পারুল হেসে ফেলে বলল, আমার বাবা। বাবার খুব প্রিয় স্লোগান ছিল এটা। সবসময় সবাইকে বলত একটা ঝাঁকি মেরে সোজা হয়ে যাও।
অমল ফের গরম কফিতে হাঘরের মতো চুমুক দিয়ে বলল, কৃতকর্ম ভুলে, অতীত ভুলে যারা ফের সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে তারা নমস্য। আমার মনে আছে জ্যাঠামশাই কথাটা আমাকেও কয়েকবার বলেছেন। টেস্টে খারাপ রেজাল্ট করেছিলাম, তখন একবার বলেছিলেন। মনে আছে, তাতে কাজ হয়েছিল। তখন কাজ হত। এখন আর হয় না।
বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছ নাকি? সত্যি কথাটা বল তো!
মাথা নেড়ে অমল বলে, না। ঝগড়া করে বিবাগী হওয়ার মতো অবস্থাটা আর নেই। আমি এমনই এসেছি। কিছু ভাল লাগছিল না। ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে আজকাল আমার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
কেন, ফ্ল্যাটবাড়ি আবার কী দোষ করল! তোমারটা তো শুনেছি দক্ষিণ খোলা সুন্দর বড় ফ্ল্যাট।
ফ্ল্যাটবাড়ির দোষ নয় পারুল। দোষ আমার। কেবলই মনে হয়, যে-জায়গায় আছি সেটা আমার সহ্য হচ্ছে না।
তোমার কি এ জায়গাটা ভাল লাগছে আজকাল?
মাথা নেড়ে অমল বলে, তাও নয়। তবে এখানটায় ওরা নেই বলে আর চারদিকটা খোলামেলা বলে একটু হাঁফ ছাড়তে পারি।
চাকরিটার কী অবস্থা?
চাকরি! বলে খুব চিন্তিতভাবে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল অমল। তারপর হাত দুটো উলটে অসহায় ভঙ্গি করে বলল, কী জানি! চাকরির কথা তো ভাবিনি।
অফিসে না জানিয়ে ঢলে এসেছ?
হ্যাঁ।
এবার বোধহয় চাকরিটা যাবে তোমার। শুধু মুখ দেখে তো আর মাসের শেষে মোটা মাইনে দেবে তারা।
অমল একটু হাসল, মৃদুস্বরে বলল, ওসব ভাবতেও আমার আর ভাল লাগে না। যদি তাড়িয়ে দেয় দিক। ক্রীতদাস তো নই।
বাড়িতেও কি কিছু জানিয়ে আসোনি?
আবার চিন্তিত হয় অমল। বলে, জানানোর কী আছে? রাতে আমার ঘুম হচ্ছিল না। একটু তন্দ্রা এলেই ভীষণ সব দুঃস্বপ্ন দেখে চটকা ভেঙে যাচ্ছিল। মদ খাওয়ার চেষ্টা করলাম, বমি হয়ে গেল। ঝিম মেরে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল, এভাবে পড়ে থাকার মানেই হয় না। খুব ভোরবেলা উঠে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রেন ধরে সোজা বর্ধমান।
আচ্ছা মানুষ যা হোক। বাড়ির লোক ভাবছে না! একটা টেলিফোন তো করা উচিত ছিল, করেছ সেটা?
আমি করিনি। তবে মনে হয় দাদা খবর দিয়েছে।
ঠিক জানো যে খবর দিয়েছে।
জানি না। তবে বউদিও তোমার মতোই চোখ পাকিয়ে আমাকে অনেক বকেছে। তাতেই মনে হচ্ছে কলকাতায় খবর দেবার দায়িত্ব ওরাই নিয়েছে।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কেন যে তুমি এরকম হয়ে যাচ্ছ কে জানে!
সবাই সংসারী হবে, হিসেবি হবে, সাবধানী হবে, স্বাভাবিক হবে বলে আশা কর কেন? এক আধজন অন্যরকম হলে ক্ষতি কী? সবাই একরকম হলে কি ভাল হত?
পারুল হেসে ফেলে বলল, তুমি কি পৃথিবীর বৈচিত্র্য আনার জন্য হিসেব কষে অন্যরকম হতে চাইছ?
মৃদু হেসে অমল বলে, তাহলে তো অভিনয় করতে হত! কিন্তু আমি ভাল অভিনেতা নই। পারুল, আমি মনে বড় কষ্ট পাচ্ছি। বড্ড কষ্ট।
কীসের কষ্ট তাও তো এতদিনে বুঝিয়ে বলতে পারলে না।
সে কি বোঝানো যায়? আমার ভিতরে যেন এক রুক্ষ ঊষর প্রান্তর। আর সেখানে কেবল হাহাকারে ভরা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ভীষণ ভয় করে। পারুল, আমি কি পাগল হয়ে যাব একদিন?
শঙ্কিত অমলের মুখের দিকে চেয়ে বুকটা টনটন করে উঠল পারুলের। নরম গলায় বলল, ওসব ভেবো না। পাগল হবে কেন? একটা কথা বলব?
বলো।
তুমি কি নাস্তিক?
হঠাৎ ও প্রশ্ন কেন?
বলোই না।
মাথা নেড়ে অমল বলে, সেটাও তো ভেবে দেখিনি। ভগবান নিয়ে মাথাই ঘামাইনি কখনও। ওকথা জিজ্ঞেস করলে কেন?
তোমাকে বলতে ভয় করে। তুমি মস্ত লেখাপড়া জানা মানুষ, ভগবানের কথা বললে হয়তো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। নাস্তিকরা ভীষণ তার্কিক হয়।
অমল হাসল। বলল, নাস্তিক আস্তিক আমি কিছুই নই। নাস্তিক হলেও ভাল ছিল। নাস্তিকদেরও একটা ভগবান আছে বোধহয়।
সে আবার কী?
নাস্তিকদেরও একজন নেগেটিভ ভগবান থাকে।
কী যে বলো অমলদা, কিছু বুঝতে পারি না!
অমল কফিটা শেষ করে বলল, ওসব থাক পারুল। ভগবান আমাকে ভাল চোখে দেখবেন, এমন চান্স খুবই কম। তাকে ডেকে আমার লাভ হবে না।
আমি বলি বউয়ের কাছে ফিরে যাও। শান্তভাবে দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বল। মিটিয়ে নাও।
তোমার কি ধারণা, আমার মানসিক সব অশান্তির মূলে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া?
তা ছাড়া আবার কী?
সমস্যা অত সরল হলে তো কথাই ছিল না পারুল।
দুজনেই স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল।
পারুল বলল, ঠান্ডা বাড়ছে, রাত হচ্ছে। বাড়ি যাও অমলদা।
তটস্থ অমল উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। বলল, হ্যাঁ পারুল, যাচ্ছি। একটা কথা বলব?
বল।
আমার মাথায় তো এখন স্থিরতা নেই। আমি ভূতের মতো রাতবিরেতে বেরিয়ে পড়ি! অন্ধকারে আঘাটায় ঘুরে বেড়াই। আমাকে হঠাৎ তোমার জানালার ধারে বা বাগানের কোণে কোথাও দেখতে পেলে ভয় পেয়ো না। কিংবা মায়া করে ডেকে এনে ঘরেও বসিয়ো না। ওইভাবে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হয়ে হয়তো একদিন আমি নিজেকে ফিরে পাব।
পারুল চুপ করে রইল। অমল ধীরে ধীরে বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে আবছায়া উঠোন ডিঙিয়ে বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মদ খায়নি, তবু কেমন যেন অনিয়ন্ত্রিত ছোটবড় পদক্ষেপ। গায়ে তেমন শীতবস্ত্র নেই। শীত-গ্রীষ্মের বোধও নেই বোধহয়।
