পান্না টুক করে এক ফাঁকে একটু সেজেও নিয়েছে। একখানা ভাল শাড়ি, মুখে একটু প্রসাধন, কপালে টিপ, চুলে এলো খোঁপাটি সাবধানে রচিত, চোখে একটু কাজল আর ঠোঁটে ন্যাচারাল লিপস্টিকও। এইটুকুতে দোষ নেই। রাজার দুলাল যাবে আজি মোর ঘরের সুমুখপথে…
জীবনে এই প্রথম মাধুরী বিছানা নিয়েছে। জ্ঞানবয়স থেকে সে কখনও মায়ের শরীর খারাপ দেখেনি, এখন এই প্রথম মা শয্যা নেওয়াতে পান্না মায়ের জায়গা নিতে হাড়েহাড়ে বুঝছে এই মহিলা কী পরিমাণ ওয়ার্কলোড নিজের ঘাড়ে নিয়ে এ বাড়ির অন্য সব মানুষকে নিষ্কর্মা সময় কাটাতে দিয়েছে। রান্নাঘর থেকে গোয়ালের সাঁজাল, ঝি-এর কাজ তদারকি থেকে মুনিশদের সামাল দেওয়া, ঘরদোর সারা থেকে বাড়ির লোকের বায়নাক্কা সামলানো–অফুরন্ত কাজ। পান্না হাঁফিয়ে উঠেছে এক দিনেই। এ ছাড়াও আছে সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখা, বাজারের ফর্দ করা, ধোপার হিসেব, মুদির হিসেব, ধান-চাল বিক্রির হিসেব। ভাগ্যিস সেগুলো করতে হচ্ছে না এখনও। বিয়ের পর সংসার হলে যদি তাকে তার মায়ের মতোই জীবনযাপন করতে হয় তাহলে সে তো মরেই যাবে! বাবার চায়ের চিনি বেশি হয়েছিল। মুখে কিছু বলেনি, কিন্তু অর্ধেকের ওপর চা ফেলে দিয়েছিল। স্কুল থেকে ফিরে ভাত পাতে মাছ-ভাজা হয়নি বলে মুখ গোঁজ করে ছিল হীরা। রোজ নাকি তাকে মা গরম মাছ-ভাজা দেয় পাতে। কে জানবে বাবা অত।
শুয়ে শুয়ে অসুস্থ শরীরেও মা মাঝে মাঝে বকুনি দিচ্ছিল তাকে, ধিঙ্গি মেয়ে একটা কাজ যদি ঠিকমতো করতে শিখেছে। পটের বিবি সেজে ঘুরে বেড়ালেই হবে! একদিন শুয়ে থাকার জো নেই। অমনি সব বেসামাল করে ফেলল। আমি মরলে কী যে হবে তোদের! সংসার উড়ে পুড়ে যাবে।
বাঁধা গৎ। কানে না তুললেও চলে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সে যে এক স্বপ্নের পুরুষের অপেক্ষায় আছে সেও কি আসলে ওই বাপ-জ্যাঠাদের মতোই নিতান্তই স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, গদ্যময় পুরুষ মাত্র? আর কিছু নয়? অন্য কিছু নয়? ধুস, তাহলে স্বপ্ন দেখাটার মানে কী? আর স্বপ্ন ছাড়া পান্না কি বাঁচে?
তবু অনল বাগচী আসবে আজ। জ্বরের ঘোরে স্বপ্নের মিশেল দেওয়া চোখে দেখা এক পুরুষ। কতটা লম্বা? খুব ফর্সা? স্বপ্ন-স্বপ্ন মেদুর চোখ না? আর গলার স্বরটা কী গম্ভীর গমগমে!
একটু সেজেছে তাই পান্না। একজন ডাক্তারকে বিয়ে করার খুব শখ হয়েছে আজকাল তার। ডাক্তারই ভাল। কারণ ডাক্তারদের সে একটু ভয় পায়। সেই ভয় ভাঙানোর জন্যই একজন ডাক্তারকে কাছে পেলে তার ভাল হয়।
সন্ধের পর একখানা ছোট্ট মিষ্টি মারুতি গাড়ি এসে যখন বাড়ির সামনে থামল তখন পান্নার বুকের মধ্যে স্পষ্ট ধুকুর-পুকুর। দরজার আড়াল থেকে সে দেখল, একজন নামছে। হাতে ডাক্তারি ব্যাগ, গলায় স্টেথোস্কোপ। বাইরে তত আলো নেই। অস্পষ্টতার মধ্যে মনে হল, লম্বা, বেশ লম্বা।
রামহরি ভারী আপ্যায়িত ভঙ্গিতে, আসুন আসুন বলে ঘরে নিয়ে এল তাকে।
জুতো ছাড়তে হবে নাকি?
রামহরি তাড়াতাড়ি বলল, আরে না, না, জুতো থাক। আপনি আসুন।
একটু বিরক্ত হল পান্না। এবাড়িতে জুতো ছেড়েই শোওয়ার ঘরে ঢোকার নিয়ম। বাবা যে কেন জুতো ছাড়তে বারণ করল। তার মানে ডাক্তার চলে গেলে শোওয়ার ঘর থেকে বৈঠকখানা অবধি তাকে জলন্যাকড়া দিয়ে মেঝে মুছতে হবে।
স্পষ্ট আলোয় যখন অনল বাগচী ঘরে এসে দাঁড়াল তখনই যেন তার স্বপ্নের গোটা ইমারতটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল। সেই ভাঙচুরের শব্দও যেন শুনতে পেল পান্না।
অনল বাগচীর বয়স চল্লিশের ওপর।
শুধু তা-ই নয়। তেমন সুপুরুষই বা কোথায়? ফর্সা নয় না-ই হল, মুখশ্রীও কি তেমন ভাল কিছু? মাথার চুল উঠে গিয়ে কপালটা বড় চওড়া দেখাচ্ছে। হাসলে সঁতের সেটিং বিশ্রী দেখায়। ধুস।
গোমড়ামুখো ডাক্তার মাধুরীকে পরীক্ষা করতে করতে হঠাৎ মুখ তুলে বলল, আগে ডাক্তার দেখেননি?
রামহরি মাথা নেড়ে বলে, না তো। দরকার পড়েনি।
রোগটা তো আজকের নয়, বেশ পুরনো।
রোগটা কী ডাক্তারবাবু?
গম্ভীর ডাক্তার বলল, প্রেশার একশো নব্বইয়ের ওপর, নীচেরটা একশো কুড়ি। যে কোনও সময়ে একটা স্ট্রোক হয়ে যেতে পারত। হার্টেরও প্রবলেম আছে মনে হচ্ছে। ওষুধগুলো এখুনি এনে শুরু করে দিন। আর পারলে কালকেই ই সি জি আর ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিন।
অবস্থা কি সিরিয়াস?
চিকিৎসা না করালে সিরিয়াস তো বটেই। অনেক আগেই ডাক্তার দেখানো উচিত ছিল।
উনি ডাক্তার দেখাতেই চান না যে!
তা বললে তো হবে না। সময়মতো ডাক্তার না দেখালে অবস্থা জটিল হয়ে দাঁড়াতে পারে!
মাধুরী ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আমার তো তেমন কিছু হয়নি ডাক্তারবাবু, শুধু একটু বায়ু হয়ে কেমন যেন লাগছিল।
ডাক্তার একটু হেসে বলল, আপনার কী হয়েছে তা যদি আপনিই বুঝবেন তাহলে তো আমাকে ডাকার দরকারই ছিল না। আপনি এখন চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকবেন কয়েকদিন। ফুল রেস্ট।
তাই কি হয়। ওই তো এক ফোঁটা রোগা মেয়েটা আমার। ও কি পারে সংসার সামলাতে?
কিন্তু আপনি যদি একেবারে বেড রিডন হয়ে পড়েন তাহলে তো ওর ওপর আরও প্রেশার পড়বে। সংসারের কথা যে এখন কিছুদিন আপনার ভাবা চলবে না!
কতদিন শুয়ে থাকতে হবে?
পাঁচ-সাত দিন তো বটেই।
অসহায় গলায় মাধুরী বলে, কী যে হবে!
