মায়া আর একটাও আছে। সে হল পান্না। জ্বরের ঘোরের মধ্যেও পান্নার মুখ বারবার হানা দিয়েছে মনের মধ্যে। এই সকালের বাতাসেও তো তার দেহস্পর্শ! ভাবলে গা শিউরে ওঠে।
রান্নাঘরে খদ্দরের চাদরে মুড়িসুড়ি দিয়ে উনুনের ধারে বসে দুধ-চা খাচ্ছিল জিজিবুড়ি।
গজগজ করতে করতে বলল, আদিখ্যেতা দেখালি বটে বাবা! বলি গু মুতও কাচলি নাকি ওই ধেড়ে ছেলের।
বাসন্তীর মনটা বড় ভাল আছে কদিন। কান ভরে সুমনের গালভরা মা ডাক শুনেছে। বুক ঠান্ডা। বলল, দরকার হলে কাচতাম। দরকার পড়েনি তাই।
ওঃ, একেবারে নবদ্বীপের গোঁসাই এয়েছেন যেন। একটু গা গরম হয়েছে কি হয়নি অমনই একেবারে অনল ডাক্তার এসে হাজির। অমন ভালুক জ্বর তো আমাদেরও কতই হয় বাপু, কোথায় ডাক্তার, কোথায় বদ্যি! কাঁথামুড়ি দিয়ে পড়ে থাকলেই হয়।
খর চোখে মায়ের দিকে চেয়ে বাসন্তী বলল, থলিতে বিষ জমেছে, না মা? রোজ এসে এই সকালবেলাটায় তুমি আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়ে যাও।
তা বাছা, ভাল কথা বললে বাঁকা করে ধরিস কেন? সংসারের তো একটা রীতি আছে, নাকি? সতীনপো হল সতীনপো, সাপের বাচ্চা, যতই দুধ কলা দিয়ে পুষিস না কেন, ছোবল দিতে ছাড়বে ভেবেছিস?
সে যদি দেয় তো দেবে। কপালে যা আছে তা কি খণ্ডানো যায়? গাল ভরে মা বলে তো ডেকেছে। সে-ই আমার ঢের।
তবে আর কী, পিটুলিগোলা খেয়ে দুধ খেয়েছি বলে নেত্য করগে। বলি দিনরাত অত লোক দেখানো সেবা দেওয়ার কী দরকারটা ছিল? ঠান্ডা লেগে একটু গা গরম হয়েছে বৈ তো নয়। তার মতো হ্যাঁবাকান্ত দেখিনি বাপু। অমন ভালমানুষি করলে দুনিয়ার সবাই তোর মাথায় হাত বুলিয়ে নেবে। এখন থেকে শক্ত হ।
তোমাকে আর হিতোপদেশ দিতে হবে না মা। আমি যা ভাল বুঝেছি করেছি।
গেলাসটা বাড়িয়ে জিজিবুড়ি বলল, দে তো গরম দুধে একটু লিকার ফেলে। যা ঠান্ডা পড়েছে, তেমন জুত হচ্ছে না যেন।
গরম দুধের হাঁড়ি থেকে হাতা দিয়ে গেলাসে দুধ দিতে দিতে বাসন্তী বলে, আফিং-এর মাত্রা বাড়িয়েছ নাকি?
না বাড়িয়ে উপায় আছে? পেটটা ছেড়ে দিচ্ছে যে মাঝে মাঝে। এত আফিমের জোগানই বা আসবে কোত্থেকে।
তোমাকে আফিং ধরিয়েছিল কে?
কে আবার ধরাবে। নন্দ কোবরেজই ধরিয়েছিল। একটা সময়ে পেটের এমন ব্যামো হয়েছিল যে ওষুধে ধরে না। বোতল বোতল পাঁচন খেয়ে নলি-খলি পায়খানা। তা নন্দ কোবরেজ তখন আফিং ঠুসে দিয়ে বলল, এ হল মোক্ষম দাওয়াই। তখন কি আর জানতুম শেষে একটু আফিং-এর জন্য এমন হেদিয়ে মরতে হবে! সে আমলে কি আর চিকিৎসা ছিল মা?
দুধটুকু খেয়ে জিজিবুড়ি উঠল। বলল, ছেলে এসে সব দেখে-টেখে গেল। এবার মেয়ে আসবে। তারপর বড়বউ এসে হাজির হবে। তখন কী করবি ভেবে রেখেছিস?
অবাক হয়ে বাসন্তী বলল, ভাবাভাবির কী আছে? এলে আসবে। তারা তো আর ফ্যালনা নয়।
তারা ফ্যালনা নয় সে জানি। কিন্তু ফ্যালনা যে তুই।
তার মানে?
ভগবান তো তোকে বুদ্ধিসুদ্ধি দেননি, তাই বোকার মতো বলিস। বলি বড়বউ যদি এসে গেড়ে বসে আর তোকে দাসীবাঁদীর মতো খাটায় তাহলে তোর দশা কী হবে জানিস?
দাসীবাঁদীর মতো খাটাবে!
তুই তো দাসীবাঁদী হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছিস। ছেলের জন্য যা করলি তা তো দেখলুম। বড়গিন্নি এলে তো তোর আঁচলে পা মুছবে। এখন থেকে একটু মাথা খাটিয়ে চল। ওরা সব বাঙাল দেশের মানুষ, তুই ডালে ডালে চলিস তো ওরা চলে পাতায় পাতায়। তোর অত আদিখ্যেতার দরকার কী? নিজেরটা নিয়ে থাকবি। পারিস তো জমিজমা কিছু আমার বা ভাইদের নামে বেনামী করে দে। তাহলে আর গাপ করতে পারবে না।
বেনামী করব? কেন বলো তো!
তুই যা বোকা, কোথায় কোন কাগজে সইসাবুদ করিয়ে নেবে তার ঠিক কী? আমাদের নামে থাকলে তোরই থাকল, ওরাও দাঁত বসাতে পারবে না।
বাসন্তী গম্ভীর হয়ে বলল, তাই বুঝি তোমাদের নামে লিখে দিতে হবে! বেশ বললে তো মা, পালিশ করা কথা।
ভাল কথা তো আজকাল তোর সয় না। তোকে যে গুণ করে রেখেছে। যখন সব যাবে তখন এ কথার মর্ম বুঝবি।
মর্ম বুঝে আর কাজ নেই মা। তোমার ছেলেরা যে সাঁট করে তোমাকে পাঠায় সে আমি জানি। বলি আমার ভালটা তোমার কাছে এমন বিষ হয়ে গেল কেন বলো তো! আমাকে কি পেটে ধরোনি, নাকি?
খারাপ বলেছি কিছু? সবটা তো আর দিতে বলিনি। বললুম, অদিনের জন্য কিছু জমিজমা বেনামী করে রাখ, বিষয়ী লোকেরা তো তাই করে।
আমার আর বিষয়ী হয়ে কাজ নেই। তুমি এবার এসে গিয়ে।
যাচ্ছি বাছা যাচ্ছি, তাড়াতে পারলে যেন বাঁচিস। একটু উঁকি মেরে দেখ, বাঙাল আবার এধারে আছে কিনা, দেখলে তো তার আবার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়বে।
সে এখন কাককে রুটি খাওয়াচ্ছে।
জিজিবুড়ি বিদেয় হওয়ার পর বাসন্তী হাঁফ ছাড়ল। রোজ সকালে মা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ যেন একটা ভয় ঘিরে থাকে তাকে। পৃথিবীকে সে যখন নিজের মতো করে বুঝে নিতে চায় তখনই জিজিবুড়ি এসে তাকে উলটো কথা শেখায়।
রান্নাঘরের পাশ দিয়ে এক চিলতে একটা গলি। কচুপাতার আড়াল দিয়ে জিজিবুড়ি বেরিয়ে এসে পিছন দিয়ে মরণের পড়ার ঘরে উঁকি দিল।
মরণ এক রাগী মাস্টারের কাছে পড়ে আজকাল।
ও মরণ।
মরণ অঙ্ক কষতে কষতে মুখ তুলে বলল, কী বলছ?
বলি সব ঠিক আছে তো!
হ্যাঁ।
কখন দিবি দাদা?
তুমি যাও না, আমি ঠিক দিয়ে আসব।
বাঁচালি দাদা। জিনিসটা এসেছে তো!
