অমল মৃদু একটু হাসল। হ্যাঁ তার খিদে পেয়েছে, তার শীত করছে, সে ভারী ক্লান্ত। রসিক বাঙালকে তার মোটেই খারাপ লাগছে না।
রসিক পিছন ফিরে হঠাৎ হক মারল, কী রে পুঁটি, তর কিননকাটন হইল? আয় তাড়াতাড়ি।
ফ্যান্সি স্টোর নামে নতুন একটা দোকান খুলেছে সম্প্রতি। ঝাঁ চকচকে দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা ছিপছিপে চেহারার মেয়ে কেনাকাটা করছিল। বলল, যাচ্ছি বাবা।
রসিক অমলকে বলল, আমার মাইয়া। গ্রামেগঞ্জে আইতে চায় না। অগো জান গাড়া আছে কইলকাতায়। তুয়াইয়া বুয়াইয়াও আনতে পারি না। এইবার কী খেয়াল হইছে কে জানে, হঠাৎ দেখি জিনিসপত্র গুছাইয়া লগ লইছে।
এসব কথার কী উত্তর দেবে তা ভেবে পাচ্ছিল না অমল।
রসিক হাঁক মারল, আমরা আউগাইলাম রে পুঁটি। তুই তাড়াতাড়ি আয়।
হ্যাঁ বাবা, যাচ্ছি, তুমি এগোও।
তাকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল বাসন্তী, ওমা! এ কাকে এনেছ তুমি! কী ভাগ্যি আমার! এসো, এসো অমলদা, এসো!
রসিক যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় ফাস্ট হয়েছে এমন মুখ করে বলল, আগো, তাড়াতাড়ি আগুনের পাতিলটা লইয়া আহ। আর পাঞ্জাবের আলোয়ানটা দিয়া ভদ্রলোকরে একটু ঢাকাঁচাপা দাও। দেখতাছ না, ঠান্ডায় এক্কেবারে কাপ উইঠ্যা গেছে।
এই দিই! ও মা এই বুঝি পুঁটি! কই, আগে জানাওনি তো!
জানামু ক্যামনে? হুট কইরা রওনা হইয়া পড়ল।
এসো মা, এসো। বলে মেয়ের দুহাত ধরে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল বাসন্তী।
কাঠকয়লার আগুনে ভরা একটা হাড়ি এনে রাখা হল অমলের পায়ের কাছে। একটা মোটা কুটকুটে আলোয়ানে তার গা ঢেকে দিল বাসন্তী। বলল, বোসো অমলদা, চা করে আনছি। চা না কফি?
চা-ই কর।
রসিক মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বলল, জুইৎ কইরা বহেন। আর কী খাইবেন কন।
অমল মৃদু হেসে বলল, আপনি একটি বেশ লোক, তাই না!
না মশয়, বাজারে আমার খুব বদনাম। দুইটা বিয়া করছি, মাইনষের জমিজমা সব গাপ করতাছি। আরও কত কী কয় লোকে! তবে মশয় আমি ওইসব গায়ে মাখি না। খাইট্যা পিটা খাই, অসুরের মতো কাম করি। কুটকচালি কইরা তো সময় কাটাই না! গ্রামের মানুষগুলা অলস, বইয়া বইয়া কার মায়ে কত গু তা হুইঙ্গা বেড়ায়। বোঝলেননি?
অমল আগুনের তাপ আর আলোয়ানের ওমে ভারী আরাম পেয়ে চোখ বুজল। রসিক বাঙাল একজন তেজি লোক। ভোগীও বটে। কিন্তু কী সুন্দর ঘরদোরের ছিরিছাদ! বাসন্তীর সঙ্গে সম্পর্কও ভারী ভাল। এদের কোনও ইগো প্রবলেম নেই। অকারণ চিন্তা নেই, পাপবোধে কষ্ট পায় না।
হাফসাইয়া পড়ছেন নাকি অমলবাবু? একটু শুইবেন?
আরে না। একটু ক্লান্তি লাগছে।
একটু ব্রান্ডি আছে, খাইবেন? মরণের মায়ের লিগ্যা কিন্যা রাখছিলাম। হ্যায় তো একবার চুমুক দিয়াই থু থু কইরা ফালাইয়া দিল। বোতলটা পইড়াই আছে।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না, না, থাক। আজ ওসব নয়।
না ক্যান? শরীর একটু গরম হইব।
এই বেশ লাগছে।
শুধু মাছভাজা নয়, সেই সঙ্গে ঘিয়ে ভাজা পরোটা, আলুর দম, বেগুনভাজা সাজিয়ে দিল সামনে বাসন্তী।
এ কী কাণ্ড রে! এত কে খাবে!
খাও অমলদা। রাতে না হয় একটু কম খেও বাড়িতে। আজ প্রথম এলে তো! দাঁড়াও, হাত ধোয়ার জন্য উঠতে হবে না। আমি গামলায় গরম জল আনিয়ে দিচ্ছি, এখানে বসেই হাত ধুয়ে নাও।
কৃতজ্ঞতায়, কুণ্ঠায় এতটুকু হয়ে যাচ্ছিল অমল। এই বাসন্তী, এই রসিক বাঙাল–এইসব তুচ্ছ লোকজনের কোনও খোঁজখবরই তো এতকাল রাখত না অমল। তবে এরা তাকে এত যত্ন করছে কেন!
তুই খুব ভাল আছিস, না রে বাসন্তী?
বাসন্তী ভারী লজ্জা পেয়ে বলে, ভাল থাকার কথা আর বোলো না। সংসারের ঝামেলা কি কম! উনি তো বড়বাজারের দোকান নিয়ে ব্যস্ত। সব বিষয় সম্পত্তি আমার ঘাড়ে।
বাসন্তীর মুখে চাপা অহংকার আর খুশির উজ্জ্বলতা গোপন থাকল না। অমল দেখল। দেখে মুগ্ধ হল। একটু হিংসেও কি হল তার?
.
৪৩.
শিবঠাকুর একটু ভোলেভালা আদমি, কিন্তু একটু পাগলাটেও বটে। বর যখন দিতে শুরু করেন তখন দিতেই থাকেন। আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। পরশু দিনও মরণ ভাবছিল, দাদা তো হল, এবার দিদিটা আর বড়মাটা হলেই হয়। তার বোন আছে বটে, কিন্তু দিদি থেকেও ছিল না। আর মা থাকলেও, বড়মা অন্য জিনিস। দিদি আর বড়মা সম্পর্কে কত কী ভেবে রেখেছে মরণ। দিদিটা হবে ঠিক পান্নাদির মতো। আরও সুন্দর হলে তো কথাই নেই। আর বড়মা হবে ঠিক যেমন জগদ্ধাত্রীর প্রতিমা।
আগে থেকে খবর দেওয়াও ছিল না। কাল একটু রাতের দিকে বাবা এসে হাজির। সঙ্গে পাগলা অমলকাকু আর দিদি। মরণ তখন পড়তে বসেছিল। উঠোনে মায়ের গলা পেয়ে বুঝল একটা কিছু হয়েছে। নতুন কেউ এসেছে বাড়িতে। এক লাফে উঠোনে নেমে এসে লণ্ঠনের আলোয় দিদিকে দেখে তার যেমন আনন্দ, তেমনই লজ্জা।
ছোট ছেলেদের অনেক সমস্যা। তার মধ্যে একটা হল কেউ সহজে পাত্তা দিতে চায় না। ভাবে, ওর সঙ্গে আর কীই বা কথা বলার আছে! শুধু ফাইফরমাশ করার জন্য তাদের ডাক-খোঁজ করা হয়। মরণ তার এই ভবিতব্য মেনেও নিয়েছে। তার কোনও গুরুত্ব নেই, তার তেমন আদরও নেই। পড়াশুনোয় ভাল হলেও না হয় হত! কিন্তু তাও সে নয়। এই অনাদরের জীবনটার জন্যই তার যা কিছু দুঃখ। সে ভাল বল খেলে, গাছ বায়, খুব জোরে দৌড়তে পারে, কিন্তু সেসব গুণকে কে আর পোঁছে!
সে ধরেই নিয়েছে তার কলকাতার দিদিও তাকে মোটেই পাত্তা দেবে না।
