গৌরহরি বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে মিটিমিটি হেসে বলেছিল, ওরে বাবা, নাস্তিক হওয়া যে খুব কঠিন কাজ।
কেন মশাই, কঠিনটা কীসের? বিশ্বাস না করলেই হয়।
সে তোমার মতো মুখর হয়। ভাল নাস্তিক হতে গেলে মহাজ্ঞানী হওয়া লাগে। বিজ্ঞান, দর্শন, শাস্ত্র, তপস্যা সব গুলে না খেলে কি নাস্তিক্য দাঁড়ায়? সবটা জেনে বুঝে তবে বুক ফুলিয়ে বলতে পারা যায়, ওহে বাপু, আমি সাধনা-টাধনা সব করে দেখেছি, কিচ্ছু নেই। বুঝলে মক্কেল, নাস্তিক হওয়া বিস্তর ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার। তার চেয়ে আস্তিক হওয়া সোজা।
আপনি কি সেই জন্যই আস্তিক?
সেই মিটিমিটি হাসি হেসেই গৌরহরি বলল, আমি কেন আস্তিক তা আমি জানি। কিন্তু বাপু, তুমি কেন নাস্তিক তা কি তুমি জানো? ভগবান আছে, এ বিশ্বাস যদি হাইপথেটিক্যাল হয় তাহলে ভগবান নেই, এই বিশ্বাসও হাইপথেটিক্যাল। সুতরাং লড়াই ছেড়ে মামলার কথায় এসো, তাতে সময় কম নষ্ট হবে।
মক্কেল চুপসে গিয়েছিল।
কিন্তু আজকাল বলাকারও ওরকম সব বিপজ্জনক কথা মাথায় আসে। গৌরহরি কাছে থাকতে এসব প্রশ্ন মনে উদয় হত না। আজকাল হয়। একদিন তো স্বপ্ন দেখল, গৌরহরি শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম হাতে দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
হ্যাঁ গা তুমি নাকি নারায়ণ! ও মা! টের পাইনি তো কোনওদিন।
গৌরহরি মিটিমিটি হেসে বলল, টের পাবে কী করে? কাছে পেলে কি আর টের পাওয়া যায়? যদি পাওয়ার জন্য কষ্ট করতে হত তাহলে ঠিক টের পেতে!
তা এখন কী করব তোমাকে? পুজো করব?
ভালবেসো, তাতেই হবে।
ভালবাসার কথা আর বোলো না। ভালবেসেই তো মরেছি। তুমিও গেলে আর আমারও যেন অর্ধেক প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। আরও ভাল কী করে বাসা যায় বল তো?
তা বটে। তোমার আমার ভালবাসার কথা সবাই বলে। কত কষ্ট দিয়েছি তোমাকে, কোনওদিন রাগ করলে না আমার ওপর।
কষ্ট! কষ্ট বলে বুঝতেই পারলুম না তো কখনও। তোমার মুখখানা খুশি দেখলেই বুক ভরে যেত।– আর তুমিও কি কম কষ্ট করেছ আমার জন্য? সেই টাইফয়েডের কথা মনে নেই? তখন আমার এগারো বারো বছর বয়স। শ্বশুর-শাশুড়ি দেওরননদ সব দল বেঁধে তীর্থ করতে গেছে। ফাঁকা বাড়িতে রুগি আগলে শুধু তুমি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় দাস্ত হচ্ছে, এলিয়ে পড়ছি, তখন কম করেছ তুমি? কোলে করে পায়খানায় নিয়ে গেছ। পথ্যি বেঁধে খাইয়েছ। মাথার কাছে ঠিক বাবার মতো বসে থেকেছ দিন রাত।
ও কিছু নয়। আমি ছাড়া তোমাকে দেখার তো কেউ ছিল না।
অন্য কেউ হলে বউকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিত, নইলে শাশুড়িকে এনে সেবার কাজে বহাল করত। তাই তো নিয়ম। পুরুষেরা তো ওরকমই হয়। তুমি তো তা করোনি। হ্যাঁ গা, কেন করেছিলে আমার জন্য অত কষ্ট?
দুর! আমার তো কষ্ট বলে মনেই হয়নি।
আমার খুব ইচ্ছে হয় ফের সেই সময়টায় ফিরে যাই। ফের আমার টাইফয়েড হোক আর শিয়রে তোমার মুখখানা জ্বলজ্বল করুক। জ্বরের ঘোরে মাঝে মাঝে চেয়ে তখন তোমাকে দেখতুম, আর ভারী নিশ্চিন্ত লাগত। তখন তো আমার একটুখানি বয়স, গা থেকে বাপের বাড়ির গন্ধ যায়নি, তবু মা নয়, বাবা নয়, তখন দিনরাত শুধু তোমাকেই চাইতুম।
মিটিমিটি হাসছিল গৌরহরি, বলাই, তুমি নাকি সহমরণে যেতে চেয়েছিলে আমার সঙ্গে!
চেয়েছিলুম তো। মনেপ্রাণে চেয়েছিলুম।
কেন বলাই, আমার সঙ্গে মরতে চেয়েছিলে কেন?
এখনই কি বেঁচে আছি! কবে মরব, কবে তোমার কাছে যাব শুধু সে কথাই ভাবি।
মরার কথা ভাবতে নেই বলাই। ভগবানের দেওয়া জীবন, তাঁর কাজ করতেই তো আমরা আসি।
আমার ভগবানও যেন তোমার সঙ্গেই ছেড়ে গেছে আমাকে। মাঝে মাঝে ভাবি, বোধহয় আমার ভগবান তোমার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। তাই কি আজ অমন নারায়ণের মতো দেখছি তোমাকে! হা গা, সত্যি তুমি ভগবান?
এক হিসেবে আমরা সবাই ভগবান। কম বেশি। তুমি তো দেখতে পাও না, তোমার মধ্যে আমি কতবার ভগবতীকে দেখেছি।
যাঃ, কী যে বলো। আমি পাপিষ্ঠা মেয়েমানুষ।
যার অত স্বামীর ওপর টান, পাপ তার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না যে। বলাই, তুমি জানো না, বেঁচে থাকতে তোমাকে আমার কতবার প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়েছে।
ও মা গো! ওসব কথা বলতে আছে? আমার পাপ হয় না ওতে?
তখন আমার মক্কেল জুটত না। কোর্টে যাই আসি, দু-চার টাকার বেশি আয় হত না দিনে। আমার বোন পুঁটির বিয়ে ঠিক হল। বাবা আমার কাছে দশ হাজার টাকা চেয়েছিল। মনে আছে?
থাকবে না কেন?
মুখ শুকনো করে বসেছিলুম একদিন, তুমি তোমার সব গয়না বের করে দিয়েছিলে। সিনেমায় ওসব দেখা যায় বা শরৎচন্দ্রের নবেলে। বাস্তবে তো হয় না। সেদিন তোমাকে আমার প্রথম প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়েছিল।
আহা, ভারী তো গয়না। তার দশগুণ তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ। সেই গয়নাই বা কোন কাজে লাগল বলো! দু হাতে বিলিয়ে দিলুম তো। ওসব বলে আর আমার পাপের বোঝা বাড়িও না।
শুধু গয়নাই তো নয় বলাই, সে সময়ে তোমার মুখে যে অহংকার দেখেছি তার দাম দিই কী করে? স্বামীর গর্বে তোমার বুকখানা তখন ঝকঝক করছে, মুখে উপচে পড়ছে খুশি। অবাক হয়ে ভেবেছি সব গয়না দিয়ে দিচ্ছে, তবু ও এত খুশি কেন? এত আনন্দ কেন ওর চোখে মুখে? ভেবে কূল পাইনি। তখন কী করেছিলুম মনে আছে?
উঃ মা গো! ফের লজ্জা দিচ্ছ আমায়।
মনে নেই?
কেন থাকবে না? ভাবলে আজও শরীর শিউরে ওঠে। বুকে জড়িয়ে ধরে–ইস–
