসছে। গরম জিনিস বড্ড পুরনো হয়ে গেলে ওম কমে যায়। গাঁয়ের এই চাষাড়ে শীত মানতে চায় না। তার মায়ের দ্বিতীয় কোনও শীতবস্ত্র যে নেই, তা বাসন্তী ভালই জানে। রাতে গায়ে দেয় একখানা পুরনো লেপা তুলো-টুলো সরে গিয়ে সেই লেপেরও জায়গায় জায়গায় জ্যালজ্যালে অবস্থা।
বাসন্তী ইচ্ছে করলে মাকে একখানা আলোয়ান কিনে দিতে পারে, বানিয়ে দিতে পারে নতুন লেপ। কিন্তু না-দেওয়ার কারণ আছে। কারণটা হল, সেই আলোয়ান বা লেপ কোনওটাই মায়ের ভোগে লাগবে না। তার দুই অসুর ছেলে ভোগা দিয়ে হাতিয়ে নেবেই নেবে।
অকালকুষ্মাণ্ড দুটো ছেলের জন্য মায়ের অনেক পোড়ানি আছে বুকের মধ্যে।
বাসন্তী মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ মা, আমাকে কি পেটে ধরোনি তুমি! সত্যি করে বলো তোর তোমার ভাবগতিক দেখে মনে হয় আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলে! তোমার ছেলেরাই তোমার সর্বস্ব।
এসব ভাবের কথা অবশ্য জিজিবুড়ি গায়ে মাখে না। তাকে দোষ দিয়ে লাভও নেই। সারাটা জীবন ভাত কাপড়ের কষ্ট, উঞ্ছবৃত্তি করে করে মানুষটা আর সেই মানুষও তো নেই। মনটা দড়চা মেরে গেছে।
