খাটের ওপর বসে মহিম অমলের কথাই ভাবছিল। ছেলেপুলে বড় হলে ঘাটের সঙ্গে মাঝদরিয়ার নৌকোর মতো তফাত হয়ে যায়। তবু সেই হামাটানা অমল, সেই পৈতের দিন ন্যাড়ামাথা অমলের চুলের জন্য কান্না, সাঁতার শিখতে গিয়ে হাবুডুবু অমলের সেই বাপের গলা জড়িয়ে ধরা, সব মনে পড়ে যাচ্ছিল আজ। মায়া কি ছাড়তে চায়! অমলের কথা থেকেই আরও কথা এল মনে। জিন, ডি এন এ, বংশগতি। কী সাংঘাতিক সব ব্যাপার-স্যাপার! যতদিন যাচ্ছে ততই যেন দুনিয়াটা বুঝ-সমঝের বাইরে চলে যাচ্ছে। ততই মনে হচ্ছে, জীবনটাকে ওপরসা ওপরসা দেখে তেমন কিছু বোঝা যায় না বটে, কিন্তু তার পরতে পরতে কত যে রহস্য লুকিয়ে আছে।
মদের খালি বোতলগুলো টেবিলের ওপর সাজাল মহিম। তারপর চেয়ে রইল। সে শুনেছে এক এক বোতল বিলিতি মদের দাম অনেক। এই আট বোতল মদের দাম কত তা ভাবতেও ভয় করে। এত পয়সা খরচ করে এত মদ কেন খায় কে জানে! এত মাথা ছেলেটার, অত ভাল রেজাল্ট করা, তারপর মোটা বেতনের চাকরি, তবু মুখখানায় কোনও সুখের ছাপ নেই। লেখাপড়া শিখে তা হলে কী হয় মানুষের? এত শিখে, এত জেনে মদের বোতলে এসে ঢুকতে হয় কেন?
বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ছেলেকে অনুভব করল মহিম। না, ছেলেটা বোধহয় সুখী হল না। কেন হল না তার কারণ খুঁজে বের করা হয়তো মহিমের সাধ্য নয়। তার চিন্তা ক্রমে অমলকে ছেড়ে মোনা, বুডঢা, তারপর সোহাগে এসে থামল। কোনও প্যাটার্ন নেই ওদের মধ্যে। এক এক জন এক এক রকম। কিন্তু প্যাটার্নটা নেই কেন? কোথায় গণ্ডগোলটা হচ্ছে?
জানালা দিয়ে নীচের উঠোনে সন্ধ্যাকে দেখতে পাচ্ছিল মহিম। ভাল করে আলো ফোঁটার আগেই উঠে পড়ে মেয়েটা। তারপর সারাদিন মোষের মতো খাটে। রূপ নেই, গানের গলা নেই, বিয়ে টিকল না–এইসব অভাব শরীর খাটিয়ে পুষিয়ে নিতে চায়। ভাল, ভাল, কিছু নিয়ে মেতে থাক। মনের ক্ষতচিহ্নগুলো নিয়ে বেশি নাড়াচাড়ার সময় না পাওয়াই ভাল।
এই সাত-সকালেই দু-চারজন মাল নিতে চলে এসেছে। বেলা হলে আরও আসবে। সন্ধ্যার জিনিসপত্র আজকাল খুব বিক্রি হচ্ছে। একদিক দিয়ে ভগবান বঞ্চিত করেছেন বটে, তাই কি অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দিচ্ছেন? বছর খানেক আগেই সন্ধ্যা একদিন মহিমকে কথায় কথায় বলে ফেলেছিল, তার নাকি সত্তর হাজার টাকার ওপর জমে গেছে। গ্রামদেশে একটা মেয়ের পক্ষে ঘরে বসে এত টাকা রোজগার বড় কম কথা তো নয়। এখন হয়তো ওর হাতে লাখ টাকার ওপরেই আছে, মাঝে একদিন বলেছিল, পেষাই মেশিন কিনে গুঁড়ো মশলার ব্যবসা শুরু করবে।
এই টাকার লোভেই কিনা কে জানে, একটা ছোকরা ওর সঙ্গে বোধহয় খানিকটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মহিম কানাঘুষো শুনেছে, বিয়েও নাকি করতে চায়। মহিম তাই উদ্বেগ বোধ করে।
এ বিষয়ে সন্ধ্যাকে কিছু জিজ্ঞেস করাটা অনুচিত হবে ভেবে চুপ করেই ছিল মহিম। উদয়াস্ত খাটে মেয়েটা, প্রেম-ট্রেম করার সময়ও তো পায় না। হয়তো রটনাই হবে ভেবে নিয়েছিল মহিম।
সন্ধ্যার ঘর মহিমের ঘর থেকে দু কদম। তবু সন্ধ্যা বাপের সঙ্গে দেখা করার সময় পায় না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখাচোখি হয় হয়তো, কিন্তু কথা বলার ফুরসত কই ওর? এখন কয়েকটা মেয়েকে মজুরি দিয়ে রেখেছে, তাদের কাজকর্ম তদারক করা, আদায়-উশুল, হিসেব-নিকেশ সবই তো একা সামলায়।
দিন কয়েক আগে একটু ফাঁক পেয়ে সন্ধেবেলা এল মহিমের কাছে।
বাবা, তোমার শরীর নাকি খারাপ?
কে বলল তোকে?
সোহাগ বলছিল, দাদুর জ্বর হয়েছে।
মহিম প্রসন্ন হেসে বলল, সেরকম কিছু নয়। ঠান্ডা লেগে সর্দি মতো হয়েছে একটু। সেরে যাবে।
সোহাগ তোমার কাছে খুব আসে, না?
আসে মাঝে মাঝে। গল্প-টল্প করে।
খুব অদ্ভুত মেয়ে, তাই না? আমার ভারী ভাল লাগে ওকে। আমার যদি ওরকম একটা মেয়ে থাকত বেশ হত।
মহিম চুপ করে থাকে। সন্ধ্যার যে ঘর-সংসার-সন্তান হল না তার জন্য নিজেকেই দায়ি বলে মনে হয় মহিমের। পাত্র পছন্দ করেছিল সে নিজেই। এমনিতে পাত্র কিছু খারাপও মনে হয়নি। কিন্তু বুদ্ধি-বিবেচনা-বিচার কত যে ওলট-পালট হয়ে যায়।
কালোজিরে ন্যাকড়ায় বেঁধে ছোট একটা পুঁটুলি করে এনেছিল সন্ধ্যা। আর এক প্যাকেট শুকনো আদাকুচি বাবার হাতে দিয়ে বলল, রাত্রে একটা কাথ তৈরি করে নিয়ে আসব। মা করত, মনে নেই?
মহিম হাসল। সবই মনে আছে। চেয়ার টেনে বাপের বিছানার কাছে বসে সন্ধ্যা বলল, সারাদিন এত ঝামেলা যায় যে তোমার সেবা-টেবা কিছু করতে পারি না। তোমার তো চিরকালের চাপা স্বভাব, মরে গেলেও নিজের অসুবিধের কথা কাউকে বলবে না।
ভাবছিস কেন? অসুবিধে হলে তো বলব! সামান্য সর্দিজ্বর, তা জ্বরটাও এখন নেই।
এ বাড়িতে তোমার দিকে তাকানোরও কারও সময় নেই দেখছি। মা মরে যাওয়ার পর থেকেই তোমার বড় অযত্ন হচ্ছে।
মহিম একটু হাসল। কথাটা একেবারেই ঠিক নয়। সন্ধ্যার মা কোনওদিনই মহিমকে মূল্য দেয়নি, আমলও দিত না। মহিমের নালিশ ছিল না বটে, কিন্তু অবহেলাটা সে খুব টের পেত। আর সেই অবহেলার মনোভাব মহিমের ছেলেমেয়ের মধ্যেও চারিয়ে গিয়েছিল। স্ত্রী যদি স্বামীকে সম্মান বা শ্রদ্ধা না করে তা হলে ছেলেপুলেরাও বাবাকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না। মহিমের যত্ন কেউ কখনও করেনি। তার জন্য তার বিশেষ দুঃখও নেই। ..
