তা জানি না। খুঁজে দেখবখন।
কেউ যেন টের না পায়।
তুমি যাও না, কেউ টের পাবে না।
জিজিবুড়ি জানালা থেকে অদৃশ্য হল।
বুড়ো-বুড়িদের প্রতি এক ধরনের মায়া আছে মরণের। বুড়ো বুড়িদের কাছে গল্পের ঝুলি থাকে। কাছে বসলেই কত কথা শোনা যায়। জিজিবুড়িকে সবাই হ্যাঁক-ছিঃ করে বটে, কিন্তু মানুষটাকে মরণ তেমন অপছন্দ করতে পারে না। তার অসুখ-বিসুখ হলে জিজিবুড়ি হামলে এসে পড়ে। মায়ের সঙ্গে যখন ঝগড়া করে দু-চারদিন আর এমুখো হয় না তখনও মাঠেঘাটে যেখানে তোক জিজিবুড়ি গিয়ে তার খোঁজখবর নেয়।
কয়েকদিন আগে জিজিবুড়ি ভারী কাঁচুমাচু হয়ে এসে তাকে ধরে পড়েছিল। ও দাদা মরণ, আমাকে বাঁচাবি ভাই?
কেন, তোমার আবার কী হল?
আফিং ছাড়া যে আর বাঁচি না দাদা। আর দু-চারদিন হয়তো চলবে। তারপর আফিং না জুটলে যে পেট ছেড়ে দেবে দাদা। আর বাঁচার উপায় নেই।
আফিং! কিন্তু আমি আফিং কোথায় পাব?
সে কথাই তো বলতে আসা। তোর মা তোর বাপকে কলকাতা যাওয়ার সময় একটা ফর্দ ধরিয়ে দেয় ফি হপ্তায়। তাতে একটু লিখে দিবি আফিং-এর কথা?
মাকে বলো না লিখে দিতে।
সে লিখবে না দাদা, আমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। তুই একটু চুরি করে লিখে দে।
বাবা টের পেলে পিঠের ছাল তুলে ফেলবে।
তোর মাকে আমি বুঝিয়ে বলে রাখবখন। সে যদি বলে সে-ই লিখেছে তাহলে বাঙাল মোটেই রাগ করবে না। লিখবি ভাই? প্রাণটা তাহলে আমার বাঁচে।
না জিজিবুড়ি, মা ভীষণ বকবে।
বকলে আমাকে বকবে, তোকে তো আর নয়। আমি তোর মাকে বুঝিয়ে বলবখন।
কাজটা খুব কঠিন ছিল না। মা ফর্দ করে টেবিলের ওপর পাউডারের কৌটো চাপা দিয়ে রাখে। ফর্দের শেষে মায়ের হাতের লেখা নকল করে মরণ লিখে দিয়েছিল, আফিং–দুই ভরি।
বাবা ফর্দমতো জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। শোয়ার ঘরে ব্যাগ ভর্তি জিনিস রাখা আছে। কিন্তু সেই গন্ধমাদন হাঁটকানোর সময় বা ইচ্ছে হয়নি মরণের। মা ঠিক বের করে দেবে।
মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পর বইপত্র গুছিয়ে রাখছিল মরণ। বাবা যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ সে লক্ষ্মী ছেলে। নইলে এতক্ষণে দুই লক্ষে কাঁহা কাঁহা মুলুক চলে যেত!
বইপত্র গুছিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েই থমকে গেল মরণ। তার বাবা কাককে রুটি খাইয়ে ফিরছে। ঠিক সেই সময়ে দাদাকে ফলের রস দিতে উঠোনে বেরিয়ে এসেছে মা।
বাবা হঠাৎ তার মায়ের দিকে চেয়ে বলল, আগো, আফিং কার লিগ্যা আনতে দিছিলা? ঠাইরেনের লিগ্যা নাকি?
মরণ শিউরে উঠে ঘরের মধ্যে ফের সেঁদিয়ে এল।
বাসন্তী অবাক হয়ে বলে, আফিং! আফিং-এর কথা আবার তোমাকে কখন বললাম?
মনে নাই? তাজ্জব মাইয়ালোক! ফর্দের মইধ্যেই তো লেখা আছিল, আফিং দুই ভরি।
ও মা গো! দেখি ফর্দটা!
ব্যাগের মইধ্যেই আছে। ক্যান, তুমি লেখ নাই?
হঠাৎ বোধহয় বাসন্তীর কাণ্ডজ্ঞান মাথাচাড়া দিল। সুমনের হাতে রসের গেলাসটা দিয়ে বলল, দাঁড়াও ভেবে দেখি। এই ছেলের অসুখ নিয়ে আমার মাথা এত গরম যে কিছু মনে থাকছে না।
তাই কও। আমি তো ভাবলাম ভূতে লেখল নাকি। যাউক গা, আফিং আনছি৷ ঠাইরেনরে পাঠাইয়া দিও।
ঠিক আছে।
মরণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ঠিক সময়ে মা ব্রেক না কষলে তার কপালে বিস্তর দুঃখ ছিল। জিজিবুড়িটা মহা পাজি। মাকে বলে রাখার কথা ছিল, কিন্তু রাখেনি।
মায়ের বকাঝকা বা মারধর তেমন গ্রাহ্য করে না মরণ। মায়ের হাতে মোটেই জোর নেই, মারলে লাগেও না। আর বকুনি তো অহরহ হচ্ছে, নতুন কিছু নয়।
সে গিয়ে চুপ করে দাদার কাছটিতে বসল।
সুমন মুখটা করুণ করে বলল, খুব রোগা হয়ে গেছি, না রে?
না তো! একটু ফর্সা দেখাচ্ছে।
ফর্সা নয়, ফ্যাকাশে। খুব দুর্বল।
আমারও খুব জ্বর হয়। আর পেট ছাড়ে।
বলে হি-হি করে হাসল মরণ।
৪১-৪৫. ন্যাড়ামাথা ব্রাহ্মণ
৪১.
ন্যাড়ামাথা ব্রাহ্মণটি ধীরে ধীরে উঠে আসছেন। সর্ব অঙ্গে ব্রহ্মচর্যের দীপ্তি। অঙ্গজ্যোতিতে চারদিক রাঙা হয়ে যাচ্ছে ক্রমে। চারদিকে তার অভ্যর্থনা। পাখি ডাকে, গাছপালাতেও নীরব কোলাহল ওঠে যেন। মাটি থেকে আকাশের মধ্যবর্তী যা-কিছু সকলকেই যেন স্পর্শ করে সেই আলোর শিহরন।
সূর্যকে কেন ব্রাহ্মণ বলে মনে হয় বলাকার কে জানে। রোজ সকালে সে গৌরহরির পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যকে প্রণাম করত। আজও করে। এক দীপ্ত ব্রাহ্মণকেই যেন নিবেদিত হয় সেই প্রণাম। পুবের জানালায় দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ সম্মোহিত চোখে চেয়ে থাকে মুণ্ডিত মস্তকটির দিকে। এই সময়টায় বড় পবিত্র মনে হয় নিজেকে। তারও হয়তো তেমন কোনও কারণ নেই। হয়তো সবই কল্পনা করে নেওয়া, ধরে নেওয়া। তা হোক, তবু এইটুকুই তার লাভ। •
আজকাল বলাকার নানা প্রশ্ন ওঠে মনের মধ্যে। তার মধ্যে একটা হল ভগবান। ভগবান বলে কেউ কি আছে? থাকলে কেমন দেখতে? ভগবানকে দিয়ে কী হয় মানুষের? কত মানুষ তো ভগবান-টগবান মেনেও দিব্যি হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। তাহলে কি সকলের ভগবান দরকার হয় না?না মানলেও চলে?
গৌরহরি সন্ধ্যাআহ্নিক নিয়মিত করত। কখনও ভুল হত না। প্রায় সময়েই গীতা খুলে বসত। গুরুগম্ভীর গলা আর চমৎকার উচ্চারণে একটু সুরের ওপর যখন পাঠ করত তখন যেন বাড়িটায় একটা ঢেউ খেলে যেত।
একবার এক ঘোর নাস্তিক মক্কেল গৌরহরিকে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা চাটুজ্জেমশাই, আপনি তো একজন শক্ত মনের মানুষ, প্রবল আপনার পারসোনালিটি; টাকাপয়সা, স্বাস্থ্য, সম্পদ সব আপনার আছে। তার ওপর আবার ঈশ্বরবিশ্বাসের দরকার কী? ঈশ্বরবিশ্বাস তো ধান্দাবাজি। ভগবানকে পটিয়ে পাটিয়ে নিজেরটা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য মতলববাজরা ওসব করে।
