মাথা ধোয়ানোর পর শুকনো তোয়ালে দিয়ে মাথা মুখ মুছিয়ে বালিশে শুইয়ে থার্মোমিটার দেখে বাসন্তী বলল, তিন ডিগ্রি নেমে গেছে।
মুর্গির স্টু, শিং-মাগুরের সুরুয়া, ফলের রস কোনও আয়োজনই বাকি রাখেনি বাসন্তী।
রসিক একবার ভয় খেয়ে বলল, আরে, তুমি শুরু করছ কী? এত খাইলে পেট ছাইড়া দিব না?
কিচ্ছু হবে না। ডাক্তার বলে গেছে জোর করে খাওয়াতে। নইলে দুর্বল হয়ে পড়বে। আগেকার দিনে খেতে দিত না বলেই রুগি দুর্বল হয়ে পড়ত।
প্রথমে টাইফয়েড বলে সন্দেহ করলেও ব্লাড রিপোর্ট দেখে ডাক্তার অনল বাগচী বলল, ভয়ের কিছু নেই। ভাইরাল ফিবার।
চার দিনের দিন সকালে জ্বর নেমে গেল।
জ্বর যখন নেমে যাচ্ছিল, তখন সুমন খুব অস্থির বোধ করে ঘুম ভেঙে শিয়রে বাসন্তীকে খুঁজেছিল। সে সময়ে বাসন্তী ছিল না। ভারী অসহায় লেগেছিল সুমনের। জলতেষ্টা পাচ্ছিল, মাথাটা কেমন করছিল আর শরীরে যেন হাজার মাইল দৌড়ের পর নিঝুম ক্লান্তি। তার মনে হচ্ছিল সে অজ্ঞান হয়ে যাবে। চোখ যখন সত্যিই অন্ধকার হয়ে আসছে সে তখন বাচ্চা ছেলের মতো ক্ষীণ কণ্ঠে ডেকে উঠেছিল, মা! মা! কোথায় আপনি?
অত ক্ষীণ কণ্ঠ পাশের ঘর থেকে শোনার কথা নয় বাসন্তীর। তবু শুনতে পেল ঠিকই।
এক ছুটে চলে এল সুমনের কাছে, বাসন্তীর কোলে হাম্মি। কী হয়েছে বাবা? কী হয়েছে?
শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।
বাসন্তী গায়ে হাত দিয়েই বলল, জ্বর নেমে গেছে যে! ইস, অত হাই টেম্পারেচার এক লাফে নেমে যাওয়ায় এরকম হচ্ছে। দাঁড়াও বাবা, হট ওয়াটার ব্যাগ দিচ্ছি।
আপনি একটু কাছে থাকুন। আমার ভীষণ অস্থির করছে।
হ্যাঁ বাবা, আমি তো কাছেই আছি।
হট ওয়াটার ব্যাগ, পাখার বাতাস আরও কীসব করল বাসন্তী কে জানে। কয়েক মিনিট বাদে অস্থিরতা কমে গেল সুমনের। শরীর এত দুর্বল যে চোখ খুলতে পর্যন্ত পরিশ্রম হচ্ছে। সে শুনেছে খুব বেশি টেম্পারেচার হঠাৎ নেমে এলে রুগি হার্টফেলও করে অনেক সময়ে। অন্তত আগের দিনে করত।
বাসন্তীর দিকে কৃতজ্ঞ চোখে একবার চেয়ে সে গভীর ক্লান্তিতে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে চোখ চেয়ে দেখল, পুবের রোদে ভেসে যাচ্ছে ঘর। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। তার চেয়ে বেশি ঝলমল করছে তার শিয়রে বসে থাকা বাসন্তীর মুখ।
কেমন লাগছে বাবা? আমার জ্বর বোধহয় রেমিশন হয়ে গেছে, না?
হ্যাঁ বাবা। জ্বর নেই, গা একদম ঠান্ডা।
সুমন লজ্জার হাসি হেসে বলল, আপনাকে খুব জ্বালিয়েছি।
ওটুকু যে দরকার ছিল বাবা। না জ্বালালে কি মাকে চেনা যায়?
সুমন চুপ করে রইল। নিজের মাকে সে ভীষণ ভালবাসে। তেমন সে আর কাউকেই কখনও ভালবাসতে পারবে না। ঠিক কথা। তবু এই অদ্ভুত ভদ্রমহিলা সেই ভালবাসায় অনেকটা ভাগ বসিয়েছেন। একে তার মা বলেই ভাবতে ইচ্ছে করছে। এমনকী তার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে একটু যেন কষ্টই হচ্ছে।
আমি একটু রোদে বসব!
বসবে বইকী বাবা, দাঁড়াও, জানালার ধারে ইজিচেয়ার পেতে দিচ্ছি।
না না, ঘরে নয়। উঠোনে গিয়ে বসব।
ওমা! এই দুর্বল শরীরে সিঁড়ি ভাঙতে পারবে নাকি? মাথাটাথা ঘুরে যায় যদি?
পারব। ধরে ধরে নামলেই হবে।
আচ্ছা, তোমার বাবা বরং ধরে ধরে নামিয়ে নেবে।
শরীর যে কতটা দুর্বল তা সিঁড়ি ভেঙে নামবার সময় টের পাচ্ছিল সুমন। তার বাবা শক্তিমান মানুষ। শক্ত কেঠো হাতে ধরে সাবধানে নামাতে নামাতে বলছিল, পাতলা হইয়া গেছস, এক্কেরে পাতলা হইয়া গেছস!
উঠোনে খাটিয়া পেতে, তোশক বালিশ দিয়ে একেবারে রাজশয্যা রচনা করে রেখেছে বাসন্তী। শরীরটা রোদে আর মাথাটা যাতে ছায়ায় থাকে তারও ব্যবস্থা করেছে। সে শুতেই গলা পর্যন্ত একটা পাতলা কম্বলে ঢেকে দিয়ে বাসন্তী বলল, উত্তুরে বাতাস দিচ্ছে, হুট করে দুর্বল শরীরে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। কিছুক্ষণ গায়ে ঢাকাটা থাক। শরীর গরম হলে ঢাকাটা সরিয়ে দিও।
চার দিন পর ঘর থেকে বেরিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সুমন। উলটো দিকেই উঠোনের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড ঝুপসি নিমগাছ। তাতে সকালে রাজ্যের পাখিদের ডাকাডাকি। এখনও ফটকের পাশে শিউলি গাছটায় কেঁপে ফুল আসে। তলাকার ঘাসজমিতে সাদা-কমলা ফুলের যেন একখানা কার্পেট বিছানো রয়েছে। গোটা কুড়ি-পঁচিশ নারকোল গাছ উত্তুরে হাওয়ার ঝাপটা লেগে সাঁই সাঁই শব্দ তুলছে। মুনিশরা খাচ্ছে বারান্দায় বসে। পান্তা আর বাসি তরকারি, তেঁতুল আর লঙ্কা দিয়ে। উঠোনে নেচে বেড়াচ্ছে চড়ুই, শালিক। এই সামান্য দৃশ্যই যেন চোখ ভরিয়ে দিল সুমনের।
সোয়েটার আর কানঢাকা টুপিতে ঝুল্লুস হাম্মিকে উঠোনে ছেড়ে দিল মুক্তা। হাম্মি হামা দিয়ে সোজা এসে সুমনের খাটিয়া ধরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সুমনের দিকে। তারপর হাত বাড়িয়ে যা যা যা যা করে কী যেন বলার চেষ্টা করতে লাগল।
দুহাতে হাম্মির মুখটা ধরে আদর করল সুমন। কদিনেই বোনটা তার ভারী ন্যাওটা হয়েছে। ইদানীং মায়ের কোল থেকেও ঝাঁপ খেয়ে তার কোলে চলে আসে। ওর গায়ে মুখে আশ্চর্য শৈশবের স্বর্গীয় গন্ধ! কী নরম তুলতুলে শরীর। তারা দুই ভাইবোন কাছাকাছি বয়সের বলে বড় হয়ে সুমন চটকানোর মতো কোনও শিশুকে পায়নি। এখন হাম্মির জন্য আর একটা মায়া তৈরি হয়ে রইল এখানে।
