আমাকে পেয়ে আর ছাড়তেই চায় না। হেঁটে হেঁটে আমার বাড়ি অবধি গেল। চা খেল। মায়ের সঙ্গে গল্প করল।
তখন পাগলামির লক্ষণ কিছু দেখলি?
না। মাঝে মাঝে নরমাল, কিন্তু মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক চোখে কেমন যেন উদাস ভাব, যেন কাউকেই চিনতে পারছে না। পরনে একটা আধময়লা পায়জামা, গায়ে হলদে রঙের একটা দোমড়ানো পাঞ্জাবি, তার ওপর খয়েরি সোয়েটার। শীতে জড়সড়। বললাম, গ্রামে বড্ড শীত, গায়ে চাদর দেননি কেন? জবাবে বলল, চাদর! ও হ্যাঁ একটা চাদরও তো গায়ে দেওয়া যেত। খেয়ালই হয়নি।
মুখে মদের গন্ধ পাসনি?
না।
একটা শ্বাস ফেলে পারুল বলল, পাগলামি নয়। অনেক রকমের অবসেশনে ভুগছে।
ওরকম একটা ব্রাইট লোক কেমন হয়ে গেল বল তো!
পারুলের জিভে শাঁকালু আরও বিস্বাদ ঠেকছিল। দুর্বল গলায় সে বলল, সেটাই তো ভাবছি, বোধহয় অত ব্রাইট হওয়ার দরকার ছিল না ওর। সাদামাটা হলে বেঁচে যেত।
অনেকে বলে, তোমার জন্যই নাকি অমলদা ওরকম হয়ে গেছে। সত্যি পারুলদি? এ আমলে তো ওরকম প্রেম দেখি না আমরা।
পারুল লজ্জা পেয়ে বলে, দুর পাগলা! সেসব কত দিনের কথা! এতদিন কেউ এসব মনে পুষে রাখতে পারে নাকি? কত মৃত্যুশোকও ভুলতে হয় মানুষকে, আর এ তো প্রেমশোক!
প্ৰেমশোক! এটা কি বানালে নাকি?
মনে হল, তাই বললাম। না রে, আমার জন্য নয়। অমলদার অনেক গার্লফ্রেন্ড ছিল শহরে গঞ্জে। পারুলকে ভুলতে ওর সময় লাগেনি। অমলদার প্রবলেম প্রেম-ট্রেম থেকে নয়। হয়তো ফ্যামিলি বা ক্যারিয়ারে কিছু গণ্ডগোল আছে।
কিংবা জিন! এসব তো জেনেটিক ব্যাপারও হতে পারে।
ওসব আমি জানি না বাপু।
লোকটার জন্য ভারী কষ্ট হল। একসময়ে লোকটাকে খুব ডাঁটে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। এখন একদম জবুথবু। এই লোকটাই যে সেই লোকটা তা মনে হয় না। অমলদা যে নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটা বোধহয় সত্যি। সেই অমলদা তো এ নয়।
অত ভাবিস না। যে যেরকম কপাল করে আসে তার তো তাই হবে।
কপাল! তাই হবে। আমি তো কপাল মানি না। লোকটার সব থেকেও কিছু নেই কেন সেটাই ভাবছি।
তুই কমিউনিস্ট, না?
এক সময় ছিলাম।
এখন নোস?
দুর। সাচ্চা কমিউনিস্ট হওয়া কি সোজা কথা? যখন দেখলাম আমাকে ক্যারিয়ার-ট্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে হবে, টাকা কামাতে হবে, সংসার প্রতিপালন করতে হবে তখনই কমিউনিজমকে নমস্কার করে পাশ কাটিয়ে এসেছি। পিছুটান থাকলে ওসব হয় না। সব ছেড়ে আদাজল খেয়ে লাগতে হয়। হাফ কমিউনিস্ট হয়ে লাভ নেই।
.
দুপুরে মা আজ নিজে রাঁধল। গোলমরিচ আর মাখন দিয়ে আলুমরিচ, সঙ্গে কলাইয়ের ডাল আর এক বাঙাল বাড়ি থেকে রাঁধিয়ে আনা শুঁটকি মাছ।
খেতে বসিয়ে বলল, আজ অখাদ্যই দিয়েছি মা। মুখে দিয়ে দেখ, দুটি খেতে পার কি না। নইলে অনল ডাক্তারকে ডাকতে হবে।
পারুল আজ খেতে পারল। এবং খাওয়ার পর বমিও পেল না। বলাকা ছাঁচি পান সেজে রেখেছিল, বমি পেলে দেবে। তার দরকার হয়নি। দুপুরে লেপমুড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েও নিল পারুল।
বিকেলে শরীর ঝরঝরে লাগছিল যেন। দুর্বল, তবে সাংঘাতিক কিছু নয়।
সন্ধেবেলা শরীরটা ভাল থাকায় ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে পড়াতে বসেছিল পারুল।
হঠাৎ কেমন একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি বোধ করছিল পারুল। স্পষ্ট কিছু নয়, কেমন একটা ভয়-ভয়, ছমছম অনুভূতি। শীত পড়লেও বাগানের দিকটায় পুবের জানালার একটা পাল্লা খুলে রাখে পারুল। সব বন্ধ থাকলে তার মাথা ঝিমঝিম করে। খোলা পাল্লার ওপাশে অন্ধকার বাগান। সেই দিকে চেয়ে পারুল কিছুক্ষণ আনমনা রইল। অস্বস্তিটা কীসের তা বুঝতে পারল না। পেটে বাচ্চা আসায় যে নানা রকম বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন হয়েছে তার শরীরে এটাও কি তাই?
তার ছেলেমেয়ে দুটিই লক্ষ্মী। মাথাও পরিষ্কার। ওরা নিজেরাই পড়ে, নিজেরাই বোঝে। মা কাছে থাকলে একটু খুশি হয় ঠিকই, কিন্তু পারুল ওদের পড়ায় না। পড়ানোর দরকার হয় না বলে। সময় পেলে শুধু কাছে বসে থাকে। এ দুজন লক্ষ্মী ঠিকই, কিন্তু পেটে যেটা এসেছে সেটা যে দস্যি হবে তাতে পারুলের সন্দেহ নেই। খুব দস্যি হবে, এই বয়সে পারুলকে ছুটিয়ে মারবে, হয়রান করে দেবে। ভেবে গায়ে কাঁটা দেয় পারুলের। ভয়ও পেটেরটাকে নিয়েই। এ সময়ে খারাপ হাওয়া বাতাস লাগাতে নেই। গাঁয়ে খারাপ হাওয়া বাতাসের কথা খুব শোনা যায়। খারাপ আত্মা তো কম নেই। তারাই খারাপ নজর দেয়। এসব এমনিতে বিশ্বাস করে না পারুল। কিন্তু এখন এক অপার্থিব মায়ায় আচ্ছন্ন মন বড্ড নরম আর দুর্বল। এখন কেবলই ভয়, কেবলই অমঙ্গলের ছায়া।
উঠে গিয়ে জানালার খোলা কপাটটা বন্ধ করে দিল পারুল। জানালার ওপাশের গাঢ় অন্ধকারটাকে ভাল লাগছে না তার।
জানালা বন্ধ হল, তবু অস্বস্তিটা গেল না পারুলের। অনেকদিন আগে কুমারী অবস্থায় তার এরকম অনুভূতি কখনও কখনও হত। তখন ঠিক বুঝতে পারত, আড়াল থেকে কেউ তাকে দেখছে।
রোজ স্কুলে যাওয়ার পথে বসাক বাড়ির ধার দিয়ে যাওয়ার সময় এরকম হত। পরে ধরা পড়েছিল সুধীর বসাকের ছোট ছেলে পন্টু রোজ জানালার আড়াল থেকে দেখত তাকে।
কিন্তু এখন তাকে কে দেখবে? সে দুই ছেলেমেয়ের মা, পেটে আরও একটা। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। তবু এরকম হচ্ছে কেন?
লোডশেডিং-এর জ্বালায় এখানে সন্ধের পরই হাতের কাছে টর্চ রাখে পারুল। এ-বাড়িতে উঁচু উঁচু চৌকাঠ, জিনিসপত্রে আর ভারী ভারী আসবাবে ঠাসা সব ঘর। অন্ধকারে কোথায় হোঁচট খায়, কোথায় ধাক্কা লাগে সেই ভয়ে মা বলেছে সঙ্গে সবসময় টর্চ রাখতে।
