কতক্ষণ ধরে যে আদর করেছিলুম তোমায়। আদর যেন আর ফুরোয় না। আর সেই আদরের ভিতর দিয়েই বুঝি পারুল এল তোমার পেটে। তাই ভারী সুন্দর হল মেয়েটা।
হ্যাঁ গো, ঠিক তাই।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সূর্য প্রণামের পর নিঝুম হয়ে বলাকা প্রত্যক্ষ করছিল এইসব দৃশ্য। গায়ে শীতের কাঁটার মতো রোমাঞ্চ। মানুষটা নেই, না থেকেও কী ভীষণ জীয়ন্ত হয়ে আছে।
মা!
বলাকা ফিরে তাকায়।
ও মা, তোমার চোখে জল কেন? কাঁদছিলে নাকি?
লজ্জা পেয়ে বলাকা আঁচলে চোখ মুছে একটু হেসে বলে, দুঃখের কান্না নয় রে, পুরনো কথা মাঝে মাঝে বড্ড মনে পড়ে যায় তো।
পারুল হেসে বলে, মাঝে মাঝে নয় মা, তুমি এখনও পুরনো কালেই রয়েছ যে! তোমাকে আর আমাদের এই সময়ে টেনে আনতে পারলাম কই!
পুরনো নতুন কোনওটাকে বাদ দিয়ে কি এই বেঁচে থাকা! জীবনটা তো কোনওটাকে বাদ দিয়ে নয়। যে ভুলে যায় সে অভাগা। হা রে, কাল রাত থেকে তো তোর উপোস চলছে। এভাবে কি চলে?
কী করব বলো! খাওয়ার কথা ভাবতেই যে অরুচি। খাবারের গন্ধে পা গুলোয়।
এ সময়টায় অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে ইচ্ছে যায়। তা অখাদ্যই বা কী দি-ই তোকে। চালভাজা খাবি?
ম্যা গো।
রোজ রাতে বমি হচ্ছে, এসব তো ভাল নয়। চেহারাটা তো সিটকে মেরে গেছে। অমন রূপ যেন কালিঢালা।
জামশেদপুরে গেলে হয়তো এটা কেটে যাবে। তোমার জামাই তো কাল আসছে নিয়ে যেতে। তোমার মন খারাপ হচ্ছে না মা?
ওমা! তা আর হবে না। কটা দিন কাছে ছিলি, ভরে ছিলুম।
মোটেই তোমার মন খারাপ হচ্ছে না।
তাই বুঝি?
একাই তুমি ভাল থাকো, আমি জানি।
খুব বুঝেছ মা! একা যেন তোকে থাকতে না হয়, থাকলে বুঝতিস।
তাহলে চলো না আমাদের সঙ্গে। তোমার জামাই ভাল গাড়ি নিয়ে আসছে। দামি এ সি গাড়ি। আঁকুনি-টাকুনি লাগবে না। বাড়ির দরজায় চাপবে, একদম জামশেদপুরের বাড়িতে গিয়ে নামবে।
প্রস্তাব তো আর খারাপ নয়। কিন্তু তোর বাবা যে-গন্ধমাদন আমার মাথায় চাপিয়ে গেছে তা কি আর ঝেড়ে ফেলে যেতে পারি। বিষয়-আশয় দিয়ে বেঁধে রেখে গেছে। কিন্তু এসব খেলনাপাতি কি আর ভাল লাগে বল!
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাকে আর নড়ানো যাবে না এখান থেকে, সে জানে। বিষয়-আশয় নয়, এখানে তার বাবার স্পর্শ আর গন্ধ আজও পায় তার মা। লোকটা বেঁচে নেই, তবু কী ভীষণ বেঁচে আছে।
শাঁকালু নেই মা?
বাগানে আছে বোধহয়। কেন, খাবি?
চেষ্টা করে দেখতে পারি।
দাঁড়া, দুখুরিকে বলি, এনে দেবে।
বেলার দিকে ভটভটি চেপে বিজু যখন এল, তখন নীচের বড় ঘরের চওড়া বারান্দায় রোদে বসে শাঁকালু চিবোচ্ছে পারুল। মুখ বেঁকিয়ে বলল, কী খাচ্ছ? শাঁকালু! দুর, ও কি মানুষে খায়?
পারুল হেসে বলল, তবে কি গোরুতে খায়?
তোমার কী হয়েছে বলো তো, ফের ডায়েটিং করছ নাকি? অমন ডিহাইড্রেটেড চেহারা করেছ কেন?
ছোট ভাই, তাকে তো আর বলা যায় না কিছু। পারুল বলল, রোগা হওয়া কি খারাপ?
তা বলে এত রোগা! বাঁশপাতার মতো হয়ে যাচ্ছ যে!
মোটরবাইকটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে সিঁড়িতে এসে বসল বিজু।
তোর প্র্যাকটিস এখন কেমন রে?
খারাপ নয়। তবে সেটা আমার গুণে তো নয়।
তবে কার গুণে?
জ্যাঠামশাই আমাকে ল পড়তে বলেছিলেন। পাস করার পর জুনিয়র করে নেন। তাঁর মক্কেলগুলোই পেয়ে গেছি। বেশি কষ্ট করতে হয়নি।
তোকে দেখে তো ফচকে ছোঁড়া মনে হয়। মক্কেলরা তোকে বিশ্বাস করে?
যখন উকিলের ধরাচুড়ো পরে বেরোই তখন তো দেখনি। রীতিমতো গুরুগম্ভীর চেহারা তখন। জজরা পর্যন্ত সমীহ করে।
ইস রে! একদিন দেখাস তো পোশাক পরে। দেখব কেমন গুরুগম্ভীর।
এখন তো কোর্ট বন্ধ। পুজোর ছুটি ফুরোয়নি। না হলে দেখাতাম।
বিটনুনের টাকনা দিয়ে একটা-দুটো শাঁকালুর টুকরো খেতেও যেন কত পরিশ্রম হচ্ছে পারুলের। পেটের নতুন অতিথির সঙ্গে মনে মনে অনেক ঝগড়া করে পারুল। কেন রে দুষ্ট, মাকে এত কষ্ট দিস? লক্ষ্মী ছেলের মতো থাক না চুপটি করে।
আবার ভাবে, এই কষ্টটুকুর মধ্যেও তো সুখ আছে। একটা শরীরের মধ্যে আর একটা শরীর জন্মাচ্ছে, বাড়ছে, সোজা কথা? এই আশ্চর্য ঘটনা তো সাদামাটাভাবে ঘটা উচিত নয়। যে আসছে সে জানান দিচ্ছে, করাঘাত করছে দরজায়।
কাল রাতে অমলদাকে দেখলাম, বুঝলে পারুলদি?
অবাক হয়ে পারুল বলে, অমলদা! আবার এসেছে বুঝি?
হ্যাঁ। বেশ রোগা হয়ে গেছে। মাধবের ওষুধের দোকানে দেখা। প্রথমটায় আমাকে চিনতেই পারল না, কেমন ভ্যাবলার মতো চেয়ে রইল। কী যে হয়েছে লোকটার কে জানে!
পারুল বলল, বোধহয় বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া।
তাই হবে হয়তো। আমার কী মনে হয় জানো?
কী?
লোকটা দুম করে মরেটরে না যায়। সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি বলেই কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে।
চমকে উঠে পারুল বলে, ওমা! সে কী রে?
কাল কথা বলতে বলতে অনেকক্ষণ হাঁটলাম একসঙ্গে। কী বলছিল জানো?
কী?
বলল, আমি কেন এসেছি জানো? নিজেকে খুঁজতে। এই যে এইসব মাঠঘাট, এই যে গাছপালা, এর মধ্যেই আমি যেন ছড়িয়ে রয়েছি। বুঝলে, সময় বলে কিছু নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু ঘটে আছে। একদিন ঠিক আমার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যাবে। শুনে তো আমি হাঁ। লোকটা কি শেষে পেগলে গেল নাকি পারুলদি?
পারুল স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, এরকম অবস্থা হয়েছে বুঝি? জানতাম না তো?
