কিন্তু আমার কী হবে পারুলদি?
তুই কি আলাদা? ওরকম মনে হয়। তারপর দেখিস তুইও যা আমিও তা।
কিন্তু পারুলদি।
বল।
একটা কথা বলব, কিছু মনে করবে না?
না রে, বল না, এখন বড় হয়ে গেছিস, লজ্জা কীসের?
অমলদার কথাই বলছি, তোমার প্রেমে পড়েছিল তো?
হদ্দমুদ্দ। বলে হেসে ফেলল পারুল, শুধু অমলদা নয়, আমিও তো।
কীরকম প্রেম ছিল তোমাদের?
গাঁ-দেশে তো আর হাত ধরাধরি করে ঘুরিনি। একটু ভাব হয়েছিল, দুপক্ষের মা বাবারা বিয়েও ঠিক করে ফেলেছিল। অমলদা আমাদের বাড়ি আসত, আমি ওদের বাড়ি যেতাম।
তারপর কী হল?
অমলদা যদি ভালবাসাটাকে গলা টিপে মেরে না ফেলত তাহলে বিয়ে হত। তারপর কী হত জানি না।
তোমার কথা শুনে কী মনে হয় জানো?
কী?
মনে হয় তোমার সেই ভালবাসার স্মৃতিও আর নেই।
একটা শ্বাস ফেলে পারুল বলল, থাকার কথা নাকি?
কিন্তু অমলদার অবস্থা দেখেছ?
কী অবস্থা?
তোমার জন্যই কিন্তু বেচারা একদম সুখী হতে পারল না।
কে বলল তোকে?
তাই তো মনে হয়। মদ খায়, কেমন ভ্যাবলার মতো চেয়ে থাকে, বউয়ের সঙ্গে নাকি সবসময়ে খিটিমিটি। সোহাগ বলে সব তোমার জন্যই।
বাজে কথা।
তোমার জন্য নয়?
আমি তা জানি না। আমার মনে হয় আমি ওকে বিয়ে করলেও অমলদা এরকমই হত যেমনটা এখন আছে। যা হয়েছে ভালই হয়েছে।
একটু হেসে পান্না বলল, আমারও বিরহটাই ভাল লাগে।
তার মানে?
আই লাইক ট্র্যাজিক এন্ডিং। প্রেম-ট্রেম হয় তোক বাবা, কিন্তু তারপর যেন শরৎচন্দ্রের মতো একটা বেশ সেন্টিমেন্টাল ট্র্যাজেডিও ঘটে যায়। নইলে প্রেমটা একদম আলুসেদ্ধ হয়ে যাবে।
.
৩৯.
জলের পাম্পটা খারাপ হয়েছে কাল থেকে। ছাদের ট্যাংকে জল উঠছে না। বাসন্তীর আজকাল অল্পেই ভারী উদ্বেগ হয়। পাম্প খারাপ হওয়া মানে সুমনের বাথরুমে জল আসবে না। তাহলে কী হবে?
জিজিবুড়ি রোজকার মতোই সকালে তার বরাদ্দ চা খেতে এসে রান্নাঘরে ঘাপটি মেরে বসা, বলল, মরণ! পাম্প খারাপ হয়েছে তো কী হয়েছে রে বাপু? গাঁ-গঞ্জের কটা লোকের ঘরে আবার পাম্পের জল ওঠে লা? ওই ধেড়ে ছেলে নীচে নেমে তো টিপকলেই কাজ সারতে পারে। গতরে তো আর খুঁয়োপোকা ধরেনি বাছা। তুই হেদিয়ে মরছিস কেন?
আহা, ওদের শহরে থেকে অভ্যেস। কিছু যদি মনে করে?
তাহলে আর কী, গলবস্ত্র হয়ে গিয়ে পায়ে পড়। যা আদিখ্যেতা করলি অ্যাদ্দিন সতীন পোকে নিয়ে! বলি কারো পাকা ধানে মই তো দিসনি, অমন চোর-চোর হয়ে থাকিস কেন? সতীন পো তো গতরখানাও নাড়ে না। দিন-রাত ফুলবাবুটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কত বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবি? পুজোর ছুটি শেষ হয়ে এল, এখনও নড়ার নাম নেই। বলি মতলবখানা কী ওর?
আচ্ছা মা, তোমার মনে এত বিষ কেন বলো তো! এসে আছে দুদিন আমার কাছে, তোমার সহ্য হচ্ছে না কেন? এখানটায় ভাল লাগছে বলেই তো আছে! নাকি! যত্নআত্তি করি যাতে বড়গিন্নির কাছে গিয়ে কুচ্ছো না গায়। একেই তো আমি চক্ষুশূল, সৎমা, অযত্ন করলে রক্ষে আছে?
ওরে ভালমানুষের ঝি, তোর বুদ্ধির বলিহারি যাই। গ্যাঁট হয়ে বসে আছে কি এমনি? হিসেব-নিকেশ কষছে, বুঝলি? বাঙাল কত টাকা ঢালছে এখানে, সম্পত্তি কত, জমিজমা কত, সব গিয়ে লাগাবে। আমি তোর জায়গায় হলে তেরাত্তির কাটবার আগেই ঝেটিয়ে বিদেয় করতুম। রোখাচোখা না হলে বিষয়সম্পত্তি কেউ রাখতে পারে? বাঙালেরও সাঁট আছে এই বলে দিলুম। একটা ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলছে।
বাসন্তী রাগ করে বলল, তোমার অত কু গাইতে হবে না মা। সুমন কাল বাদে পরশুই চলে যাবে। আজ ওর বাবা আসবে। মাঝখানে শুধু কালকের দিনটা। কটা দিন ছিল, বড্ড মায়া পড়ে গেছে। কাল যাবে বলে মনটা খারাপও লাগছে। আর তুমি এসে সকালবেলাটায় আমার কানে বিষ ঢালছ। দুনিয়ায় কি ভাল জিনিস কিছু তোমার চোখেও পড়ে না!
ভাল হলে ঠিকই চোখে পড়ত। যাক বাবা, বিদেয় হচ্ছে তাহলে? বাঁচলুম।
কিন্তু বাসন্তীর মনটা খচ খচ করছে। শেষে দুটো দিন পাম্পটা খারাপ না হলেই তো পারত। বর্ধমান থেকে মিস্তিরি আনিয়ে পাম্প সারাতে এখনও তিন-চার দিন লাগবে। মুনিশ দিয়ে ওপরের বাথরুমে জল দেওয়ানো হচ্ছে বটে, কিন্তু তাতে বাসন্তী খুশি হচ্ছে না। পাম্পটা যে কেন খারাপ হল!
সুড়ুক সুড়ুক চা খেতে খেতে জিজিবুড়ি যেন তার মনের কথা টের পেয়ে বলল, তা পাম্প সারানো এমনকী হাতিঘোড়া কাজ। ওই শকুনটা তো রোজ এসে চা বিস্কুট খেয়ে যায়। ওকে বলিস না কেন!
কোন শকুনটা! কার কথা বলছ?
কেন, ধীরেন কাষ্ঠ।
ধীরেন খুড়ো! সে কী করবে?
ওই তো একসময়ে কলকবজা সব সারাত। গাঁয়ে কারও কিছু খারাপ হলে সবাই তো ওকেই ডাকত। সেলাই মেশিন রে, টিপকল রে, সাইকেল রে, ধীরেন না সারাত কী? ওকে বল, ঠিক সারিয়ে দেবে। রোজ এসে গুচ্ছের গিলে যাচ্ছে। ঘাড়ে ধরে কাজ করিয়ে নে। তাতে যদি কিছু শোধবোধ হয়।
বাসন্তী অবাক হয়ে বলে, তাই তো? ছেলেবেলায় ধীরেন খুড়োকে যন্ত্রপাতির থলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখতুম বটে! কিন্তু তুমি সেদিন এমন গালমন্দ করলে যে ধীরেন খুড়ো সেই থেকে আর আসে না। লজ্জা পেয়েছে বোধহয়।
আহা, দুকানকাটার আবার লজ্জা! ওর যেদিন লজ্জা হবে সেদিন কাকেরও কোরণ্ড হবে, ধুলায় লুটায়ে যাবে।
কী যে সব বলো না মা!
মরণটাকে পাঠা না ওর কাছে, ধরে নিয়ে আসুক। ছুঁকছুঁকুনি স্বভাব বটে, কিন্তু ধীরেন মিস্তিরি ভাল।
