আর মহিলাও সেরকমই। শরীর খারাপকে কোনওদিনই খারাপ বলে মানে না, কাউকে বলে না ও কিছু কখনও। স্বামীর প্রশ্ন শুনে ভারী অবাক হয়ে বলল, ওমা! ঘামব না। যা গরম।
রামহরিও অবাক হয়ে বলে, গরম! সত্যি বলছ?
গরম না তো কী! আমার তো বাপু হাঁসফাস লাগছে।
রামহরি চিন্তিতভাবে বলে, তাহলে কি আমারই শরীর খারাপ হল নাকি! আমার যে বেশ শীত করছে! জ্বর-টর আসছে নাকি? দেখো তো গাটা।
মাধুরী স্বামীর কপালে হাত দিয়ে বলল, না! গা তো ঠান্ডা!
তাহলে! তোমার গরম লাগছে, কিন্তু আমার শীত করছে কেন?
শীত! শীত কোথায়! তা বাপু, রাতে ভাল ঘুম হয় না বলে বোধহয় আমার মাথাটা একটু গরম হয়েছে।
রামহরি হাঁ করে চেয়েছিল! মাধুরীর ঘুম হয় না এ একটা আশ্চর্য কথা বটে। বরাবর মাধুরীর ঘুম ছিল বিখ্যাত। বেশি রাতে তাদের বিয়ের লগ্ন ছিল। আর কেউ টের না পাক, পাশেই বরের পিড়িতে বসা রামহরি বউয়ের হাতে হাত রেখে যখন অংবং মন্ত্র পড়ে যাচ্ছিল তখন সে পরিষ্কার টের পেয়েছিল বউ ঘুমে তার গায়ে ঢলে পড়ছে। কী লজ্জা! সবাই জানে বালিশে মাথাটা রাখলেই মাধুরী নেই। সেই মাধুরীর ঘুম হচ্ছে না শুনে রামহরি তো রামহরি, গোয়ালের গোরুটা পর্যন্ত জাবর ভুলে অবাক হয়ে চেয়ে থাকবে।
সংসারের পাঁচটা কাজ এসে কথা ভণ্ডুল করে দেয়। তাই স্বামী-স্ত্রীর কথা ওই পর্যন্তই হয়ে রইল।
পরদিনই দুপুরে রান্নাঘরে গ্যাস উনুনের বদলে কয়লার আঁচে ময়লা জামাকাপড় সেদ্ধ বসিয়েছিল মাধুরী। গোলা সাবানের কুচি জলে দিয়ে, জামাকাপড় খুন্তি দিয়ে উলটে-পালটে দিতে গিয়ে এমন শরীর অস্থির করল যে, উঠে এসে পান্নাকে কোনওক্রমে একটু যা তো মা, জামাকাপড়গুলো একটু দেখ, শরীরটা কেমন করছে যেন বলেই শুয়ে পড়ল বিছানায়। বড় বড় শ্বাস ফেলছে, হাঁফ ধরা ভাব।
পান্নার সঙ্গে এমনিতে মাধুরীর একটু আড়াআড়ি আছে। পান্নার ধারণা, মা সবচেয়ে বেশি দাদাকে আর তার পরেই হীরাকে ভালবাসে। সে হল মায়ের কুড়িয়ে-পাওয়া মেয়ের মতো। অসুখ-বিসুখ হলে একটু-আধটু আদিখ্যেতা করে বটে, অন্য সময়ে নয়। মাধুরীর মুখে জীবনে কখনও শরীর খারাপের কথা শোনেনি পান্না। ওই এক ধরনের মহিলা যারা মরে গেলেও নিজের শরীরের কথা কয় না। তাই পান্না গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের মুখের ওপর, কী হয়েছে মা! কেমন লাগছে?
কিছু নয় তেমন! বোধহয় পেটে একটু বায়ু হয়েছে। সেদ্ধটা গিয়ে দেখ মা।
মাধুরীর মুখটা টকটক করছে লাল। সারা গা ঘামে ভিজে জবজব করছে।
চুলোয় যাক সেদ্ধ, পান্না ছুটে গিয়ে তার বাবাকে দুপুরের ভাত-ঘুম থেকে টেনে তুলে আনল।
রামহরি যথেষ্ট ভ্যাবাচ্যাকা। সত্যি বটে, স্ত্রীলোকের স্বাস্থ্য বিষয়ে ভাবনার অবকাশ তার হয় না। কিন্তু এই স্ত্রীলোকটা গত হলে এই গড়ানে বয়সে যে তার অঙ্গহানির মতো একটা কিছু ঘটনা ঘটবে এটা বুঝতে তার লহমাও লাগল না।
কী হয়েছে? অ্যাঁ! কী হয়েছে! বলতে বলতে কী করতে হবে বুঝতে না পেরে রামহরি তাড়াতাড়ি কুঁজো থেকে হিমঠান্ডা জল গেলাসে গড়িয়ে এনে মাধুরীর চোখে-মুখে ঝাপটা দিতে লাগল।
মাধুরী চমকে উঠে বলল, উঃ, কী করছ কী! আমি কি মুছে গেছি নাকি? কিছু হয়নি আমার। একটু চোখ বুজে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। অবেলায় খেয়েছি তো, তাই বোধহয় কেমন করছে।
অবেলায় তো তুমি রোজই খাও।
মাধুরী আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলল, ওরে বাবা, আর তোমাকে আমার সেবা করতে হবে না গো। একটু জিরোতে দাও দয়া করে, তাহলেই হবে।
রামহরিরও তাই মনে হল। রোদে-জলে, কাজে কর্মে পোক্ত শরীর, মরার বয়সও কিছু হয়নি। তার একাত্তর চলছে, মাধুরীর মেরেকেটে বাষট্টি। তত ভয়ের কিছু নেই।
একটু নার্ভাস হেসে শিয়রের কাছে বসা পান্নার দিকে চেয়ে বলল, পেটে গ্যাস হয়েছে, বুঝলি!
আজকাল মানুষের একটা গ্যাস-বাতিক হয়েছে খুব। ভাল-মন্দ কিছু হলেই বলে পেটে গ্যাস। এই গ্যাসের থিয়োরিটা পান্নার ভাল লাগে না মোটেই। সে বলল, বাবা, তুমি বরং ডাক্তারকে খবর দাও।
ডাক্তার! বলে রামহরি যেন আকাশ-পাতাল ভাবল খানিক। তারপর বলল, আজ অনল বাগচীর আসার দিন। তবে সন্ধের আগে তো নয়। কুঞ্জ ফার্মেসিতে একজন ডাক্তার বসেন বটে, তবে সবাই বলে হাতুড়ে।
মাধুরী বলল, ডাক্তার লাগবে না। আমার কিছু হয়নি। পান্না একটু হাতপাখা দিয়ে মাথায় বাতাস করুক, তাহলেই হবে। বড় হাঁসফঁস লাগছে। চোখে মাঝে মাঝে অন্ধকার দেখছি যেন। জামাকাপড় সেদ্ধ বসিয়ে এসেছি, ও পান্না, হাঁড়িটা নামিয়ে রেখে আয় মা। নইলে সব পুড়ে ঝামা হয়ে যাবে। সাবানজল আছে, সাবধানে ধরে নামাস, নইলে হাত পিছলে পড়ে গেলে পুড়ে মরবি।
সংসারের আসল খুঁটিটা নাড়া খেলে কী হয় তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবাইকে বুঝিয়ে ছাড়ল মাধুরী। মা দুর্গার দশটা হাত আছে, কিন্তু তার মায়েরও যে বড় কম নেই, তা বুঝতেও পান্নার দেরি হল না বড় একটা।
দুপুরটা এপাশ ওপাশ করে কাটাল মাধুরী। শ্বাসকষ্টের ভাব, মাথা অস্থির, গরম, ঘাড়ে অসহ্য ব্যথা।
সন্ধেবেলা রামহরি গেল ডাক্তার অনল বাগচীকে ডেকে আনতে।
মায়ের কাছে স্কুলফেরত হীরাকে বসিয়ে ঠাকুরের আসনে ফুলজল দিয়ে ঘরে ঘরে জলছড়া আর ধুপধুনো দিতে দিতে ভারী লজ্জা-লজ্জা করছিল পান্নার। জ্বরের ঘোরে রাজপুত্রের মতো একজন মানুষকে দেখতে পেয়েছিল সে। যেন ডাক্তার নয়, রাক্ষসপুরীতে বন্দি রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে এসেছে।
