মা, কে এসেছিল বল তো! অমলমামা?
পারুল মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বলল, হ্যাঁ।
অমলমামার কী হয়েছে মা?
মনে নানা অশান্তি।
কাল আমি অমলমামাকে দুপুরবেলায় দেখেছি। কাঞ্জিলালদের জমিতে রোদে বসে আছে। আমি তিতলিদের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। দেখি বসে আপনমনে বকবক করছে। আমাকে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকল। আমি কিন্তু যাইনি, দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।
আজকাল ওকে দেখলে বোধহয় সবাই ভয় পায়। অথচ অমলদা কত ব্রাইট ছিল।
গোঁসাইবাড়ির মানুদি বলছিল। তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়নি বলেই নাকি অমলমামা পাগল হয়ে গেছে!
বিরক্তিতে ভ্রূ কোঁচকাল পারুল। দুধের মেয়েটার কানে ওসব কথা না ঢোকালেই কি নয়! গাঁয়ের মেয়েগুলোর স্বভাবই হল লোকের কানে বিষ ঢালা। কাজকর্ম তো নেই। গম্ভীর হয়ে পারুল বলে, ওসব কথায় কান দিও না।
আমাকে ডাকছিল কেন বল তো মা! অমলমামা তো আমাকে ভাল করে চেনেই না।
হয়তো চিনেছিল।
না মা, অমলমামা আমাকে চেনে না। মানুদি বলছিল, অমলমামা নাকি বাচ্চা মেয়েদের দেখলেই ডাকে।
ওঃ গড!
আমি কি পালিয়ে এসে অন্যায় করেছি?
না না। ঠিকই করেছ। অমলদার এখন মাথার ঠিক নেই।
পারুল খুব চিন্তিতভাবে দোতলায় উঠল। খুব ধীরে ধীরে।
কে এসেছিল রে পারুল? কার যেন কথা শুনতে পেলাম।
অমলদা।
বলাকা একটা পুরনো বালাগপাশে নতুন ওয়াড় পরাচ্ছিল। সঙ্গে দুখুরি।
দুখুরি খিকখিক করে হেসে বলল, পাগলাটা?
চিন্তিত পারুল তার মায়ের দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ মা, অমলদা কি শেষ অবধি পাগলই হয়ে যাচ্ছে?
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কার কী কর্মফল বাছা, তা কি জানি? ওদের বংশে তো কেউ পাগল ছিল না। ওর যে কী হল কে জানে। কী বলছিল তোকে?
কথাবার্তা তেমন অস্বাভাবিক বলছিল না। তবে কষ্টের কথা বলছিল। কীসের কষ্ট তা বুঝিয়ে বলতে পারল না।
বউটা কেমন রে?
কিছু খারাপ বলে তো মনে হয়নি।
বাইরে থেকে আর কতটুকু বুঝবি?
হ্যাঁ মা, পুরুষমানুষদের কিছু হলেই বুঝি বউকে দায়ি করতে হবে! এ তোমাদের ভীষণ একপেশে ধারণা।
তা নয় মা। আজকাল যে মেয়েগুলো স্বামীদের বড় জ্বালিয়ে মারে।
তাই বুঝি? পুরুষেরা কি ধোয়া তুলসীপাতা? তুমিও তো একজন মেয়ে, কেমন করে বল ওসব কথা?
আমি মেয়ে হলেও তোমাদের আমলের মেয়ে তো নই!
তাতে কী মা? সেই আমলের মেয়ে বলে এই আমলের মেয়েদের বুঝতে চেষ্টা করবে না!
বলাকা ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বুঝতে পারলে কি আর বলতাম? তবে জানি সংসারের বেশির ভাগ অশান্তির মুলেই থাকে মেয়েরা।
বেশ কথা! তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
পারুলের শরীর ভাল লাগছিল না। মাথাটা একটু গরম। সে গিয়ে শোওয়ার ঘরে অন্ধকারে লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে রইল। আজকাল মন খারাপ লাগলে সে তার পেটের দুষ্টুটার কথা ভাবে। ভাবতে ভাবতে মন ভাল হয়ে যায়। এখন তার ইচ্ছে হয় আরও কয়েকটা ছেলেপুলের মা হতে। শরীর দেবে না বলে, নইলে সে বহুপ্রসবিনী হত।
.
বে-খেয়ালে বাসরাস্তার কাছে চলে এসেছিল অমল। এখানে আলোটালো আছে, দোকান পাটে লোজন। একটা বাস থেকে হুড়মুড় করে লোক নামছে।
হঠাৎ তার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, এ কিস উইল কিওর ইউ। এ কিস… এ কিস… বাই দ্যাট উওম্যান…
হঠাৎ বহুকালের ছাইচাপা একটা ক্ষুধা যেন সর্বাঙ্গে জেগে উঠল তার। বহুকাল আগে পারুলদের দোতলার নির্জন ঘরে এক দুরন্ত দুপুরে সে এক সুন্দরীর দেহের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন, অন্ধ, দেহগত কামনা ফুঁসে উঠল হঠাৎ।
দৈববাণীর মতো তার ভিতরে কে যেন ক্রমাগত বলে যাচ্ছে এ কিস উইল কিওর ইউ…এ কিস উইল কিওর ইউ… এ কিস…
মাথা টলছে তার। …দেবীদুর্লভ পারুলের কাছেই কি রয়েছে তার অমেয় আরোগ্য? …সে যাবে পারুলের কাছে, হাঁটু গেড়ে বসে ভিক্ষা চাইবে। একবার, মাত্র একবার চুম্বন করো আমাকে। হরণ করো আমার বিষাদ, আমার অন্ধকার।
অমল পারুলের কাছে যাবে বলে ফিরে পঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ডান কাঁধে একখানা ভারী হাত এসে পড়ল।
আরে মশয়, আপনে অমলবাবু না? মহিম রায়ের পোলা?
বিরক্ত অমল মুখ ঘুরিয়ে রসিক সাহাকে দেখতে পেল। বলল, হ্যাঁ।
রসিক বিস্ময়ের চোখে তার দিকে চেয়েছিল। বলল, আপনারে তো চিননই যায় না মশয়। শরীর খারাপ নাকি?
না না, ঠিক আছে। সব ঠিক আছে।
এই কাল ঠান্ডার মইধ্যে গরম জামা গায়ে নাই, দাড়িদুড়ি ফালান নাই! কী হইছে কন তো!
লজ্জা পেয়ে অমল বলল, কিছু হয়নি তো!
দূর মশয়, কিছু হয় নাই মানে? শীতে তো কাঁপতে আছেন। আহেন আমার লগে।
কোথায় যাবো?
লন আমার বাড়িত। এক কাপ গরম চা খাইয়া যান। ভাল চা আছে।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না না, আজ থাক।
আরে লজ্জা পান ক্যান? আপনে তো ফালাইন্যা মানুষ না। ব্রাহ্মণ সন্তান, তার উপর প্যাটে বিদ্যা গিজগিজ করতে আছে। বিলাত আমেরিকা ঘুইরা আইছেন। আপনের শ্বাসেপ্রশ্বাসে বাতাস পবিত্র হয়। লন, গরিবের বাড়িতে একটু পায়ের ধুলা দিয়া আইবেন।
হঠাৎ শীতটা খুব টের পাচ্ছে অমল। তার হাত পা ঠকঠক করে কাঁপছে। নাকে জল আসছে, চোখে জল.আসছে, গলা কেঁপে যাচ্ছে।
কইলকাতা থিক্যা আইলেন বুঝি অখন!
অমল ভুল ভাঙার চেষ্টা না করে বলল, হুঁ।
ডান হাতে একটা মেটে হাঁড়ি সেইটে উঁচু করে দেখিয়ে রসিক বলল, গঙ্গার ইলিশ আনলাম। চলেন, কয়েকখান গরম গরম মাছভাজা খাইয়া যাইবেন। খুব ভাল জাতের ইলিশ পাইছি। ত্যালে এক্কেবারে পিছলাইয়া যাইতাছে।
