পারুল হাসছিল, প্রেমে পড়েছিলি নাকি?
দেখ না কাণ্ড! পুজোর ভাসানে গিয়ে ঠান্ডা লেগে আমার কীরকম জ্বর হয়েছিল মনে আছে?
তা থাকবে না কেন?
তখন তো ওই অনল বাগচীই দেখতে এল আমাকে।
হ্যাঁ, তা জানি। খুব নামকরা ডাক্তার। বর্ধমান মেডিকেল কলেজে পড়ায়।
হ্যাঁ তো। জ্বরের ঘোরে আমি দেখেছিলাম ভারী সুন্দর দেখতে একটা ছেলে যেন। খুব লম্বা, ছিপছিপে, ফর্সা, গম্ভীর আর কী গমগমে গলা। খুব পারসোনালিটি, দেখে এত ভাল লাগল যে অসুখের মধ্যেও গা সিরসির করছিল।
পারুল হেসে গড়িয়ে পড়ছিল, এত কাণ্ড?
আর বোলো না। আমার তো মনে হয়েছিল যাকে এতকাল মনে মনে খুঁজছি এ-ই সে। একজন ডাক্তারকেই তো আমার বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল, তাই বোধহয় ভগবান ঠিক লোকটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ও মা! কোথায় যাব রে! কী পাগল তুই?
তাই তো বলি। তারপর অনল বাগচী নামটা শুনলেই কেমন যেন শিহরন হতে লাগল। নামটাও কী সুন্দর বলো!
তারপর কী হল?
তারপর আর কী! অসুখ-টসুখও করছে না যে অনল বাগচি আবার আসবে। ভিতরে ভিতরে চাইছি একটা অসুখ-টসুখ কিছু করুক আমার। তাহলে আসবে।
তোর বদলে শেষে অসুখ হল কিনা ছোটমার!
হ্যাঁ। বিশ্বাস করবে না কাল বাবা ডাক্তারকে ডাকতে গেলে আমি একটু সেজেগুজেও গিয়েছিলাম। তারপর যখন ডাক্তার এল তখন এক গাল মাছি। ধুস!
পারুল মুখে আঁচল চাপা দিয়ে খানিকক্ষণ হেসে নিয়ে বলল, আজ কতদিন পর এত হাসলাম।
পান্না কান্না-হাসি মেশানো মুখে বলল, তুমি তো হাসছ! আমার অবস্থাটা ভাব তো! কত রোমান্টিক চিন্তা করে রেখেছিলাম। মাথায় ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে গেল এক ঘটি। এত রাগ হচ্ছে লোকটার ওপর।
ওমা! লোকটার দোষ কী বল! সে তো কিছু করেনি!
আহা, করেনি আবার! অত বয়স হওয়ার কী দরকার ছিল লোকটার! আর একটু সুন্দর হলেই বা কী ক্ষতি ছিল বলো! বারেন্দ্র হওয়ারও কোনও দরকার ছিল না।
শুধু বারেন্দ্র? শুধু বয়স? আর কিছু নয় বুঝি রে মুখপুড়ি?
আরও কিছু আছে বুঝি?
নেই! ওর যে মেম বউ!
জিব কেটে পান্না বলে, ওই যাঃ, বিয়ের কথাটা তত একদম ভুলে গিয়েছিলাম। তাই তো! বিয়ে তো হতেই পারে। জ্বরের ঘোরে সেসব কি আর খেয়াল ছিল? পরেও আর মনে হয়নি কথাটা।
কেন মনে হয়নি?
মনে হয়েছিল ওকে ভগবান আমার জন্যই পাঠিয়েছে।
আহা রে! তাহলে বুক ভেঙে গেছে বল!
না সেরকম কিছু তো হচ্ছে না। শুধু রাগ হচ্ছে। লোকটা একদম যাচ্ছেতাই।
তুইও একটা যাচ্ছেতাই। পছন্দ করতেও সময় লাগে না, নাকচ করতেও না।
আসলে কী জান! বলব?
বল না।
আমার বড্ড নাক-উঁচু তো। কোনও পুরুষকেই তেমন পছন্দ হয় না। মনটা কেবল খুঁতখুঁত করে। ওর দাঁত উঁচু, এ বেঁটে, সে কেমন ম্যাদামারা, কেউ হয়তো একটু বেশি পুতুল-পুতুল। ঠিক মনের মতো কেউ নয়।
তাই তো রে! তাহলে তো মুশকিল!
ভীষণ মুশকিল। আমার বন্ধুরা তো বলে, তুই যেমন খুঁতখুঁতে, হয় তোর বরই জুটবে না, না হয় তো একটা কালো মোটা ঘেমো জাম্বুবান জুটবে।
ইস! তা কেন? তোর বর আমি খুঁজে দেব।
ডাইনে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে পান্না বলে, পাবে না। আমি যাকে চাই তাকে আমিই ভাল বুঝতে পারি না। রোজ তার চেহারা পালটে যায়।
এই রে, তাহলে কী হবে?
কাঁচুমাচু হয়ে পান্না বলে, সেটাই তো হয়েছে মুশকিল। আজ একরকম ভাবি কালই যে অন্যরকম হয়ে যায়। চেহারা পালটায়, স্বভাব, চরিত্র, গুণ তাও কি আর এক রকম থাকে? আমার এক সময়ে মনে হত আমার পুরুষটা খুব ভাল রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারবে। তারপর হল কী একদিন বিজুদা বলছিল, পুরুষমানুষ হারমোনিয়াম নিয়ে বসে প্যানপ্যানে রবীন্দ্রসংগীত গায় ও আমার একদম সহ্য হয় না। ব্যস, পরদিন থেকেই আমি রবীন্দ্রসংগীত জানা পুরুষ বাতিল করে দিলাম।
আচ্ছা পাগলি যা হোক। যাকে পাবি তার দোষগুণ নিয়েই তো সেই মানুষটা, একদম মনের মতো কি হয়?
আমার হবে না পারুলদি। আমি বড্ড ন্যাকা।
ভ্যাট, তুই একটুও ন্যাকা নোস। ন্যাকা হলে কখনও অনল বাগচির কথা আমাকে অত সরলভাবে বলতে পারতিস না।
তোমাকে যে আমার সব বলতে ইচ্ছে করে। তোমার যা বুদ্ধি। কী করব বলল তো! মা একটা দিন শুয়েছিল, আমাকে একটু সংসারের কাজ করতে হয়েছে, অমনি আমার মন বিগড়ে বসে আছে। কাল রাত থেকে কেবল ভাবছি বিয়ে করলে আমাকে তো মায়ের মতোই জীবন যাপন করতে হবে! সে আমি পারব না। থাক বাবা দরকার নেই আমার বিয়ের। স্বপ্নের পুরুষ স্বপ্নেই থাক।
বিয়ে করলে একটু স্বপ্নভঙ্গ তো হয়ই। কিন্তু তোর যে বিয়ের আগেই হয়ে বসে আছে।
হবে না! এত কিছু করলুম, তার কারও মন উঠল কি? সংসারটা ভারী অকৃতজ্ঞ। মাও কথাটা বলে।
সে তো বটেই। কিন্তু ছোটমা সেরে উঠলে জিজ্ঞেস করিস তো এই সংসার ছেড়ে যদি তাকে অন্য একটা সুখের জীবন দেওয়া যায়, যেখানে কাজকর্ম করতে হয় না, কারও দায় ঘাড়ে নিতে হয় না, চারদিকে চোখ রাখতে হয় না তাহলে ছোটমার কেমন লাগবে।
কেন পারুলদি, ভালই তো লাগবে।
জিজ্ঞেস করে দেখিস না। এইসব ঝামেলা ঝঞ্ঝাট দায়িত্ব এসব নিয়ে যতই চেঁচামেচি করুক না এই খোঁট ছাড়া ছোটমা এক মুহূর্ত থাকতেও পারবে না। নিজেকে দিয়ে তো বুঝি।
কী বোঝো বলো না পারুলদি, বলো।
বিয়ের পর মেয়েদের একটা স্বপ্নভঙ্গ হয়। সে তুই এখন ঠিক বুঝবি না। ভীষণ প্রেম-ট্রেম করে বিয়ে করলেও হয়। জীবনটা তো স্বপ্নের মতো নয়। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের পরও দেখবি দিব্যি বেশ আছিস দুজনে। বয়সে ভারভাত্তিক হলে দেখবি কিছু খারাপ লাগছে না। নতুন একটা ইমপেটাস পাওয়া যায়।
