দ্বিতীয় ঘরটার খোলা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে মরণ দেখল, দাদা এখনও ঘুমোচ্ছে। গায়ে লেপ, মশারি ফেলা। সুমন একটু দেরি করে ওঠে বটে, কিন্তু এত দেরি করে নয় তা বলে, এখন নটা বাজে।
চুপি চুপি চলে আসছিল মরণ, হঠাৎ শুনতে পেল, সুমন খুব কাতর গলায় বলে উঠল, উঃ মা গো!
মরণ ফিরে গেল জানালার কাছে।
দাদা, ও দাদা, তোমার কী হয়েছে? সু
মন ফের একটা অস্ফুট যন্ত্রণার শব্দ করল।
ও দাদা!
উঃ!
তোমার কী হয়েছে?
লেপের ভিতর থেকে মুখটা বের করে সুমন বলল, ভীষণ শীত করছে। আর বড্ড মাথার যন্ত্রণা।
মাকে ডাকব?
না না, তার দরকার নেই। ঠিক হয়ে যাবে।
দরজাটা খুলতে পারবে?
হ্যাঁ, দাঁড়া উঠছি।
বেশ কষ্ট করেই উঠল সুমন, বোঝা যাচ্ছিল, সে টলছে। কোনওক্রমে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, আমি একটু শুয়ে থাকি।
তোমার গা দেখি।
কপালে হাত রাখতেই মরণের হাতে যেন ছ্যাঁকা লাগল, এত গরম।
তোমার তো খুব জ্বর।
আমারও তাই মনে হচ্ছে। শেষ রাত থেকে শীত, মাথা ধরা আর আড়মোড়া হচ্ছিল। বাড়িতে প্যারাসিটামল আছে, জানিস?
কী বললে?
প্যারাসিটামল, জ্বর কমানোর ওষুধ।
দাঁড়াও, মাকে জিজ্ঞেস করে আসছি।
এক দৌড়ে নেমে এসে সোজা মায়ের কাছে গিয়ে মরণ বলল, মা, দাদার ভীষণ জ্বর, গা পুড়ে যাচ্ছে!
ও মা! সে কী! বাসন্তী তাড়াতাড়ি উনুন থেকে ফোড়নের কড়াই নামিয়ে রেখে একটা গরম জলের হাঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে বলল, চল তো দেখি!
কপালে হাত দিয়েই মুখ শুকোল বাসন্তীর।
ও বাবা! তোমার তো ভীষণ জ্বর বাবা।
হ্যাঁ। ভাববেন না, বোধহয় ঠান্ডা লেগে হয়েছে। গতকাল মরণের সঙ্গে পুকুরে স্নান করেছিলাম তো।
দাঁড়াও, থার্মোমিটার নিয়ে আসি।
জ্বরের কোনও ওষুধ নেই বাড়িতে?
তোমার বাবা কিছু ওষুধপত্র সবসময়েই কিনে রেখে যায় বাড়িতে। কোনটা কীসের তা তো জানি না, বাক্সটা এনে দিচ্ছি, দেখ। কিন্তু আমার মনে হয় ডাক্তার দেখিয়েই ওষুধ খাওয়া ভাল।
ডাক্তার লাগবে না, ঠান্ডা লেগে জ্বর দু-চার দিন ভোগায়।
বাসন্তী মশারিটা খুলে নিল। পুবের জানালা খুলে দিতেই রোদ এল ঘরে।
থার্মোমিটারে জ্বর উঠল একশো চারের কাছাকাছি।
দাঁড়াও বাবা, তোমার মাথা ধোয়াতে হবে। আমি ব্যবস্থা করছি।
আরে না না, অত ঝামেলা করতে হবে না, প্যারাসিটামল খেলাম তো, জ্বর নেমে যাবে।
ওই ওষুধে জ্বর নামবে, কিন্তু আবার তেড়ে উঠবে। ও মরণ, যা তো, ফার্মাসিতে খবর দিয়ে আয়। ডাক্তার অনল বাগচী এলেই যেন আমাদের বাড়িতে আসে। তোর বাবার নাম লিখিয়ে দিয়ে আসিস। তাহলে গরজ হবে।
মরণ সঙ্গে সঙ্গে ছুটল।
সুমন একটু হেসে বলল, ডাক্তার ডাকার কোনও দরকার ছিল না। সামান্য জ্বর, ঠিক হয়ে যেত।
না বাবা, আজকাল বড্ড তেড়াবাঁকা অসুখ হয়। আগে থেকে সাবধান হওয়া ভাল।
এখানকার ডাক্তার কী রকম? গাঁয়ে তো ভাল ডাক্তার পাওয়া যায় না শুনেছি।
আগে তাই ছিল বাবা। হাতুড়ে চিকিৎসা করত। আজকাল বর্ধমান থেকে ডাক্তাররা আসে। অনল বাগচী শুনেছি ভাল ডাক্তার। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে পড়ায়। বিলেত ফেরত।
ওঃ, তাহলে তো ভালই হবে।
হ্যাঁ বাবা। ডাক্তারের খুব নাম। এবার মাথাটা একটু ধুইয়ে দিই? তোমার কোনও কষ্ট হবে না, টেরও পাবে না।
আগে আমি একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসি। তারপর দেখা যাবে।
যাও বাবা। ততক্ষণে বিছানাটা ঝেড়ে দিই।
আপনি কেন করবেন? মুক্তা বা পুটু কাউকে বলুন না।
আমরা ছেলেবেলা থেকে দেখেছি, বাড়িতে কারও অসুখ করলে সেই ঘরে বাড়ির কাজের লোককে ঢুকতে দেওয়া হয় না। একে তো ওরা অত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে না। তার ওপর যদি ছোঁয়া লেগে ওদেরও অসুখ করে তবে হয়তো মনে মনে শাপশাপান্ত করবে।
কিন্তু আপনারও তো ইনফেকশন হতে পারে।
আমি তো মা। মায়েদের কিছু হয় না।
কী জানি কেন কথাটা শুনে সুমনের মুখটায় একটা ভারী স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। আর কিছু না বলে সে ধীরে ধীরে উঠল। বাথরুমে গেল।
বাসন্তী বিছানা ঝেড়ে, ঘর ঝাঁটপাট দিয়ে, চোখের পলকে সব ফিটফাট করে ফেলল। এক বালতি জলে জোরালো ফিনাইল ফেলে ঘরটা মুছেও দিল তাড়াতাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে বলেই সে এসব কজে যে কোনও কাজের লোকের চেয়ে অনেক বেশি পাকা।
বাথরুম থেকে অনেকক্ষণ বাদে যখন বেরোল সুমন তখন সে টলছে, হাফাচ্ছে। চোখ দুটোও লাল। বাসন্তী তাড়াতাড়ি গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল। গায়ে লেপ চাপা দিয়ে বলল, দাঁড়াও, হট ওয়াটার ব্যাগ এনে দিচ্ছি।
না না, অত কিছু লাগবে না।
ঠান্ডা জলে মাথা ধোয়ানোর সময় তোমার শীত করবে। তখন হট ওয়াটার ব্যাগটা থাকলে আরাম লাগবে। কোনও ঝামেলা হবে না বাবা, জল আমি উনুনে চাপিয়েই এসেছি।
তার কপালে একটা অডিকোলোন মাখানো জলপট্টি লাগিয়ে বাসন্তী নীচে গেল।
সুমন চেয়ে দেখল খুব কৌশল করে উত্তরের জানালা বন্ধ রেখে পুবের জানালা খুলে দিয়েছে মরণের মা। ঘরটা ঝলমল করছে আলোয়।
প্যারাসিটামল তার ক্রিয়া শুরু করেছে। টের পেল সুমন। শরীরটা গরম হচ্ছে। জ্বরের ঘোর ভাবটা পাতলা হচ্ছে।
বাসন্তী এক কাপ চা নিয়ে এল। বলল, শোনো বাবা, এখন ওষুধ খেয়ে তোমার জ্বর নামছে। এখন তোমার মাথাটা তাহলে ধোয়াব না। দুপুরে ফের যখন জ্বর আসবে তখন আর ওষুধটা খেও না। ওই ওষুধ নাকি বেশি খেতে নেই। দুপুরে মাথা ধুইয়ে গা স্পঞ্জ করে দেব।
