একদিন মহিম বলেই ফেলল, গৌরদা এ যে দেখি বানরে সংগীত গায়, পিংলা জলে ভাসি যায়, দেখিলেও না হয় প্রত্যয়। জীবনে আপনি কখনও এক গ্লাস জল অবধি গড়িয়ে খেয়েছেন বলে তো শুনিনি। তা এত সব শিখলেন কোত্থেকে?
গৌরহরি একটু লজ্জা পেলেন বটে, কিন্তু নরম গলায় বললেন, মেয়েটার আমি ছাড়া কে আছে বল। আমার মুখ চেয়েই তো সব আপনজনকে ছেড়ে এসে আছে। ওর যদি এখন মনে হয় যে, মা বাবা কাছে নেই বলে ওর যত্ন হল না, তা হলে সেটা তো খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। তাই ওকে বুঝতেই দিই না।
একটু সময় লেগেছিল বলাকার মানুষটাকে বুঝতে। যখন বুঝল তখন তার মনোজগৎ জুড়ে গৌরহরি ভাস্বর হলেন। সেই মুগ্ধতা আজও বলাকার চোখে-মুখে ছড়িয়ে আছে। মারা গিয়েও গৌরদা যে কী ভীষণভাবে বেঁচে আছেন তা মহিম রায়ের মতো আর কে জানে! অথচ পরবর্তীকালে খামখেয়ালি গৌরহরি অন্যায্য অত্যাচারও তো কিছু কম করেননি। যখন তখন এটা সেটার ফরমাশ, বায়না, হঠাৎ অতিথি নিয়ে এসে চড়াও হওয়া। কোনওদিন এতটুকু কথা কাটাকাটি অবধি হয়নি দুজনের।
এইসব শিক্ষা নিতেই তো মহিম আসে এ বাড়িতে। দেখতে আসে গৌরহরি নিজের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে কত দূর পর্যন্ত নিজের ছায়াকে প্রলম্বিত করে রেখেছেন। এইভাবেই মানুষ বাঁচে।
দেবিকাকে যখন বিয়ে করে আনে মহিম তখন মহিমের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। দেবিকার কুড়ি-একুশ। পয়সাওলা ঘরের মেয়ে। মেলা দানসামগ্রী, নগদ পেয়েছিল মহিম। ওই অত সব পেয়েই বোধহয় একটু অধমর্ণ ভাব ছিল তার।
না, সম্পর্ক তাদের ভালই ছিল। ভাব ভালবাসার কিন্তু খামতি ছিল না। যেটার অভাব ক্রমশ প্রকট হল তা হল শ্রদ্ধা। আর ওই শ্রদ্ধার অভাব ঘটলে বোধহয় ভালবাসাটাও নিবু নিবু হয়ে আসে। ক্রমে ক্রমে, খুব ধীরে ধীরে সংসারের একজন গুরুত্বহীন সদস্যে পরিণত হচ্ছিল মহিম। তার মতামতের দাম নেই, তার পরামর্শ কেউ চায় না, তার অনুমতিরও প্রয়োজন হয় না কারও।
শীতের রোদে সাদা থান পরা দেবীমূর্তির মতো বসে আছে বলাকা। দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তবে যৌবন বয়সে মহিমের মনোভাব মাঝে মাঝে পঙ্কিল পথে ধাবিত হত না যে তা নয়।
মনে আছে বলাকা যখন ষোলো বা সতেরো বছরেরটি হল তখন তার রূপ যেন পেখম মেলে দিল। সেই সৌন্দর্যের যেন লেখাজোখা নেই। ওই আশ্চর্য রূপ দেখতে পিপাসার্তের মতো, দুখানি কাঙাল চোখ নিয়ে রোজ ছুটে আসত মহিম। এ-বাড়িতে তার বরাবরই অবারিত দ্বার। কারও কিছু মনে করার ছিল না। বউঠানের সঙ্গে খুনসুটিরও বাধা ছিল না কোনও।
মনের কথা কে টের পাবে! মনে এক নরকখানায় নিত্য কত পাপের জন্ম হয়, কত পঙ্কিলতা বাসা বেঁধে থাকে সেইখানে। মানুষের ভাগ্য ভাল যে তারা অন্তর্যামী নয়। হলে মানুষের দুঃখ শতগুণে বাড়ত।
কিন্তু মেয়েরা ঠিক টের পায়। কিছু না কিছু তারা বুঝতেই পারে পুরুষের চোখ দেখে। ও ব্যাপারে তাদের মেয়েলি মনে ঠিক সংকেত বেজে ওঠে।
বলাকাও কি টের পেয়েছিল?
একদিন, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে বাগানে আম কুড়োচ্ছিল বলাকা।
মহিম হাজির হয়ে বলল, কী হচ্ছে বউঠান?
আম কুড়োতে নিচু হয়েছিল বলাকা, হঠাৎ যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন তার ফর্সা কপালে কুচো চুল ঘামে আটকে আছে, মুখখানায় যেন নেমে এসেছে স্বর্গের আলো। মহিমের স্বীকার করতে বাধা নেই, ওই একটি মুহূর্তে সে এমন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল সে যা খুশি করে ফেলতে পারত। হঠাৎ যেন বাঁধ ভাঙার জন্য তার ভিতরে প্রলয়ংকর বন্যার জল ফুঁসে উঠেছিল।
কিছু কি টের পেয়েছিল বলাকা? নির্জন আমবাগানে তখন জনপ্রাণী নেই। খর গ্রীষ্মের বিকেলে রৌদ্র-ছায়ার তীব্র নাচানাচি। পাখি ডাকছিল, হাওয়া দিচ্ছিল। বলাকা হঠাৎ তার দিকে চেয়ে হঠাৎ দু পা পিছিয়ে গেল কেন যে!
কম্পিত গলায় মহিম বলল, বউঠান।
বলাকা হঠাৎ পিছু ফিরে লঘু পায়ে দৌড়ে বাগান পেরিয়ে উঠোনে গিয়ে উঠল।
বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল মহিম। বড্ড গ্লানি হল। ভাগ্যিস সে কিছু করে বসেনি!
দুদিন পর এক সন্ধেবেলা গৌরহরির বৈঠকখানায় যখন বসে আছে মহিম, তখন বলাকা তাকে চা দিতে এসে হঠাৎ মুখ টিপে একটু হেসে বলেছিল, ঠাকুরপো, এবার আপনি একটা বিয়ে করে ফেলুন।
বলাকার কি সেই আমবাগানের কথা মনে আছে? সেই দুপুর গড়িয়ে বিকেলের তীব্র স্মৃতি!
হয়তো আছে। হয়তো নেই। আয়ুর মোহনায় পৌঁছে গেছে মহিম। সেই জল এত দূর গড়িয়ে আসবে না।
.
৩৮.
সে কেন দেখা দিল রে, না দেখা ছিল যে ভাল। অন্তত আবছায়া দেখাটুকু না হয় থাকত তার!
মায়ের কখনও প্রেশার ছিল না। অন্তত টের পাওয়া যায়নি এতদিন। আশ্বিনের শেষে যখন বেশ শীত শীত ভাব পড়ছিল তখনই হঠাৎ শিলাবৃষ্টি হয়ে একদিন বেশ হু হু হাওয়া দিল। তখন শীতের ঠকঠকানি উঠে গেল। তার বীর বাবা রামহরি পর্যন্ত মোটা খদ্দরের হলুদ রঙের চাদরটা বের করে গায়ে জড়িয়ে ফেলল সকালবেলা। তাকে চা দিতে এসেছিল মা। রামহরি স্ত্রীর দিকে চেয়ে যা কখনও করে না তাই করে ফেলল হঠাৎ। বলল, তোমার কপালে ঘাম দেখছি যেন! ঘেমেছ নাকি?
মেয়েদের শরীর-টরীরের খোঁজখবর নেওয়া পুরুষদের রেওয়াজ নয়। যেন মেয়েমানুষের শরীর খারাপ হতে নেই। আর হলেও সেসবের খোঁজখবর নেওয়া পুরুষের পক্ষে আত্মাবমাননাকর। রামহরিও কদাচিৎ তার স্ত্রীর শরীরের খবর নিয়েছে।
