আপনাকে ভীষণ মুশকিলে ফেললাম।
ছিঃ বাবা। ওরকম কথা বলতে নেই। আমি তোমাকে কখনও দূরের মানুষ ভাবিনি। তুমি কেন ভাববে?
না, আসলে, হঠাৎ কেন জ্বরটা যে হল!
জ্বর হয়েছে তো কী হয়েছে? এটা তোমার নিজেরই বাড়ি।
চা-টা মুখে দিয়ে দেখল সুমন। বিটনুন লেবু চিনি দিয়ে করা। চমৎকার স্বাদ। সবটুকু নিঃশেষে খেয়ে নিল।
গরম রুটি আর তরকারি নিয়ে আসছি।
আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না যে!
বেশি খেও না। একটা বা দুটো, আমার রান্না তোমার পছন্দ হয় তো।
সুমন হেসে ঘাড় কাত করল, হ্যাঁ খুব ভাল।
শুনেছি তুমি ধনেপাতা ভালবাসো। আজ ফুলকপিতে ধনেপাতা আর কড়াইশুঁটি দিয়েছি। কলকাতায় সারা বছর সব কিছু পাওয়া যায়। গাঁয়ে তো তা নয়। ধনেপাতা এখন বাজারে ওঠে না। তোমার বাবা ভালবাসেন বলে আমি বাগানে ধনেপাতা লাগাই।
আমার কলকাতায় যাওয়ার খুব দরকার।
যাবে, জ্বরটা কমলেই যাবে।
হাঁফাতে হাঁফাতে মরণ এসে বলল, খবর দিয়ে এসেছি মা। ডাক্তার আজ তাড়াতাড়ি আসবে। এলেই পাঠিয়ে দেবে পানুকাকু।
আচ্ছা, এখন দাদার কাছে বসে থাক। বেশি বকবক করবি না। জলপট্টিটা মাঝে মাঝে পালটে দিস। বাটিতে অডিকোলন মেশানো জল আছে। আমার উনুন জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, আপনি আসুন।
এখন তোমার কেমন লাগছে দাদা?
একটু ভাল, প্যারাসিটামল খেয়েছি তো, জ্বর কমে যাচ্ছে। এফেক্ট কেটে গেলে আবার জ্বর আসবে।
সুমনের বালিশের নীচে একটা চিঠি আছে। কালকেই কেউ চিঠিটা তার বিছানায় ফেলে গেছে। যে চিঠি দিয়েছে তাকে চেনে না সুমন। নাম শুভশ্রী। আজকাল গাঁয়ের মেয়েদেরও বেশ সুন্দর সুন্দর নাম রাখার রেওয়াজ হয়েছে। চিঠিটা সংক্ষেপে এরকম : আপনাকে আমার ভীষণ ভাল লাগে। খুব আলাপ করতে ইচ্ছে হয়, আবার ভয়ও করে। যদি কিছু মনে করেন। আমার বয়স সতেরো। মাধ্যমিক পাস করেছি। একটু গাইতেও পারি। আমার সঙ্গে ভাব করতে রাজি? যদি রাজি থাকেন তাহলে আপনার পুব দিকের জানালায় একটা সাদা রুমাল বেঁধে রাখবেন কাল বিকেলে। প্লিজ, বাঁধবেন কিন্তু।
হ্যাঁ রে, শুভশ্রী বলে কোনও মেয়েকে চিনিস?
শুভশ্রী?
হ্যাঁ।
না তো! মনে পড়ছে না।
ভাল করে ভেবে দেখ।
মরণ ভাবল। মাথা নেড়ে বলল, নামটা শুনিনি তো, কেন দাদা?
এমনিই।
পদবি কী বলো তো!
জানি না।
তাহলে বলতে পারছি না। কেমন দেখতে?
তা কে জানে! শাকচুন্নির মতোই হবে হয়তো।
যাঃ! বলে হেসে ফেলে মরণ, শাকচুন্নি কি দেখতে খারাপ?
না হলে শাকচুন্নি বলবে কেন?
হ্যাঁ দাদা, শাকচুন্নি কাদের বলে? যারা শাক তোলে তাদের?
তাও হতে পারে। এ গাঁয়ের তুই সবাইকে চিনিস?
বাঃ, চিনব না?
এই তো শুভশ্রীকে চিনতে পারলি না!
হয়তো ভাল নামটা জানি না, ডাকনামে ঠিক চিনব।
হুঁ, সেটা একটা কথা বটে।
মাকে জিজ্ঞেস করে আসব?
ভ্যাট। ওসব জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।
আচ্ছা।
.
৪০.
সারা রাত কেউ তার শিয়রের কাছে বসে আছে, মাথায় সুগন্ধী জলপট্টি দিচ্ছে এবং ডেকে তুলে ক্যাপসুল খাওয়াচ্ছে ঘড়ি ধরে, এ জিনিস সুমন কখনও ভাবতে পারে না। তার নিজের মা অন্তত করে না। মাকে দোষ দেওয়া যায় না। মা নানা রকম অসুখ-বিসুখে বারো মাস ভোগে। সুমনেরও তেমন অসুখ-বিসুখ করে না কখনও। কয়েক বছর আগে জলবসন্ত হয়েছিল। তখন একজন আয়া রাখা হয়েছিল তার জন্য।
সুমন অস্বস্তি বোধ করে বলল, আপনি কেন এভাবে আমার কাছে বসে আছেন? আমি তো বেশ আছি।
বাসন্তী বলে, একটু আগেও তোমার জ্বর একশো চারের ওপর ছিল, তা জানো বাবা? আগে রুগি ঘুমোলে ওষুধ খাওয়ানো বারণ ছিল। ঘুমন্ত রুগিকে নাকি ডাকতে নেই। কিন্তু এখনকার ডাক্তাররা তো অন্যরকম। অনল বাগচী বলে গেছে ঠিক ছয় ঘণ্টা পর পর ক্যাপসুল খাওয়াতে। একবারও নাকি বাদ দেওয়া যাবে না।
আচ্ছা, সে না হয় আমিই খেয়ে নেব। আমার তো তেমন ঘুম হচ্ছে না। মাঝে মাঝেই জেগে যাচ্ছি।
তা হয় না বাবা। ও-ঘরে গিয়ে বিছানায় শুলেই কি আর আমার ঘুম হবে? দুশ্চিন্তা রয়েছেনা মাথায়! তোমার মা কাছে থাকলে আরও কত করত! আমি কি আর অত পারি?
সুমন হাল ছেড়ে দিল। এই মহিলার সঙ্গে সে পেরে উঠবে না।
রাত আড়াইটের সময় একবার রসিক উঠে এসেছিল। ক্যামন বুঝত্যাছ? জ্বরটা কি কমের দিকে?
না। জ্বর তো বাড়ছে দেখছি। জলপট্টি দিয়ে দিয়ে একটু যেন কমছে মনে হচ্ছে। মাথাটা একবার ধুইয়ে দিলে হত।
এই শীতের মইধ্যে? কাল ঠান্ডা পড়ছে, মাথা বোয়াইলে যদি হিতে বিপরীত হয়?
হবে না। মাথা ধোয়ালে জ্বরটা নামবে।
প্রবল আপত্তি তুলেছিল সুমন, না না, এত রাতে মাথা ধোয়ানোর দরকার নেই।
বাসন্তী বারণ শুনল না। বরং সুমনকে এই প্রথম একটা ছোট্ট ধমক দিয়ে বলল, এই ছেলে, একদম চুপ করে থাকবে। লক্ষ্মী ছেলের মতো যা বলছি সব শুনতে হবে। বুঝেছ? তোমার ভালমন্দের দায় এখন আমার।
অগত্যা রসিক বালতি করে জল নিয়ে এল। বাসন্তী অনেকক্ষণ ধরে হিম-ঠান্ডা জলে মাথা ধুইয়ে দিতে লাগল তার। আরামে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সুমন খেয়ালই নেই। মাথা ধোয়ানোর সময় হাতপাখা দিয়ে হাপুর-হুপুর মাথায় বাতাস করছিল তার বাবা। যে বাবাকে কখনও সে ছেলেপুলের সেবা-টেবা করতে দেখেনি।
সুমন ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, হাতপাখার বাতাস কেন? সিলিং পাখা চালিয়ে নিলেই তো হয়।
বাসন্তী মাথা নেড়ে বলল, হয় না। সিলিং পাখার বাতাস বুকে লাগবে। এ সময়ে শুধু মাথায় বাতাস দেওয়ার নিয়ম। চুপ করে শুয়ে থাকো।
