বেলা আটটার মধ্যেই চলে এল ধীরেন কাষ্ঠ।
একগাল হেসে বলল, ডেকে পাঠিয়েছ মা?
বাসন্তী বলল, হ্যাঁ খুড়ো। বড্ড বিপদে পড়েছি। আমাদের পাম্প মেশিনটা খারাপ হয়ে গেছে। দোতলায় জল না উঠলে কী বিপদ বলুন। আজ আবার মরণের বাবাও আসবে।
ধীরেন কাষ্ঠ হাসিটা ধরে রেখেই বলল, পার্টস পুড়ে বা ভেঙে গিয়ে থাকলে নতুন পার্টস লাগবে মা। আর তা না হয়ে থাকলে সারানো কঠিন হবে না।
আপনি বসুন। আগে দুখানা গরম রুটি খেয়ে নিন, তারপর মেশিন দেখবেন।
ধীরেন শশব্যস্তে বলে, তার দরকার নেই মা। সকালে চাট্টি চালভাজা খেয়েছি।
আহা, ভারী তো চালভাজা! রোদে মোড়া পেতে বসুন একটু। ওরে ও মরণ, দাদুকে মোড়াটা পেতে দে বাবা।
আজ রুটিতে বেশ জবজবে ঘি পড়েছে, ঘি গড়াচ্ছে একেবারে। আর মুখে দুখানা বললেও আদতে পাঁচখানা রুটি বেড়ে দিয়েছে বাসন্তী। সঙ্গে ধোঁয়া-ওঠা ফুলকপি আর আলুর তরকারি এক বাটি। কয়েকটা ডুমো ডুমো আলু ভাজা আর কাঁচা লঙ্কা।
একটু ডাল দিই খুড়ো? ফুটন্ত ডাল?
লজ্জা পেয়ে ধীরেন বলে, আবার ডালও দিবি? তা দে একটু। এ যে বেশ গুরুভোজন হয়ে যাচ্ছে রে মা।
খান খুড়ো, আপনাকে খাওয়ালে পুণ্যি হয়। পেট ভরে খান।
তোর মনটা মা, বাঙালের মতোই। বাঙালটাও বড্ড দিলদরিয়া মানুষ। তোদের দুটিতে মিলেছিস বড় ভাল, তা দে মা, ডালও একটু দে, ডালে ভিজলে রুটি নরম হয়।
ডালও নিয়ে এল বাসন্তী। ঘন সোনা মুগের ডাল। বাটিখানা বেশ বড়ই। ডালেও ঘি ভাসছে।
আরও রুটি লাগলে চাইবেন। লজ্জা করবেন না যেন। আর খুড়ো!
হ্যাঁ মা।
আমার মায়ের কথায় কিছু মনে করবেন না যেন। বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। তার ওপর আফিং খেয়ে খেয়ে মাথাটাই গেছে একেবারে।
ধীরেন একটু করুণ হেসে বলে, কী জানিস মা, তোর মায়ের মতো অমন লক্ষ্মীমন্ত বউ তখন এ গাঁয়ে আর একজনও ছিল না। কী চুলের ঢল, প্রতিমার মতো মুখ, কী হাত পায়ের গড়ন! গেলে যত্নআত্তিও করতেন খুব। সেসব দিন কোথায় চলে গেল বল তো! না মা, তোর মায়ের কথায় কিছু মনে করিনি।
আপনি যেমন রোজ আসতেন তেমন আসবেন। বাড়িতে অতিথি-বিথিতি না এলে কি সে বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী থাকে? মরণের বাবাও আপনাকে ভারী পছন্দ করে।
সে আর জানি না! আচ্ছা মা, আসব।
আপনার কথা তো মা-ই বলল আমাকে। বলল, ধীরেন ঠাকুরপোকে খবর দে। ঠাকুরপো সব রকম কল-টল সারাতে পারে।
ধীরেন ভারী আপ্যায়িত হয়ে বলে, তা পারতুম মা, এককালে। বাদ্যযন্ত্র থেকে শুরু করে সব রকম কাজই শিখেছিলুম। চর্চার অভাবে এখন ভুলেও গেছি অনেক। তখন তো আর কেউ পয়সা দিত না, বেগার খেটে খেটে মরতে হত।
না খুড়ো, আমি কিন্তু আপনাকে মজুরি দেব। যা লাগবে বলবেন।
মজুরি? তোর কাছ থেকে কি নিতে পারি মা? কত যত্নআত্তি করিস! ও তোকে ভাবতে হবে না।
ধীরেন যত্ন করে খেল। কাঁচালঙ্কাটা বড্ড ঝাল। খেয়ে হেঁচকি উঠে গেল। তবু সেটাও শেষ করল ধীরেন। কিছু ফেলল না।
দেখা গেল, এই বুড়ো বয়সেও ধীরেন কাষ্ঠ কাজ জানে বটে। মাত্র আধঘণ্টা কী যেন খুটখাট করল পাম্পঘরে বসে। পাশে বসে খাপ পেতে দেখছিল মরণ। আধঘণ্টা বাদে সুইচ দিতেই পাম্প চলতে শুরু করল।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বাসন্তী। পাম্প নিয়ে যে কী উদ্বেগ হচ্ছিল তার বলার নয়।
কুড়িটা টাকা ধীরেন কাষ্ঠর হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখুন খুড়ো। আপনার তো হাতখরচও লাগে।
না, না, তোর কাজ করে কি টাকা নিতে পারি মা? ও তুই রেখে দে।
খুড়ো, পরিশ্রমের দাম দিতে হয়। নইলে ভগবান খুশি হন না। এটা আপনি রাখুন। আমার দরকার পড়লে তো আপনাকেই ডাকতে হবে।
খুব কুণ্ঠার সঙ্গে টাকাটা নিল ধীরেন। বলল, আমার এক গুরু ছিল। তার নাম অনন্ত হালদার। তার কাছে ট্রাক্টর মেশিনের কাজ শিখতুম। সে আমাকে বলত, তুই সব রকম কাজ শিখতে চাস বলে তোর কিছু হয় না। একটা কাজ যদি মন দিয়ে শিখতিস তাহলে কিছু করতে পারতিস। আজ ভাবি, হালদারের পো কিছু খারাপ কথা বলেনি। সব কাজের কাজী হতে গিয়ে আমার সবই ফসকে গেল। তা হ্যাঁ মা, পাম্পসেটটা কিন্তু এবার একটু ওভারহলিং করিয়ে নিস। সার্ভিসিং না হলে মেশিন বসে যাবে। আপাতত চলছে বটে, কিন্তু ভাল করে মাজাঘষা দরকার। বেল্টটাও ঢিলে হয়ে গেছে।
আপনিই করে দিন না খুড়ো! অন্য নোক ডাকব কেন?
বুড়ো শরীরে অতটা কি পারব মা? পরিশ্রমের কাজ।
না খুড়ো, আপনিই করবেন, যা টাকা লাগে দেব।
পার্টস লাগবে কয়েকটা, বাঙাল এলে বর্ধমান থেকে পার্টসও যেন আনিয়ে নিস।
আপনিই করবেন তো!
দেবোখন করে, তুই যখন ছাড়বিই না।
আমি চাই, আমাদের কাজটাও হোক, আপনারও দুটো পয়সা হোক। বাইরের লোক এসে পয়সা নিয়ে যাবে কেন বলুন।
ধীরেন কাষ্ঠ বিদেয় নেওয়ার পর মরণ দোতলায় উঠে দুটো ঘরেই উঁকি দিল। তাদের ঘরে খাটের ওপর ছোট্ট ফোল্ডিং মশারির নীচে বোনটা ঘুমোচ্ছে। বেচারা খুব ঘুমোয়। বাচ্চাদের নাকি ওই স্বভাব, বোনটা আজকাল তাকে দেখলে হাসে। কোলে আসার জন্য হাতও বাড়ায়। কিন্তু কোলে নিতে ভরসা হয় না মরণের। বড্ড নরম-সরম শরীর। ভয় হয় হাত ফসকে পড়ে যাবে। তবে বোনটিকে ইদানীং বেশ ভালবাসে মরণ। ঘরের মেঝেয় বসে বোনকে পাহারা দিতে দিতে চাল বাচছে মুক্তাদি। আজ রাতে পোলাও হবে বলে শুনেছে মরণ। পোলাও তার খুবই প্রিয় জিনিস।
