তবে সন্ধ্যার কথাটার প্রতিবাদও করল না মহিম। প্রিয় মানুষরা স্মৃতিতে মহান হয়ে যায়। প্রতিবাদ করবেই বা কেন মহিম! করে লাভ কী?
সে মৃদুস্বরে বলল, আমার তো অসুবিধে হচ্ছে না। তোরা সব কাজকর্ম নিয়ে আছিস। যদি অচল হয়ে পড়ি তখন দেখা যাবে।
তবু মায়ের মতো যত্ন কি আর কেউ করতে পারবে?
মহিম হেসে বলল, আমাকে নিয়ে কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লে বরাবরই আমার অস্বস্তি হয়। মানুষের উৎপাতের কারণ যত না হওয়া যায় ততই ভাল।
না বাবা, তোমার কথা ভেবে মাঝে মাঝে আমার কিন্তু কষ্ট হয়। মুখ ফুটে কিছু বল না বটে, কিন্তু অসুবিধে কি আর না হচ্ছে!
দুর পাগল, অসুবিধে আবার কী? বেশ আছি।
খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ সন্ধ্যা বলল, বাবা, একটা কথা বলব? আমার বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে বলো দেখি!
মহিমের বুকে যেন শক্তিশেল এসে পড়ল। এটা সন্ধ্যার অনুযোগ নয়, নালিশ নয়। বাপের বিরুদ্ধে অভিমান বা রাগও নয়। খুব স্বাভাবিক গলায় নিরাবরণ একটা প্রশ্ন। তাই বোধহয় সেটা রাখঢাক না করেই সোজা এসে পড়ল হাতুড়ির ঘায়ের মতো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিম বলল, সেটাই তো ভেবে ভেবে সারা হই।
আমিও ভাবি বাবা। টাকা কিছু কম তো রোজগার করি না। ব্যবসা বাড়বে, কাজকর্ম বাড়বে, রোজগারও বাড়বে। কিন্তু শুধু টাকা দিয়ে কী হবে বল তো!
মহিম এ কথার কী জবাব দেবে? টাকার উপযোগিতা এক এক বয়সে হয়তো এক এক রকম। আশি বছর বয়সে মহিমের এখন টাকা জিনিসটার প্রতি কোনও মোহ নেই। হয়তো অভাবি, উপোসি হলে মোহ থাকত। ঠেকায় না পড়লে টাকার চিন্তা এখন কদাচিৎ মাথায় আসে।
সে মৃদু স্বরে বলল, সেটা তো মস্ত প্রশ্ন মা। টাকা দিয়ে সব সমস্যার তো সমাধান হয় না।
হ্যাঁ বাবা, আমার কত বয়স হল বল তো! এখনও কতদিন বাঁচতে হবে! ভাবলে কেমন মাথাটা পাগল পাগল লাগে। কাজকর্মে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে বুকটা মুচড়ে ওঠে।
মহিম মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারল না। অপরাধী চোখ নেমে এল নীচে।
সন্ধ্যা বলল, সেই মানুষটাকে সামনে পেলে একবার জিজ্ঞেস করতাম, আমার দোষটা কী ছিল। কুচ্ছিত! কত কুচ্ছিত হ্যাঁক-ছিঃ মেয়েও কেমন দিব্যি সুখে ঘর করছে বল তো! আমি কুচ্ছিত হলেও তাকে ভরিয়ে দিতে পারতাম, কোথাও খুঁত থাকত না একটুও।
একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে মহিম বলে, কতবার ভেবেছি একবার ওর কাছে যাব। গিয়ে কী দেখব কে জানে, হয়তো দ্বিতীয় বিয়েটা সুখের হয়নি। হয়তো তোর কথা মনে করে ওর অনুশোচনা হয়।
সন্ধ্যা বোকা হলেও ব্যবসা-ট্যাবসা করে বাস্তব বুদ্ধি হয়েছে খানিকটা। মুখখানা ভার করে বলল, ও কথা আমারও মনে হত বাবা, পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে। কিন্তু আমার কপালে ওরকম হবে না বাবা।
মহিম চুপ করে থাকে।
সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আজকাল তাই বড্ড একাও লাগে। তাই ভাবছি–
কী ভাবছিস রে মা?
সে তোমাকে আর একদিন বলবখন। আগে ভাল করে ভেবে নিই, তারপর বলব। একদিন তো বলতেই হবে।
সেই একদিনটা আজও আসেনি। না আসাই ভাল। সন্ধ্যা যা-ই বলুক সেটা মহিমের খুব পছন্দসই হওয়ার কথা নয়। যে ছোকরাটি আসে সেও আর পাঁচজনের মতোই সন্ধ্যার তৈরি আচার, কাসুন্দি, আমলকী নিয়ে গাঁয়েগঞ্জে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দেয়। পরিশ্রমী, কেজো চেহারা। একদিন সোহাগ মহিমের ঘরে বসেছিল দুপুরবেলা। গল্প করতে করতে জানালা দিয়ে কী দেখে থেমে গেল।
তারপর বলল, দাদু, দেখো।
কী দেখব রে?
দেখো না ওই লোকটাকে।
মহিম দেখল। কালো, বৈশিষ্ট্যহীন চেহারার বছর ত্রিশ বয়সি একটা ছেলে।
ও কে রে দিদিভাই?
ভাল করে দেখেছ?
দেখলাম তো!
পিসিকে ওর সঙ্গে মানাবে?
মহিম চমকে উঠে বলে, তার মানে কী রে?
মুখটা খুব করুণ হয়ে গিয়েছিল সোহাগের। বলল, পিসিটা না ভীষণ লোনলি।
তা তো জানি। কিন্তু মানানোর কথা কী বললি দিদিভাই?
ও কিছু না।
কথাটা ওখানেই থেমে গিয়েছিল।
কয়েকদিন পর সোহাগ আর একদিন মহিমের সঙ্গে গল্প করতে করতে হঠাৎ বলেছিল, পিসির একজন বয়ফ্রেন্ড হলে ভাল হয়, না দাদু?
মহিম অবাক হয়ে বলেছিল, সে কী! বয়ফ্রেন্ড কেন?
সোহাগ বলল, কোনও কোনও মহিলা আছে যারা সিংগল থাকতেই পছন্দ করে। বিয়ে-টিয়ে পছন্দ করে না, করলেও অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারে না। আবার কোনও কোনও মহিলা আছে যাদের কাছে ম্যারেজ ইজ এভরিথিং। বিয়ে না করে থাকার কথা তারা ভাবতেই পারে না। জান? পিসি হল এই সেকেন্ড টাইপের।
সেটা যে মহিম জানে না তা নয়। সন্ধ্যা ছেলেবেলা থেকেই ঘর-গোছানো মেয়ে। কাজেকর্মে পরিপাটি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কখনও আলসেমি বলে তার কিছু দেখেনি মহিম। ওর মাও বলত মুখখানা সুন্দর নয় বটে, কিন্তু যার ঘরে যাবে তার ঘরে লক্ষ্মীশ্রী ফুটে উঠবে।
মহিম বলল, তুই পিসিকে নিয়ে খুব ভাবিস বুঝি?
ভাবব না? শি ইজ এ ডেজার্টেড উওম্যান!
আমিও খুব ভাবি। হ্যাঁ রে দিদিভাই, তোর পিসি কি আবার বিয়ে করার কথা ভাবে?
একটু দ্বিধায় পড়ে সোহাগ বলেছিল, নট একজ্যাক্টলি।
তা হলে?
আমার মনে হয়, পিসি ওয়ান্টস এ ফ্যামিলি অ্যারাউন্ড হার।
এটাও তো একটা পরিবার, তাই না?
না না এরকম নয়। পিসি ওয়ান্টস হার ওন ফ্যামিলি। ক্রিয়েটেড বাই হার।
মহিম চুপ করে গিয়েছিল। সতেরো বছর বয়সি নাতনির সঙ্গে এ বিষয়ে আর অধিক কথা বলাটা শোভন হত না।
