টর্চটা নিয়ে উঠল পারুল।
মেয়ে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ মা?
বারান্দায়। এখনই আসছি।
একতলার অন্ধকার বারান্দায় পারুল চুপ করে টর্চ না জ্বেলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। না, ভুল নেই। অস্বস্তিটা হচ্ছে। খুব সূক্ষ্ম, খুব মৃদু, কিন্তু বিভ্রম নয়।
বারান্দার ধারে এসে পট করে টর্চটা জ্বেলে বাগানের দিকে ফেলল পারুল। শীতে গাছপালা মরে এসেছে একটু। এখন আর নিবিড় নয় গাছপালা। আলোটা অবধি দেখা যায়।
কাউকে দেখা গেল না অবশ্য।
পারুল ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে রইল। তারপর টর্চের আলো ফেলল চারদিকে। কাউকে দেখা গেল না।
ঘরের দিকে ফিরে পা বাড়াতেই হঠাৎ মৃদু একটা কাশির শব্দ পেয়ে দাঁড়াল পারুল।
কে? কে ওখানে?
আমি পারুল।
টর্চটা জ্বেলে পারুল দেখল বাগানের বেড়ার ধারে ঝুপসি বাবলা গাছটার পাশে একজন দাঁড়িয়ে।
কে?
আমি অমল।
পারুল ভারী অবাক হয়ে বলে, অমলদা! তুমি ওখানে কী করছ?
অমল খুব ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ভারী করুণ মুখে বলল, কিছু করছি না পারুল। এমনি ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখছি।
ঘুরে দেখছ! আচ্ছা মানুষ যা হোক! এই শীতে, অন্ধকার রাতে কেউ ঘুরতে বেরোয় বুঝি?
আমাকে দেখে ভয় পাওনি তো!
ভয় পাওয়ার দোষ কী? ওখানে দাঁড়িয়েছিলে কেন? ঘরে আসতে পারতে তো!
অমল উঠোনে বারান্দার নীচে এসে দাঁড়াল। মুখে ম্লান একটু হাসি। বলল, আজকাল আমার কেমন মনে হয়, আমাকে কেউ পছন্দ করে না। কারও কাছে গেলে সে বিরক্ত হয়।
যাঃ, ওসব তোমার মনের ভুল। এসো, ঘরে এসো।
আসব?
আসতে বাধা কীসের? এসো, গরম কফি খাও এক কাপ। চেহারার অমন ছিরি হয়েছে কেন?
অমলের গালে কয়েকদিনের দাড়ি, চুল বড় হয়েছে এবং ঝকড়া হয়ে আছে। পরনে পাজামা, পাঞ্জাবি আর একটা হাতকাটা সোয়েটার। বিজু যেমন বলেছিল ঠিক তেমনি। টর্চের আলোয় তেমন বোঝা গেল না, তবে মনে হল চোখের দৃষ্টিও কেমন ঘোলাটে।
এই লোকটাকে একদিন ভালবাসত পারুল। সেই ভালবাসা এখন আর নেই। কিন্তু মায়া তো আছে। কষ্ট তো আছে।
এই ভীষণ শীতে এ কী পোশাক তোমার অমলদা? শীত করছে না?
শীত! হ্যাঁ, শীত করে খুব। আমার রক্তের জোরও তো কমে আসছে।
তাহলে গরম চাদর বা ফুলহাতা সোয়েটার পরোনি কেন?
খেয়াল থাকে না।
ইস! আবার পায়ে চটি! পায়েই সবচেয়ে বেশি শীত লাগে, জানো না?
বললাম তো, ওসব খেয়ালই থাকে না।
খেয়াল কর না কেন? এত অন্যমনস্কতা কীসের?
অমল লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে একটু হাসল।
এসো, ঘরে এসো।
পড়ার ঘরের পাশের ঘরটিতে এনে অমলকে বসাল পারুল।
কী হয়েছে তোমার বল তো। এই তো দশ বারো দিন আগে কলকাতায় গেলে, আবার আসতে হল কেন?
অমল মাথা নেড়ে বলে, ভাল লাগছে না। কিছু ভাল লাগছে না।
বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আসনি তো? পুরুষদের বীরত্ব দেখানোর তো ওই একটাই জায়গা।
ঝগড়া! না পারুল, আমি ঝগড়া করতে পারি না। ইচ্ছেও হয় না।
তাহলে কী হল?
মন ভাল লাগছিল না। কেবল মনে হচ্ছে, সব ভুলভাল কাজ করছি। কিছু মনে থাকছে না, সবসময়ে আবোলতাবোল কী যেন সব ভাবছি। আজকাল ভীষণ ভীষণ ভয়ের স্বপ্ন দেখি।
ডাক্তার দেখাও না কেন?
সাইকিয়াট্রিস্ট?
তাই দেখাও।
অমল একটু চুপ করে থেকে বলল, এক সময়ে তাও দেখিয়েছি। ওষুধ খেয়েছি, তাতে ফল ভাল হয়নি। আমার সমস্যাটা বোধহয় মনোরোগ বা পাগলামি নয়। তা হলে কাজ হত।
লোকে কী বলে জান?
কী বলে?
আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না। কিন্তু কারও কারও ধারণা আমার জন্যই তুমি এমন হয়ে যাচ্ছ। শুনলে আমি কষ্ট পাই, তা জানো?
এ কথাটা আগেও বলেছ পারুল। কিন্তু একজন মানুষের কাছে নশ্বর এক নারীই তো সর্বস্ব হতে পারে না। পারে কি?
কোনও কোনও মানুষের কাছে হতেও পারে।
অমল মাথা নেড়ে বলে, তুমি আমার কাছে অন্য রকম। হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা তো তুমি নও।
ওটা তোমার আর একটা পাগলামি। আমাকে দেবী বানিয়ে কী মজা পাও বল তো?
তোমার কথা থাক পারুল। তোমাকে নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করার অর্থই হয় না।
বেশ তো! তোমার এ দশা কেন সেইটেই বলো।
আমার মনে হয় এতকাল যে অমল বেঁচে আছে সে ভুল অমল। ভুল তার মেধা, তার লেখাপড়া, তার চাকরি, তার বিয়ে। সব ভুল, ওটা আসল আমি নয়।
ওমা! সে কী কথা?
আমি আমার আসল আমিকে খুঁজে বেড়াই পারুল। তোমার কাছে পাগলামি মনে হবে হয়তো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমার ভিতরে একটা বিস্ফোরণ হবে একদিন। তারপর আসল আমির জন্ম হবে।
.
৪২.
রান্নার বামুনঠাকুর আছে। সম্প্রতি একজন বামুনদিকেও রাখা হয়েছে। বলাকার একার জন্য এত কাজের লোকের দরকার নেই। তবু রাখা হয়েছে এই নিরিবিলি বাড়ির জনহীনতার ভাবটা কমানোর জন্য। ছেলে আর মেয়েরা চায় মাকে ঘিরে একটা নিরাপত্তার বলয় রচনা করে দিতে। বলাকার তাতে ঘোর আপত্তি। প্রথম কথা হল খরচ। মাইনে এবং খাইখরচ মিলে এই মাগগিগণ্ডার দিনে বড় কম দাঁড়ায় না খরচের বহরটা। তা ছাড়া মুনিশ আছে, মালি আছে, পুষ্যি আছে। খরচ অবশ্য ছেলে-মেয়েরাই দেয়, কিন্তু বলাকার সেটা গায়ে লাগে। তার তো এত মানুষের দরকার নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
বামুনঠাকুর বা বামুনদিকে বললেই এক কাপ কফি করে দিতে পারত। কিন্তু কফি করতে উঠে এল পারুল নিজেই। আসলে অমলকে কী বলবে, কীভাবে বলবে তা ভাবতেও একটু ফাঁক দরকার ছিল তার। রান্নাঘরে অসময়ে পারুলকে দেখে তটস্থ বামুন রাঁধুনি হরনাথ বলল, কী দিদিমনি, কিছু লাগবে?
