হীরা এসে উত্তেজিত চোখমুখে বলল, ইস, কী বিরাট গাড়ি রে দিদি, একেবারে ঝকমক করছে। উর্দিপরা ড্রাইভার।
ওরা কারা?
তোকে দেখতে এসেছে।
দেখতে এসেছে! দেখতে এসেছে কেন?
এ মা, তোর বিয়ের কথা হচ্ছে না?
মাথায় বজ্রাঘাত হলে বোধহয় এরকমই অবশ হয়ে যায় মানুষ। ছয় মাস আগে যে সবে ষোলো পেরিয়েছে, এর মধ্যেই বিয়ে? সে বিছানায় বসে পড়ে খাটের বাজুতে মাথা রেখে ঝিম ধরে রইল। বুকে ধড়ফড়ানি তো ছিলই, তার ওপর বমি বমি ভাব হতে লাগল। তখনও মনে হয়েছিল, মরি।
কী সুন্দর সুন্দর সব চেহারা ওদের। ফর্সা টকটক করছে। গিন্নিমার গা ভর্তি গয়না। সেজে আয় না একটু।
একটুও নড়েনি পান্না। ঝিম ধরে বসেই ছিল। মাথা ঘুরছিল তখন।
মা এসে বলল, এ কী! শরীর খারাপ করল নাকি? সর্বনাশ। ওঁরা যে বেশিক্ষণ বসবেন না। ওঠ ওঠ, লক্ষ্মী মা আমার। অমন করতে নেই। ব্যস্ত মানুষ ওঁরা, সময় করতে পারেন না বলে অসময়ে এসেছেন। এই রাতেই ফের বর্ধমানে ফিরে যাবেন। উঠে পড় মা।
কেমন বোধহীন, যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো সে উঠল, সাজল এবং বৈঠকখানায় গেল।
বৈঠকখানা আলো করেই কর্তা-গিনি, দুজন যুবক যুবতী এবং একজন বয়স্ক মানুষ বসা। চা খাবার দেওয়া হয়েছিল, ছোঁয়ওনি। তবে তাকে দেখেছিল ড্যাব ড্যাব করে।
বাবা বলে উঠল, গান জানে, লেখাপড়াতেও ভাল।
কর্তা বোধহয় তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল, গিন্নি জিজ্ঞেস করেছিল তার বয়স কত। খালি গলায় একটা গানও শোনাতে হয়েছিল, মনে আছে। অমন শুকনো গলায় প্রাণান্তকর গান সে জীবনে গায়নি।
তারা বাবাকে জানিয়ে গিয়েছিল, এই মেয়ে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। এখন কোষ্ঠী মিললেই হয়।
বাবার সেই রাত্রে কী আস্ফালন, বড়দা ভেবেছে তার মেয়ের মতো পাত্র আর কারও জুটবে না? অ্যাঁ! এই যে পাত্রপক্ষ দেখে গেল এরা দশটা জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলিকে কিনতে পারে।
কিছুদিন বাবাকে ওই পাগলামি পেয়ে বসেছিল। গৌরহরি চাটুজ্যে দুই ভাইকে টাকা দিয়ে পৈতৃক বাড়ির দুটো অংশ কিনে নেন। সেখানে কোনও গোলমাল ছিল না। দুই ভাই নরহরি আর রামহরি কাছাকাছি নিজেদের বাড়ি করে ফেলেছিল। গোলমাল বেঁধেছিল জিনিসপত্র, বাসন-কোসন এবং গয়নাগাঁটি ভাগাভাগি নিয়ে। গৌরহরি চাটুজ্জে তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী এবং প্রবল ব্যক্তিত্বওলা লোক। তার ওপর দুঁদে উকিল। মামলা মোকদ্দমা না হলেও সালিশির বিচারে দুই ভাই হেরে গেল। রামহরির সেই থেকে হঠাৎ হীনম্মন্যতা দেখা দেয়। তার হঠাৎ মনে হয়েছিল বড়দা যেন বড্ড উঁচুতে উঠে গেছে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। নানাভাবে রামহরি গৌরহরিকে টপকানোর একটা অক্ষম চেষ্টা করেছিল কিছুদিন। তার মধ্যে একটা ছিল বড়লোক হওয়ার চেষ্টা। লটারির টিকিট কেনা, পলিটিক্সে নাম, ঠিকাদারি, পতিত জমি কিনে চাষ আবাদ। তাতে রামহরি কোনওটায় সফল, কোনওটায় বিফল হলেও গৌরহরিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। গৌরহরির মেয়ের বিয়েটাও তার চক্ষুশূল হয়েছিল। জামাই ছোটখাটো শিল্পপতিই শুধু নয়, অতিশয় সজ্জনও। রামহরি জামাই-ধরা প্রতিযোগিতায় বড়দাকে হারিয়ে দিতে কিছুদিন মরিয়া হয়ে নাবালিকা মেয়ের জন্য বড় বড় পাত্র ধরতে লেগে গিয়েছিল।
ভাগ্যিস এই পাগলামি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হলে এতদিনে পান্না কোনও বড়লোকের বাড়ির বউ হয়ে নির্বাসনে যেত। কে জানে বাবা। জীবনের রহস্যময় নানা আনন্দের শিহরন কোথায় হারিয়ে যেত। একদিন বিবেচক গৌরহরিই এসে রামহরিকে ঠান্ডা মাথায় কথা বলে শান্ত করলেন। বললেন, ভাগজোখ যদি তোর অন্যায্য বলেই মনে হয়ে থাকে তবে আমাকে এসে বলিস না কেন? যা চাস পাবি। পরিবারটাকে বিপদে ফেলিস না।
ভাব হয়ে যাওয়ায় তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল।
এই মুখপুড়ি, সন্ধেবেলায় ঘুমুচ্ছিস যে!
মুখে জোরালো টর্চের আলো পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসে পান্না।
ও মা! পারুলদি!
কাল চলে যাচ্ছি, তাই দেখা করতে এলাম।
এ সময়ে ভোল্টেজ কম থাকে বলে ঘরের টিমটিমে আলোয় ভাল করে কিছু দেখাই যায় না। তবু এই ম্লান আলোতেও যেন জ্যোতির্ময়ীর মতো দেখাচ্ছে পারুলদিকে।
তুমি যে কী করে এত সুন্দর থাকো কিছুতেই বুঝতে পারি না।
দুর বোকা, সুন্দর আর কোথায়! মা বলছিল রং নাকি অনেক কালো হয়ে গেছে। বয়সও কি কম হল? সাঁইত্রিশ। ও বাবা, সাঁইত্রিশ মানে তো বুড়ি।
তোমার একটুও বয়স হয়নি পারুলদি।
হয়েছে হয়েছে। অনেক কষ্ট করে ফিট রাখতে হয়। এক চুল এদিক ওদিক হলেই ওজন চট করে বেড়ে যেতে চায় আজকাল।
একটা মেয়ের সঙ্গে আজ ভাব হল, জানো! তার নাকি খুব ইচ্ছে ছিল তোমার মেয়ে হয়ে জন্মায়।
পারুল অবাক হয়ে বলে, সে কী রে! কে সেই মেয়েটা?
অমলদার মেয়ে সোহাগ।
পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলে, মেয়েটি এঁচোড়ে পাকা। ওর সঙ্গে বেশি মিশিস না।
মিশব কী? আজ পথ ভুল করে এসে পড়েছিল বলে আলাপ হয়ে গেল। অমলদা আজ আসবে, কালপরশুই চলে যাবে ওরা।
অমল রায় আসেনি। ওদের মধ্যে একটু গণ্ডগোল চলছে বোধহয়। তুই বেশি মাখামাখি করতে যাস না। ওরা অন্যরকম। মাথা গুলিয়ে দেবে।
কিন্তু পারুলদি, মেয়েটাকে যে আমার ভীষণ ভাল লাগল। সে বলছিল, তুমি নাকি একজন গডেস।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, গডেস হওয়া কি অত সোজা? মেয়েমানুষ হয়ে জন্মালে কত পাপ চারদিক থেকে ফণা তোলে। গডেস হয়ে থাকতে দেয় কই?
