একটু আনমনা হয়ে গেল পারুলদি। হাতের বড় টর্চটা কয়েকবার ছেলেমানুষের মত জ্বালাল, নেবাল।
তোর কত বয়স হল রে পান্না?
সতেরো।
সতেরো! বলে একটু ভাবল পারুলদি। ওই সতেরো শব্দটাই যেন পারুলদিকে একটু দূরে নিয়ে গেল। বোধহয় সতেরোয় ফিরে যাচ্ছিল সে।
তখনও জন্মায়নি পান্না। কুড়ি বছর আগে পারুলদির সঙ্গে প্রেম হয়েছিল অমল রায়ের। কীরকম প্রেম ছিল ওদের কে জানে। বিয়ে হয়নি। তাতে ভালই হয়েছে। বিয়ে হলে হয়তো প্রেমটা গ্যাদগ্যাদে হয়ে যেত।
তার খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল, পারুলদি এখনও অমল রায়ের কথা ভেবে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিনা। ট্র্যাজেডি বড় ভাল লাগে পান্নার। ট্র্যাজেডির মতো এমন রোমহর্ষ আর কীসে আছে?
.
০৪.
মাঘ মাসের রাত দশটায় হঠাৎ বাই চাপল রুইমাছের কালিয়া খাব। খাবেন তো খাবেনই। হ্যারিকেন নিয়ে বড় ছেলে গৌরাঙ্গ আর চাকর শিবু গিয়ে পুকুরে জাল ফেলল। উঠল দশসেরী পেল্লায় এক রুই। কেটেকুটে রান্না করতে করতে রাত বারোটা। তৃপ্তি করে খেয়ে উঠে গৌরহরি গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। কালিয়া খেতে চেয়েছিলেন, খাওয়া হয়েছে, ব্যাস আর কী। ওদিকে বাড়ির গিন্নিকে ওই রাতে পাহাড়প্রমাণ সেই মাছ সাঁতলাতে হল। পেটের খিদে পেটেই মরে গেল। যখন এক গেলাস জল খেয়ে শুতে গেলেন তখন ভোর হতে আর বাকি নেই। পরদিন সেই বিপুল মাছ পাড়াপ্রতিবেশীদের বিলি করা হয়েছিল, মাছের সঙ্গে সঙ্গে কালিয়ার গল্পও বিলি হল। বৃত্তান্ত শুনে এসে হাজির হয়েছিল মহিম রায়।
এসব কী হরিদা, বাড়ির পাঁচজনের সুখসুবিধের কথা যে একটুও ভাবেন না। এ কি ভাল?
গৌরহরি অতীব সুপুরুষ, গৌরবর্ণ, লম্বাচওড়া হাড়েমাসে চেহারা। মুখে একটু বিদ্রূপের হাসি, তুই খুব ভাবিস বুঝি? সেইজন্যই তোকে কেউ মানে না।
কথাটা পাথুরে সত্যি। একটা লোক কীভাবে আধিপত্য করে, কোন মন্ত্রবলে মান্যগণ্য হয়ে ওঠে এ তত্ত্বটা আজও বোঝা হল না মহিমের।
একটা মামলার রায় বেরোল বিকেলে। সতেরো জন ফৌজদারি মামলার আসামি। খালাস হতে হতে সন্ধে পেরিয়ে গেল যখন, তখন আর তাদের বাড়ি ফেরার বাস নেই। ট্যাঁকেও নেই পয়সা। গৌরহরি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বর্ধমান থেকে তাদের সোজা নিজের বাড়িতে এনে তুললেন। সতেরোটা উপোসি ষণ্ডামার্কা গেঁয়ো লোক। এমনিতেই তারা ভাতের পাহাড় এক চোপাটে উড়িয়ে দেয়। সেদিন তারা দুনো খিদে নিয়ে যে পরিমাণ ভাত খেল তা টিকিট কেটে দেখার মতো দৃশ্য। সতেরোটা মুখের ভাত ডাল জোগাতে বাড়ির গিন্নির কী হাল হল তা ফিরেও দেখেননি গৌরহরি। ওটা দেখা যেন তার কাজ বা কর্তব্য নয়।
তিন ভাইয়ের পৈতৃক বাড়ি। দালানকোঠা জমি নিয়ে বিরাট সম্পত্তি। হঠাৎ গৌরহরির খেয়াল হল দুই ভাইয়ের অংশ কিনে নিতে হবে। প্রস্তাব উঠতেই রামহরি আর নরহরি গাঁইগুঁই করতে লাগল। পৈতৃক ভিটে ছাড়বে না। গৌরহরি তখন দাম বাড়াতে লাগলেন। শেষমেশ সেই দাম এত অবিশ্বাস্য রকমের উঁচুতে তুলে দিলেন যা দিয়ে গোটা বাড়িটাই দুবার কেনা যায়। তখন আর ভাইরা আপত্তি করল না, আপত্তি করাটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু আপত্তি তুলতে পারত বাড়ির লোকেরাই। দুই উপযুক্ত ছেলে, গিন্নি। তারা বুঝিয়ে বলতে পারত, এরকম আকাশছোঁয়া দাম দিয়ে দুটো অংশ কেনা আহাম্মকি হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ শ্বাসটুকুও ফেলেনি।
কিন্তু মহিম রায় বলেছিল, দাদা, এ যে হাতির দামে নেংটি ইঁদুর কেনা হল!
গৌরহরির প্রতিক্রিয়া হল সামান্যই। ভ্রূ দুটো একটু উঁচুতে তুলে বললেন, দামের তুই জানিস কী? সারা জীবন চার আনা আট আনার হিসেব কষে মরলি, দাম কাকে বলে তা শিখলি কই?
মহিম আর পারেনি। বলে ফেলেছিল, আপনি যেন শরৎ চাটুজ্জের নবেলের ক্যারেক্টার, রক্তমাংসের মানুষ নন।
গৌরহরির ঠোঁটে বাঁকা বিদ্রূপের হাসিটি বদলাল না। ঠান্ডা গলায় বললেন, তুই বড্ড গেরস্ত। অত গেরস্ত হোস না, কষ্ট পাবি।
যে সুরে চাকর-বাকরকে হুকুম করতেন সেই একই সুরে নিজের দুই ছেলেকেও হুকুম করতেন। ছেলে দুটো দিশেহারা হয়ে বাপের হুকুম তামিল করতে ছুটত। ফুলের মতো সুন্দর দুটো মেয়েও কদাচিৎ আসকারা পেত তাঁর কাছে। ছেলেপুলেদের নাড়াঘাঁটাও করতেন না বড় একটা।
সেই মেজাজি, অহংকারী, দাপুটে এবং খানিকটা আত্মসর্বস্ব ও অত্যাচারী পুরুষটি যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন মহিম রায় সেখানে আগাগোড়া উপস্থিত। ডাক্তার নাড়ি দেখছেন, আর পুরো পরিবারটা একাগ্র হয়ে ঝুঁকে আছে তাঁর ওপর। চোখ পলকহীন। শ্বাস পড়ছে না কারও। শিয়রে পাথরপ্রতিমার মতো বউঠান। ডাক্তারের একটা নেতিবাচক মাথা নাড়ার পরই একটা দীর্ঘ হাহাকারে ভরা আর্তনাদ করে বউঠান অজ্ঞান হয়ে সোজা মেঝেতে পড়ে গেলেন। দুই ছেলে আছড়ে পড়ল বাবার বুকে। দুটি পুত্রবধূ দুই পা আঁকড়ে ধরে সে কী কান্না!
সারাটা জীবন যে পরিবারটিকে নাজেহাল করে ছেড়েছেন গৌরহরি, যাঁর মর্জি সামলাতে পরিবারের লোকজনকে ধিন ধা নাচতে হয়েছে, তাঁর মৃত্যুতে তো পরিবারটার হাঁফ ছাড়ার কথা। কিন্তু সেরকম হল না তো! বরং মনে হল, গৌরহরির সঙ্গে সঙ্গে যেন এ বাড়ির সূর্যাস্ত হয়ে গেল।
জ্ঞান ফেরার পর বউঠান কেবল বলছিলেন, আমি ওঁর সঙ্গে যাব, কিছুতেই আমি আর বেঁচে থাকতে পারব না।
