পান্না কথাটা ভাল বুঝতে পারল না। আবছা মনে হল, পারুলের মেয়ে হয়ে জন্মায়নি বলে ওর একটু বুঝি দুঃখ আছে।
মেয়েটা ফের যেন, পান্নাকে নয়, আকাশ বাতাসকে বলল, ইউ ক্যান্ট চুজ ইওর পেরেন্টস। ক্যান ইউ?
এ কথাটাও পান্না বুঝল না। মেয়েটার মনে বোধহয় একটা কষ্ট আছে। কিন্তু পান্না কী বলবে! মুখখানা হাসি-হাসি করে বসে রইল, যদিও কথাটা মোটেই হাসির নয়।
বাটিটা রেখে মেয়েটা উঠল। বলল, থ্যাংক ইউ ফর এভরিথিং।
আবার আসবে না?
হাসি মুখে সোহাগ বলে, আসব। ইউ আর সিম্পলি চার্মিং। তুমিও চলে আসতে পার। তবে ইউ মে নট লাইক আওয়ার লট। আমরা একটা আনহ্যাপি ফ্যামিলি।
পান্না জানে, এখন কৌতূহল প্রকাশ করা উচিত নয়। তাই সে বলল, তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে।
থ্যাংক ইউ।
তোমাকে পথ দেখিয়ে দেব? নইলে ফের রাস্তা গুলিয়ে ফেলে অন্য কারও উঠোনে গিয়ে উঠবে হয়তো।
সোহাগ হেসে ফেলল, না না, পারব।
মানুষ চলে গেলেও তার একটা রেশ থেকে যায়। কিছুক্ষণ রেশটা বাতাসে অনুভব করল পান্না। দু একটা কথা যেন গুনগুন করে উড়ে বেড়াতে লাগল তার চারপাশে।
কালো কলকা পাড়ের সাদা খোলের শাড়িটা পরে নিতে নিতে সে দেয়ালঘড়ির দিকে চাইল। একটা পাঁচ। আজ মায়ের বকুনি খেতে হবে। বড্ড দেরি করে ফেলেছে সে।
ফুল ফুটলেই যেমন মৌমাছি এসে জোটে তেমনই যেন পারুলদিকে ঘিরে মেয়েপুরুষের একটা ছোট্ট ভিড়। একে সুন্দরী তায় বড়লোকের বউ। বাবার কাছে শুনেছে ওদের নাকি বছরে দশ বারো কোটি টাকার টার্নওভার। টার্নওভার কথাটার মানেই জানে না পান্না। ব্যবসাবাণিজ্যের কথা সে কী বুঝবে? তবে ওদের যে অনেক টাকা সেটা আঁচ করতে পারে।
এই, কাছে আয় তো! বাঃ, দিব্যি মিষ্টি হয়েছিস তো দেখতে।
যাঃ, তোমার কাছে আমি! কী যে বলো!
বেশি সুন্দরী হওয়া কি ভাল? এরকমই ভাল। রোগা কেন রে!
পান্না লজ্জা পেয়ে বলে, এমনি। আমার গায়ে মাংস লাগতেই চায় না।
শেষবার যখন তোকে দেখেছিলুম তখনও ফ্রক পরতিস।
এখনও পরি।
পরিস? তোর মতো বয়সে আমিও পরতুম। কিছুতেই বড় হতে ইচ্ছে হত না। কিন্তু বয়স কি আটকানো যায় বল! চোরাপথে ঠিক বয়স বেড়ে যায়।
কিন্তু পারুলদি, তোমার তো একটুও বয়স বাড়েনি।
তোর চেয়ে আমি কুড়ি বছরের বড় তা জানিস? তুই যদি যুবতী তো আমি থুত্থুড়ি।
হি হি করে হেসে ফেলে পান্না। কী মিষ্টি গন্ধ আসছে পারুলদির গা থেকে। আজ সাজেনি একদম, তবু চারদিকে যেন রূপের ঢেউ ভেঙে পড়ছে। চারদিকে মুগ্ধ দৃষ্টির ভিড়।
পান্না সরে এল। এটুকুই ভাল। এর চেয়ে বেশি ভাল নয়। পারুলদি ঈশ্বরীর মতো। সাঁইত্রিশেও ব্যালেরিনার মতো শরীর, গজদন্তের মতো রং, ভগবানের অনেক পরিশ্রমে তৈরি মুখের ওই কারুকার্য। এত সুন্দরীর নাকি সুখী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কপাল। স্বামীর সোহাগ যে মেয়েদের মুখে ফুটে থাকে। তাকে কি লুকোনো যায়। দূর থেকে ওই সোহাগের আলো স্পষ্ট দেখতে পেল পান্না পারুলের মুখে। ওর মেয়ে হয়ে জন্মায়নি বলে সোহাগের কি খুব দুঃখ?
বড় জ্যাঠামশাইয়ের আত্মা আজ প্রেতলোক ছেড়ে দেবলোকে চলে গেল। ভিড়ে ভিড়াক্কার মণ্ডপ। লুচি ভাজার গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল পান্নার।
এই, তুই কোথায় ছিলি রে এতক্ষণ! খুঁজে খুঁজে মরছি।
এক দঙ্গল মেয়ে ধেয়ে এল। পনেরো ষোলো সতেরো আঠেরোর পায়েল, নয়না, ঝুমুর, রুমকি, পুকু। তারপর হা-হা, হু-হু, হি-হি। দমকা বাতাসে মনের সব ধুলোময়লা উড়ে গেল। তারপর একসঙ্গে বসে খাওয়া আর খেতে না পারা।
তারও পর একসময় নির্জন আর একা হয়ে যেতে হয়। সন্ধ্যা নামে। শাঁখ বাজে। প্রেতলোকের অন্ধকার থেকে ধোঁয়াটে ভূতেরা নেমে এসে ঝুলে থাকে একটু ওপরে। তখন কান্না পায়। তখন রোজ মরতে ইচ্ছে করে। তখনই মন কু-ডাক ডাকতে থাকে, গায়ে আগুন, না গলায় দড়ি? গলায় দড়ি, না গায়ে আগুন?
দশ দিন গান-টান গাওয়া নিষেধ ছিল অশৌচ বলে। আজ হারমোনিয়াম নিয়ে বসল একটু। অমনি মা এসে হাজির।
এখন আবার হারমোনিয়ম নিয়ে বসলি কেন? সামনে পরীক্ষা না?
মনটা খারাপ লাগছে মা।
রোজই মন খারাপ, রোজই শরীর খারাপ, এ কেমনধারা কথা? গতর বসিয়ে রাখলে যে শুঁয়োপাকা ধরবেই।
মা তাকে দু চোখে দেখতে পারে না। মা সবচেয়ে বেশি ভালবাসে দাদাকে, তারপর হীরাকে। পান্না তার দু চোখের বিষ, যেন সৎ মেয়ে। আজ কেন যে কান্না পেল খুব। হারমোনিয়াম তুলে রেখে পড়ার টেবিলে বসে সে বই খুলে চেয়ে চোখের জলে বুক ভাসাতে লাগল। মরবে, সে একদিন মরে সবাইকে ঠিক এইরকম কাঁদিয়ে ছাড়বে।
কান্না থেকে ঢুলুনি, ঢুলুনি থেকে ঘুম।
মাস ছয়েক আগে এরকমই এক সন্ধেবেলা সাঁঝঘুম থেকে তাকে ঠেলে তুলেছিল মা। বকাঝকা নয়, বরং খুব আহ্লাদের গলায় বলেছিল, ওরে ওঠ, ওঠ, দেখ কারা এসেছে।
অবাক হয়ে বলল, কারা এসেছে মা?
ওরে তারা মস্ত মানুষ, বিরাট গাড়ি নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি চোখে মুখে জল দিয়ে আয় দেখি।
কিচ্ছু বুঝতে পারেনি সে। চোখে জল দিয়ে আসতেই মা বলল, ওই শাড়ি বের করে রেখেছি। চুল টুল আঁচড়ে একটা টিপ পরো, শাড়িটা ঠিকমতো পরবে কিন্তু, কুঁচি-টুচিগুলো লক্ষ রেখো। মুখে একটু পাউডার দিয়ে নিয়ে বাইরের ঘরে এসো। হড়বড়িয়ে এসো না, ধীরে সুস্থে।
কিচ্ছু বুঝতে পারেনি পান্না। ঘুমচোখে সাজতে কারও ভাল লাগে।
