কিন্তু হঠাৎ স্বগতোক্তির মতো একটা কথা বলেছিল সোহাগ, জান দাদু, লোকটা কিন্তু পিসিকে দিদি ডাকে।
কে লোকটা?
ওই যে সেই লোকটা।
দিদি ডাকলে ক্ষতি কী? অনেকেই তো ডাকে!
সোহাগ খিলখিল করে হেসে ফেলেছিল। তারপর বলল, তুমি কিচ্ছু বোঝো না!
মহিমকে ভাবনার সমুদ্রে ফেলে রেখে উধাও হয়েছিল সোহাগ।
মহিম সেই থেকে ভেবে যাচ্ছে। ভেবেই যাচ্ছে।
বেলা সাতটায় উঠোনে রতনকে দেখতে পেয়ে ডাকল মহিম। রতন ওপরে এলে মহিম বলল, এগুলো তোর পিসিকে দিয়ে আয়। কাসুন্দি-টাসুন্দি রাখতে তো বোতল লাগেই।
রতন হাসল, পিসি ও বোতল নেবে নাকি?
কেন নেবে না?
ও তো মদের বোতল!
মহিম চিন্তিত হয়ে বলে, নেবে না বুঝি? তা হলে থাক।
পিসি নেবে না। আমি তো কালই ওদের মালপত্র নামাতে গিয়ে বোতলগুলো দেখে পিসিকে বলেছিলাম। পিসি যা রেগে গেল!
রেগে গেল কেন?
বলল মদের বোতলে আমি কাসুন্দি বিক্রি করব? ছিঃ ছিঃ! খবরদার ও কথা আর মুখে আনবি না। আমি ভয়ে আর কিছু বলিনি বাবা! মা বলেছে শিশিবোতলওয়ালা এলে বেচে দেবে। ওরা নাকি মদের বোতলের দাম বেশি দেয়।
মহিম রতনের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ওকে এত মদ কে এনে দিত বল তো! তুই?
না, কাকা নিজেই কিনত। তবে আমিই মোটরবাইকে করে কাকাকে বর্ধমান নিয়ে গেছি দুদিন। মদ কিনতে। তুমি মদ নিয়ে এত ভাবছ কেন দাদু? ওসব আজকাল জলভাত, সবাই খায়।
তাই দেখছি।
দুনিয়ায় যে মদ্যপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে সে খবর একটু জানে মহিম। যৌবন বয়সে সেও খেয়েছে কখনও-সখনও। তবে শখ করে। কথাটা হল, মদ্যপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে কেন?
এমন নয় যে, মদের বিরুদ্ধে মহিমের কোনও জেহাদ আছে। বহু বহু যুগ আগে থেকেই সুরার প্রচলন রয়েছে মানুষের সভ্যতায়। দেবতারাও নাকি খেতেন-টেতেন। তবু যে ক্ৰমে ব্যাপারটা খুব চারিয়ে যাচ্ছে তার মানে কী, আলাদা একটা পিপাসা তৈরি হয়েছে? নাকি মানুষের নানা ব্যর্থতা আর হতাশা থেকেই বাড়ছে মদের আসক্তি!
প্রশ্নটার সমাধান সহজ নয়।
বেলা দশটায় মহিম গৌরহরির বাড়ির উঠোনের রোদে মোড়া পেতে বসা। সামনে একটা জলচৌকিতে বউঠান।
অনেকদিন পরে এলেন ঠাকুরপো! অমলরা ছিল বলে বোধহয় আসার সময় পাননি।
মহিম মাথা নেড়ে বলে, তা নয় বউঠান। ওরা ওদের মতো ছিল, আমি আমার মতো। আসলে গৌরদাই তো নেই, তাই আসতে একটু কেমন কেমন লাগত! বুকটা ছ্যাত করে উঠবে হয়তো, সেই ভয়েই আসতাম না।
বলাকার মুখখানা ভারী করুণ হয়ে গেল।
তবেই বুঝুন তাকে ছাড়া আমি কী করে আছি। আমার বুক তো ছ্যাঁত করে ওঠে না, সব সময়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
এত বড় বাড়িটায় একা কী করে থাকবেন বউঠান? গৌরদা ভাইয়েদের অংশ কিনে নিলেন, আমি তখন বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, এত বড় বাড়ি তার কোনও কাজে লাগবে না। তা অন্যের কথা শুনে চলবেন তেমন মানুষ তো ছিলেন না।
সে তো সত্যি কথা। বাড়িটা তো সারাদিন আমাকে গিলে খাচ্ছে। তবু পড়ে আছি। আমার তো অন্য গতি নেই।
কলকাতা বা নেহাত বর্ধমান শহর হলেও না হয় প্রোমোটারকে দিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি বানিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু গ্রামদেশে তো তা হওয়ার জো নেই।
না ঠাকুরপো, কলকাতা হলেও এবাড়ি আমি কক্ষনও প্রোমোটারকে দিতাম না। যার বাড়ি সে এখনও এ-বাড়ির সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। আমি তো সব সময়ে তাকে টের পাই। ওই যেখানে আপনি বসে আছেন ওখানে বসেই এই শীতকালে তেল মাখত। সেই দৃশ্য যে এখনও দেখতে পাই।
আপনি নমস্যা বউঠান। লোকেও বলে, এমন সতীলক্ষ্মী আজকাল আর দেখা যায় না।
বলাকা মিষ্টি করে হেসে বলে, সেসব কিছু বুঝি না, শুধু জানি, সে ছাড়া আমি নেই। সত্যি কথা বলতে কী, এখন আমি নেই-এর দলেই পড়ে গেছি। বেঁচে আছি, আবার নেইও।
এইসব কথা শুনলে কান, মন সব পবিত্র হয়। ভালবাসা নিয়ে আজকাল যত বড় বড় লেকচার দেয় লোকে, কিন্তু ভালবাসা কি সোজা জিনিস! তার পিছনে কত ত্যাগ, ধৈর্য, অধ্যবসায় থাকে, কত সেবা, কত স্বার্থহীনতা। এ যুগে হালকা মনের বেলুন-মানুষেরা তা কী করে বুঝবে! এই বলাকা বউঠানকে সেই কিশোরীবেলা থেকেই তো দেখছে মহিম। এক ফোঁটা একটা রোগাটে গড়নের মেয়ে। মুখখানা তিরতির করত। খুব ফর্সা রং আর মেঘের মতো এক ঢল চুল ছিল। গৌরহরি তখন মধ্যযৌবনের রাঙা এক যুবাপুরুষ। মহিমের চোখের সামনেই সম্পর্কটা গড়ে উঠল। একদিকে একজন নাবালিকা, অন্য দিকে একজন শক্তসমর্থ পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। বয়সের তফাত শুনলে এ যুগের ফচকে ছেলেমেয়েরা আঁতকে উঠবে। হয়তো বলবে বাপের বয়সি। তা কথাটা মিথ্যেও তো নয়। পতি আর পিতা একই ধাতু নিষ্পন্ন শব্দ। পতি অনেকটা পিতার মতোই। এখনকার দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে অনেক ফিচেলপনা ঢুকে গেছে, আকচা-আকচি ঢুকে গেছে, ইয়ারবন্ধুর মতো হাবভাব, ওতে স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারটাই ফুটে ওঠে না মোটেই। যেন সেক্স পার্টনার। সম্পর্কের দফার ওখানেই গয়াপ্রাপ্তি ঘটে যায়।
নাবালিকা বউকে নিয়ে গৌরহরির ঘর করা স্বচক্ষে দেখেছে মহিম। কী স্নেহ আর নরম কথা দিয়ে বাপের বাড়ির বিরহে কাতর বলাকাকে ভুলিয়ে রাখতেন গৌরহরি। বাড়ির লোকের চোখের আড়ালে গোপনে তাকে পড়াতেন, গল্প বলতেন। একবার বাড়ির সবাই তীর্থভ্রমণে গেল, তখন বলাকার হল টাইফয়েড। অন্য কেউ হলে ঝামেলা এড়াতে বউকে ঠিক বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিত বা শাশুড়ি-শ্বশুরকে ডেকে আনত। গৌরহরি তা করেননি। গু-মুত পরিষ্কার করা থেকে পথ্য পর্যন্ত সবকিছু সামলেছেন। একটুও বিরক্ত নেই, ঘিনপিত নেই।
