পড়াশুনো শেষ হল রাত নটায়। দোতলার শোওয়ার ঘর থেকে খুব হাসি আর কথার শব্দ আসছিল। কিন্তু ইচ্ছে হলেও ওপরে যেতে লজ্জা করছিল তার। দিদি তাকে দেখে হয়তো ভারী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলবে, ওঃ, এই বুঝি মরণ!
তাই মরণ মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ চুপ করে পড়ার ঘরে বসে রইল।
বসে বসে ভাবছিল মরণ। এই যে বড়মা, দিদি, দাদা এরা নাকি তার খুব আপন কেউ নয়। অন্তত জিজিবুড়ি তাই বলে। জিজিবুড়ির জিভে নাকি বিষ আছে। তার কথা হল, ও আবার আপনার জন কবে থেকে হল রে! বাঙালের প্রথম পক্ষই হল তার আসল। তোরা তো সব দুয়োরানির ছা। কে-ই বা তোদের পোঁছে, কে-ই বা তোদের দাম দেয়। আমার মেয়েটা তো হদ্দ বোকা, পিটুলিগোলা খেয়ে দুধ বলে নাচছে। দলিল-দস্তাবেজে কত ফঁকফোকর থাকে, উকিল মুহুরিদের হাত করে সব বানিয়ে রেখেছে। যখন কেড়েকুড়ে নেবে তখন আক্কেল হবে মেয়েটার।
জিজিবুড়ি বাড়িয়ে বলে ঠিকই, কিন্তু সমস্যা যে একটা আছে তা মরণও বুঝতে পারে। যদি সমস্যা না থাকত তাহলে কি তার বাবা কখনও মরণ বা তার মাকে কলকাতার বাড়িতে নিয়ে যেত না? আর তার মাও যেন বড়মার নামে ভীষণ ভয় পায়। এইসব থেকে আজকাল মরণ বুঝতে পারে তারা ঠিক আর পাঁচটা পরিবারের মতো নয়। তাদের কিছু গোলমাল আছে। আর সেজন্য দায়ি তার বাবা।
বাবাকে কি খুব অপছন্দ করে মরণ! অনেক ভেবে দেখে তার মনে হয়েছে, যত নষ্টের গোড়া ওই লোকটাই। যেমন কেঠো চেহারা, তেমনই কেঠো স্বভাব। দুটো বিয়ে করার কী দরকার ছিল লোকটার! না, বাবাকে তার একদম পছন্দ নয়।
তার মাও টের পায় মরণ তার বাবাকে পছন্দ করে না। তাই মা মাঝে মাঝে তাকে বলে, মানুষটার বাইরেটা অমন হলে কী হবে, ওর মনটার কথা তো জানিস না! বড় হলে বুঝবি ওরকম মানুষ খুব কম হয়।
মা যে বাবাকে কেন অতটা ভালবাসে, তাও বুঝতে পারে না মরণ। মা কখনও বাবার কোনও দোষ দেখে না, কোনও অন্যায় দেখতে পায় না। বাবার ছেড়ে রাখা চটিজুতোয় পা লাগলে পর্যন্ত প্রণাম করে। অথচ জিজিবুড়ি বলে, বাঙালের নাকি জাতজন্মেরই ঠিক নেই। মায়ের সঙ্গে তার নাকি মোটে বিয়েই হয়নি।
এইসব নিয়েই সমস্যা মরণের। পড়ার ঘরে বসে সে তাই গভীরভাবে ভাবছিল।
আচমকাই জানালায় খুটখুট করে শব্দ হল একটা। ভারী চমকে গিয়েছিল মরণ।
কে রে!
জিজিবুড়ি চাপা গলায় বলল, ও মরণ, জানালাটা একটু ফাঁক কর দিকি ভাই।
মরণ গিয়ে জানালার ছিটকিনি খুলে বলল, কী জিজিবুড়ি?
বলি, কে এল রে তোদের বাড়িতে! অত হাসি-মস্করা কীসের?
দিদি এসেছে যে!
জিজিবুড়ি চোখ বড় বড় করে বলে, দিদি মানে! বাঙালের মেয়েটা নাকি? ও বাবা, এ যে একে একে সবাইকে এনে জোটাচ্ছে! তোদের ভিটেছাড়া করবে নাকি!
তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, কে দেখে ফেলবে।
বলি ছেলেটাও তো এখনও বিদেয় হয়নি। জ্বরের বাহানা করে চারদিন না পাঁচ দিন পড়ে আছে। ও আর যাবেও না। আর বাসন্তীরও বলিহারি যাই, পারলে পাদোদক খায়। তা মেয়েটা এয়েছে কী করতে জানিস?
বেড়াতে এসেছে।
বেড়ানোর কি আর জায়গা নেই বাপু! হিমালয় আছে, মথুরা বৃন্দাবন আছে, দিল্লি-বোম্বাই আছে, সব ফেলে এখানে এসে আবার গুঁতোগুতি কেন?
তা আমি জানি না। তুমি এখন যাও।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলুম, নতুন গলা পেয়ে খোঁজ নিয়ে গেলুম। ছেলে-মেয়েকে এনে তো দখল কায়েম করলে, এবার বড়গিন্নিকে এনে বসালেই চিত্তির। তোর মাকে বলিস গয়নাগাঁটি সোনা-দানা সব সামলে রাখতে। মেয়েমানুষের চোখ খুব খারাপ। আঁত করে সব জিনিসের তল্লাশি নিয়ে নেবে। আমি বাপু লক্ষণ মোটেই ভাল বুঝছি না।
এসব শুনলে মন আরও খারাপ হয়ে যায় মরণের।
ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে কারা নামছে শুনে মরণ বলল, তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি। কে যেন আসছে।
বলেই পাল্লাটা বন্ধ করে দিল মরণ।
পাশেই রান্নাঘর। সেখান থেকে মায়ের গলা পাওয়া গেল, ও মুক্তা, মশলাটা তাড়াতাড়ি বেটে ফেল, আজ একটু মুড়িঘণ্ট করব।
মশলা কখন হয়ে গেছে!
তাহলে শিলটা ভাল করে ধুয়ে একটু পোস্ত বেটে ফেল দেখি।
এইসব শুনতে শুনতে আরও গভীর ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিল মরণ। যত বড় হচ্ছে তত তার ভাবনা বাড়ছে। এইজন্যই আজকাল বড় হওয়াটাকে তেমন পছন্দ হয় না মরণের।
ভাবতে ভাবতেই কখন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
রাত সাড়ে দশটা না এগারোটায় মা এসে ডেকে তুলল তাকে।
ও মা! তাই তো বলি ছেলেটার সাড়াশব্দ নেই কেন! আয় আয় শিগগির, দিদি এসেছে তো! কতবার করে জিজ্ঞেস করছে তোর কথা!
আমার কথা! বলে মরণ অবাক। তার কথা কেন জিজ্ঞেস করবে। তাকে তো কেউ একটুও দাম দেয় না!
আয় বাবা, উঠে পড়।
ঘুম-চোখেই দেখা হল দিদির সঙ্গে। খাওয়ার টেবিলে।
দেখা হতেই হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসাল।
এ বাবা, তোমার তো ভীষণ দুষ্টু দুষ্টু চোখ! খুব দুষ্টু বুঝি তুমি?
মরণ হেসে ফেলল।
রসিক সাহা বলল, আরে একেবারে ল্যাজকাটা বান্দর। পড়া নাই, শুনা নাই, সারাদিন পাড়া টহল দিতাছে। খ্যালনের কথা ক গাছ বাওনের কথা ক, ফাল দিয়া উঠব।
দাদা মৃদু-মৃদু হাসছিল। বলল, না, না, ওর ব্রেন আছে। একটু দুষ্টু হলেও পাজি নয়। হি ইজ গুড। আই লাইক হিম।
রাতে বেশি কথা হয়নি আর।
সকালে তার পড়ার ঘরে এসে হামলে পড়ল দিদি।
