না হরদা, আমি একটু কফি করতে এসেছি।
আপনি করবেন কেন? আপনার শরীর খারাপ, আমি করে দিচ্ছি।
আমিই করব। গ্যাস খালি আছে?
খালি করে দিচ্ছি।
জল গরম করতে করতে ভাবছিল পারুল। তাদের বাল্যপ্রেম কবেই উবে গেছে। ভাটিয়ে গেছে বয়স। সময়ের অনেক পলিমাটির আস্তরণ পড়েছে ক্ষতচিহ্নের ওপর। বেড়েছে তাদের প্রিয়জন। পৃথিবীর কোনও ট্র্যাজিক ঘটনাই বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে না। তার ব্যথা-বেদনার উপশম করে দিয়ে যায় সময়। অমলের এই ভাঙচুরের জন্য পারুল কি দায়ি হতে পারে? সে কোনও অপরাধ করেনি। তার বাবার কাছ থেকে সে একটা জিনিস পেয়েছিল। সেটা হল মনের দুর্জয় শক্তি। নৈতিক সবলতা। তাই ওই বয়ঃসন্ধি পেরোনো বয়সে জীবনের প্রথম উজ্জ্বল পুরুষটিকে সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রেমিকই যদি হও তবে শরীরের ওপর লোভ করবে কেন? কেন রচনা করলে না প্রেমটাকে? শেষ অবধি সম্পর্কটা হয় তো বায়োলজিই, তবু কি মানুষ তার মধ্যেও সুন্দরের সঞ্চার ঘটায় না! পারুলকে কুমারী বয়সে ধ্বংস করে দিয়েছিলে তুমি, তারপর এখন দেবী বলে স্তবগান করো, এ কেমন ভড়ং!
অমলের কফি করা সোজা। চিনি নয়, দুধ নয়, শুধু কালো কফি।
হরনাথ বলল, দিদিমনি, আমি দিয়ে আসছি। ভরা গরম কাপ নিতে গিয়ে যদি পড়ে-উড়ে যান।
কিছু হবে না হরদা। পারব।
সাবধানী হরনাথ তবু বারান্দার বাতিটা জ্বেলে রান্নাঘরের সিঁড়ি পর্যন্ত সঙ্গে রইল। লোকটা বেশ বিনয়ী, কাজের লোক। তবে বলাকা বলে, হরনাথ কাজের হলে হবে কী, হাতটান আছে বাপু। জিনিসপত্র পাচার করে।
তা অবশ্য করতেই পারে। বলাকা একা কত দিকে নজর রাখবে! মাইনে-করা লোকের ওপর নির্ভর করতে গেলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতেই হয়। বস্তুবাদী বলাকা তাই বেশি ঘাঁটায় না।
উঠোনটা সাবধানে পেরুল পারুল। পেটে বাচ্চাটা আসার পর আজকাল সে ভীষণ সাবধানী হয়ে গেছে। খুব হিসেব করে পা ফেলে, খুব সাবধানে চারদিকে নজর রেখে চলে।
চুপ করে বসে আছে অমল। চোখে ভারী সুদূরে-হারিয়ে-যাওয়া দৃষ্টি।
তোমার কফি!
অমল সাড়া দিল না।
দুবার বলতে হল।
ওঃ হ্যাঁ। বলে তটস্থ অমল অপ্রতিভ একটু হাসল।
গরম কফিটা যেন গোগ্রাসে খাওয়ার চেষ্টা করছিল অমল। পারছিল না। হাত কাঁপছে, কফি চলকে যাচ্ছে, ঠোঁটে ছ্যাঁকা লাগছে। একবার বিষমও খেল।
তাড়াহুড়ো করছ কেন বল তো! আস্তে খাও।
অমল থমকে গেল। তারপর ম্লান মুখে বলল, আমার আজকাল হাত কঁপে কেন বল তো পারুল! এ কি নিউরোলজিক্যাল কিছু?
ডাক্তার দেখাও। এই বয়সে হাত কাঁপার কথা তো নয়!
তাই ভাবছি। কনস্ট্যান্ট হাত কাপে। আজকাল লিখতে বা ড্রয়িং করতে রীতিমতো কষ্ট হয়।
সবসময়ে কাঁপে?
হাতটা কোথাও রাখলে বা জোরে চেপে ধরে থাকলে কাপে না। কিন্তু যখনই চায়ের কাপ বা জলের গেলাস বা কম কিছু একটা ধরতে হয় তখন এত কাপে যে অবাক হয়ে যাই। এটা যে আমারই হাত তা যেন বিশ্বাস হয় না। এই হাত দুটো নিয়ে যে এরকম সমস্যা হবে তা তো কখনও ভাবিনি। তাই ভারী অবাক হয়ে যাই।
কাঁপা কাঁপা হাতেই প্লেটসুদ্ধু কফির কাপটা মুখের কাছে তুলে চুমুক দিচ্ছিল অমল। কাপে আর প্লেটে মৃদু ঠকাঠক শব্দ হচ্ছে। মলিন মুখ করে বলল, ডাক্তার দেখিয়ে কিছু হবে না পারুল। একে একে নিভিছে দেউটি।
তার মানে কী?
হাত যাবে, পা যাবে, চোখ যাবে, মাথা যাবে। সব নিবে যাবে। একদিন আমিও নিবে যাব, কিছুই থাকবে না আমার।
মরার কথা ভাব বুঝি খুব?
মাথা নেড়ে অমল বলে, আরে না। রোমান্টিক মৃত্যুচিন্তা আমার হয় না। কেন জানো? মরার রোমান্টিক চিন্তা তখনই হয় যখন তার জন্য কাঁদার বা হাহাকার করার বা অনুতপ্ত হওয়ার মতো কেউ থাকে। ভালবাসার লোক, আপনার লোক।
পারুল ভ্রূ কুঁচকে বলল, কী বলতে চাও তুমি বলো তো? তোমার জন্য ভাববার বা কাঁদবার কেউ নেই নাকি! পুরুষমানুষগুলো কি সবাই ন্যাকা আর বোকা? আজ না হয় তোমার সঙ্গে তোমার বউয়ের একটু খটাখটি আছে, তাই বলেই কি ধরে নিতে হবে যে সে তোমাকে ভালবাসে না? ছেলেমেয়ে দুটোকেই বা তুমি কতটা চেনো? ওসব ধরে নেওয়া সেন্টিমেন্টাল কথা বোলো না তো! ওসব শুনলে আমার ভারী রাগ হয়।
অমল এ কথায় যেন একটু লজ্জা পেয়ে বলল, না, সেরকম ভেবে কিছু বলিনি।
পুরুষমানুষের দোষ কী জানো? তারা বউ বা ছেলেমেয়ের কাছে হান্ড্রেড পারসেন্ট চায়। আর চাওয়াটা সে নিজেই ঠিক করে নেয়। বউ যে একটা আলাদা সত্তা, আলাদা পারসোনালিটি, ছেলেমেয়েদেরও যে নিজের মতো করে ভালবাসার রকম থাকতে পারে, সেটাই তারা বুঝতে চায় না।
মৃদু মাথা নেড়ে অমল হাসিমুখে বলে, আরে না। আমি ওসব ভাবি না।
তাই ভাব। ভাল করে নিজের মনের ভিতরটা খুঁজে দেখ। বুঝতে পারবে।
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব মৃদু স্বরে বলে, মরার কথা ভাবতে আমি যে ভয় পাই পারুল। ভীষণ ভয় পাই।
তবে বলছ কেন?
বলিনি। আসলে মনে হচ্ছে, আমি খুব বুড়ো হয়ে গেছি। জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসছে। খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। হাত কঁপে, স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি।
কারণটা খুঁজে দেখেছ?
খুঁজি তো! খুব খুঁজি। খুঁজে কিছু পাই না। আমার কি আলঝাইমারস ডিজিজ হল! কে জানে?
কিচ্ছু হয়নি তোমার। একটা ঝুঁকি মেরে সোজা হয়ে যাও।
একটু অবাক হয়ে অমল বলল, কথাটা কার বল তো! কে যেন কথাটা খুব বলত। মনে পড়ছে।
