দুশো টাকা ভিজিট নিয়ে ডাক্তার চলে গেল। পান্নার দিকে ফিরেও তাকাল না।
পান্না খোঁপা খুলে ফেলল, টিপ তুলে ফেলল, মুখটায় জল দিয়ে পরিষ্কার করল। দুস! রাত্রিবেলা তার রান্না মাছের ঝোল খেয়ে বাবা খুব প্রশংসা করল। বাবারা যেমন করেই থাকে।
হীরা মুখ বেঁকিয়ে বলল, নুন কম হয়েছে। পানসে স্বাদ।
ভাতটা একটু বেশি সেদ্ধ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু কেউ সে নিয়ে উচ্চবাচ্য করল না। তবে এসব যে থ্যাঙ্কলেস জব সে বিষয়ে পান্নার কোনও সন্দেহ নেই। বিবাহিত জীবনের স্বপ্ন শত খণ্ড হয়ে এখন তার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে।
সকালে খবর পেয়ে এল পারুল।
ছোটমা, তুমি আবার কী বাধিয়ে বসেছ!
আর বসিস না মা, ডাক্তারগুলো পয়সা লোটার জন্য কত কী যে বলে যায়। ডাক্তারি না শিখলে কী হবে, আমাদের বয়স কি আর কম হল, অভিজ্ঞতা বলে একটা জিনিসও তো আছে। আমার শরীর আমি বুঝলুম না, বুঝল কিনা বাইরের ডাক্তার! তাও পাঁচ মিনিটে!
তাই তো! এ যে ভারী অন্যায়। তোমার শরীর নিয়ে ডাক্তারের অত মাথাব্যথা কীসের? সংসারের মুষলপর্বের মধ্যেই যে তুমি ভাল থাক তা কি আর ডাক্তাররা জানে! যাও না, উঠে গিয়ে একটু কেঁকিতে পাড় দিয়ে এসো, না হয় পাহাড়প্রমাণ খার কাঁচতে বসে যাও।
মাধুরী হেসে ফেলে বলে, আর ঠাট্টা করতে হবে না। ওই তো পান্নার ছিরি। কাজকর্ম কোনওদিন করেছে! শুনলুম তো ভাত গলিয়ে ফেলেছে, কঁচা তেলে ডাল ফোড়ন দিয়েছে, আরও কত কী। ও কেন পারবে বল! শেখেওনি তো কিছু।
যা পারে করবে, সবাইকে ওই গলা ভাত আর এই কাঁচা তেলের ডালই খেতে হবে। এখন তো আর বায়নাক্কা চলবে না।
আজ সকালে শরীরটা তো বেশ ঝরঝরেই লাগছে রে! কিন্তু উঠতেই সবাই এমন খা-খা করে তেড়ে এল যে ভয়ে আবার শয্যা নিতে হল। যাই বলিস বাপু, পাঁচ-সাত দিন বিছানায় পড়ে থাকা আমার পোষাবে না। কর্তার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে না। হীরারও পেট ভরছে না।
পারুল হাসছিল। বলল, আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও ওদের। কদিন না হলে ওখানেই খেয়ে আসুক। মা সেটাই বলে পাঠিয়েছে।
তেমন আতান্তরে পড়লে না হয় যাবে। কিন্তু তা বলে মেয়েরা সংসার সামাল দিতে শিখবে না, এটাই বা কেমন কথা বল! দুদিন পরে যখন বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে তখন কী হবে বল তো!
শ্বশুরবাড়ি যাওয়া মানেই বুঝি উদয়াস্ত সংসারের ঘানি টানা তোমার মতো?
ও মা! ঘানি না টানলে সংসারে কি লক্ষ্মীশ্রী থাকে? কোনটা না দেখলে চলে বল তো! পঁয়তাল্লিশ বছরের ওপর সংসার করছি। আজও মনে হয়, সংসারের কত কিছুই এখনও শিখিনি।
একটা শ্বাস ফেলল পারুল। ছোটমাকে বুঝিয়ে কিছু লাভ নেই। যেমন বুঝিয়ে লাভ হয় না তার মাকেও। পৃথিবী দ্রুত পালটে যাচ্ছে বাইরের দুনিয়ায়। তার ঢেউ এখনও এসে পৌঁছায়নি এখানে। সেদিন কেবল টিভি-তে একটা হিন্দি সিরিয়াল চলছিল। তাতে একটা মেয়ে বোধহয় তার মাকে বলছিল, তোমাদের যুগ চলে গেছে। আমার জীবন নিয়ে আমি কী করব তা আমাকেই ভাবতে দাও। বা ওরকমই কিছু কথা। তার মা বিরক্ত হয়ে বলল, বন্ধ কর তো। ও আর ভাল লাগে না। মেয়েটা একটা স্বামী ছেড়ে আর একটার সঙ্গে লটরপটর করছে। মা ভাল কথা বলতে এসেছে। অমনি লেকচার দিচ্ছে দেখ। টিভিগুলোও হয়েছে আজকাল, উলটো-পালটা শেখাচ্ছে লোককে।
রামহরি গাড়ি ভাড়া করে এনেছে। বর্ধমান নিয়ে যাবে স্ত্রীকে। মুখখানা গম্ভীর। বউ নামক বস্তুটি নিয়েও যে এরকম মাথা ঘামাতে হবে, অপচয় করতে হবে এত টাকা, সময় ও শ্রমের, এটা যেন তার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।
দেখ তো, কী ঝামেলাই বাধাল তোর ছোটমা!
পারুল হাসল, ঝামেলা বলছ কেন? শরীর থাকলে খারাপও তো হবেই।
ডাক্তার তো স্ট্রোকেরও ভয় দেখিয়ে গেল।
অত ভয় পেয়ো না ছোটকাকা, প্রেশার তো মায়েরও আছে। রেগুলার ওষুধ খেলে কিছু হবে না। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সঙ্গে কে যাচ্ছে?
বিজু, তার সব চেনাজানা আছে বর্ধমানে।
দঙ্গলটা বর্ধমানে রওনা হওয়ার পর পারুল পান্নার দিকে ফিরে বলল, কী রে মুখপুড়ি, খুব নাকি কাজকর্ম করছিস?
আর বোলো না পারুলদি। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সংসার যে এরকম বিচ্ছিরি তা তো জানা ছিল না!
দুর পাগল, সংসার বিচ্ছিরি হবে কেন? তুই আসলে ঘাবড়ে গেছিস।
পান্নার চোখ ছলছল করছিল। বলল, হ্যাঁ পারুলদি, ভীষণ ঘাবড়ে গেছি। খুব মন দিয়ে রান্না করলাম, তবু ভাত গলে গেল, ডালে কাঁচা তেলে ফোড়ন দিয়ে ফেললাম। এত করছি তবু মা বকুনি দিচ্ছে।
আচ্ছা, এবেলাটা চালিয়ে নে। রাত থেকে আমাদের ওখানে সবাই খাস। আমাদের তো রান্নার বামুন আছে, প্রবলেম হবে না।
তাহলেই কি মা কথা শোনাতে ছাড়বে? বলবে ধেড়ে মেয়ে বাড়িতে থাকতে ও বাড়িতে সবাই খাচ্ছে, পাঁচ জনে বলবে কী?
যা খুশি বলুক, কান না দিলেই হয়। ছোটমাকে আমি বুঝিয়ে বলবখন। আয়, গল্প করি।
এক গাল হেসে পান্না বলল, তুমি এসে বাঁচালে আমাকে। কাল থেকে এত মন খারাপ লাগছিল! একে মায়ের অসুখ তার ওপর ডাক্তারটা বেরোল বুড়ো।
কে ডাক্তার রে? অনল বাগচী?
হ্যাঁ তো!
ও মা সে বুড়ো হবে কেন? চল্লিশের বেশি তো নয়! তা তার বয়স দিয়ে তোর কী হবে রে মুখপুড়ি?
কাঁদো কাঁদো হয়ে পান্না বলল, বলব তোমাকে? কাউকে বলে দেবে না তো!
