কিছু হয়নি?
না তো। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়।
বাইরে বুডঢার পিছনে সোহাগ, বাসুদেব, তিন-চারজন দারোয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেয়ে অমল বলল, কটা বাজে এখন?
বুডঢা বলল, রাত দুটো।
মাই গড!
আর ইউ অলরাইট?
মাথা নেড়ে অমল বলল, হ্যাঁ, আই ফিল ফাইন।
কী করে গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লে তুমি?
জানি না। বুঝতে পারছি না। শরীরটা খারাপ লাগছিল খুব। তারপর আর মনে নেই।
নামতে যাচ্ছিল অমল, বুডঢা ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, এসো, ধরছি। আর ইউ রিয়েলি ও কে?
না, অমল ও কে নয়। তার হাত পা ঠিক বশে নেই। দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরছে। তবু সে নামতে পারল।
আমাকে ধরতে হবে না। পারব।
অমল ধীরে ধীরে হেঁটে লিফটে এসে উঠল। কী হয়েছিল তা সে খুব আবছা মনে করতে পারছিল মাত্র। এখনও মাথায় পারম্পর্য নেই। নট ইন অর্ডার।
ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে সব কটা আলো জ্বলছে। দরজায় দাঁড়িয়েই সে মুখোমুখি মোনাকে দেখতে পেল। ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। ও কি বাঘিনীর মতো ডিনারের জন্য বসে আছে। ওর ডিনার কি সে নিজে? তাকেই খাবে বলে ওত পেতে আছে নাকি?
.
৩৭.
ডি এন এ, জিন, শুক্রকীট–এসব নিয়ে মাথাটা মাঝে মাঝে বড্ড ডোম্বল হয়ে যায়। কী অশৈলী কাণ্ডকারখানা বাপু! জীবাণুর মতো ছোট এক চিজ, তার মধ্যে প্রাণ। শুধু প্রাণই বা কেন! তার মধ্যে স্বভাব, চরিত্র, মেধা, সব প্রোগ্রাম করা আছে। মাতৃগর্ভের জ্বণ থেকে কত বড় মানুষটা হয়ে দাঁড়ায় একদিন।
কোথায় পড়েছিল মহিম যে, অত মানে চলা, অর্থাৎ গতি। ওই অত থেকে আত্মা। যে কেবলই চলে। বাপের বীজ থেকে মাতৃগর্ভ হয়ে তার দুর্বার গতি। বেড়ে চলে, বেড়েই চলে। বংশগতির এই প্রবহমানতার কথা যত ভাবে মহিম তত এই বুড়ো বয়সে নতুন করে অবাক হয়। কত কাল, কত যুগ আগে সৃষ্টি হয়েছিল মানুষ, তখন থেকে তার চলা, অলিম্পিক মশালের মতো প্রাণ চলেছে, প্রাণ থেকে প্রাণ, ফের প্রাণ থেকে প্রাণে।
এই যে সে, মহিম রায়, সে কি একজন আলাদা আলটপকা মানুষ? তা তো নয়। কোন হাজার হাজার বছর আগে ছিল তার পূর্বপুরুষ, হয়তো বর্বর, ন্যাংটো, ভাষাহীন, সভ্যতাহীন। কেউ তার নামও জানে না। নামই ছিল না হয়তো। তার থেকে ধারা বয়ে এত দূর এল! তার পরও চলল কমল হয়ে, অমল হয়ে তাদের ছেলেপুলে হয়ে। বিচার করলে, জগতের সব মানুষেরই টিকি বাঁধা কোনও অজানা অন্ধকার যুগের এক অনামা মানুষ আর অজানা নারীর কাছে। আদম বা ঈভ হতে পারে তারা। বা অন্য কেউ।
মহিম ভাবতে ভাবতে থই পায় না। কী করে যে হচ্ছে ব্যাপারটা! কে চালাচ্ছে এই অদ্ভুত সৃষ্টির লীলা! যত বয়স হচ্ছে ততই যেন সব বেড়ে যাচ্ছে মায়া।
কাল ওরা চলে গেছে। আজ সকালে মহিম টুক টুক করে দোতলায় উঠে মুখোমুখি ঘরটায় তালা খুলে ঢুকল। বড্ড অগোছালো রেখে গেছে ঘরখনা। বেডকভার কুঁচকে আছে, মেঝেময় পড়ে আছে। নানা বর্জিত জিনিস। দেয়ালে মাথার টিপ সাঁটা। টেবিলের দেরাজ টেনে দেখল, তাতেও মাথার ক্লিপ, রিবন, সেফটিপিন, ফুরিয়ে যাওয়া লিপস্টিক পড়ে আছে। এখনও ঝটপাট হয়নি ঘরটা। সেন্ট পাউডারের গন্ধ বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মাঝখানের দরজাটা এখনও ছিটকিনি দেওয়া। দেখে একটু অবাক হয় মহিম। পাশের ঘরটায় অমল থাকত। কিন্তু মাঝখানের দরজাটা ছিটকিনি এবং বাটাম দেওয়া কেন? কে কাকে আটকাতে চেয়েছিল? স্বামী-স্ত্রী মধ্যে ছিটকিনি-দেওয়া দরজা থাকার তো কথা নয়! তার ওপর অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য আবার বাটামটাও আটকানো! দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকতেই ক্ষীণ অ্যালকোহলের গন্ধ পেল মহিম।
অমল মদ খায় তা মহিম জানে। যেদিন মধ্যরাতে মহিমের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছিল অমল সেদিনও গন্ধ পেয়েছে। মদ-টদ খাবে সে আর বেশি কথা কি? তবে টেবিলের নীচে পিছনের পায়ার কাছে সাত-আটটা মদের খালি বোতল দেখে মহিম –কোচকায়। এত মদের বোতল নিয়ে তো অমল কলকাতা থেকে আসেনি!
বিছানায় একটা ক্যালকুলেটর গোছের জিনিস পেয়ে মহিম হাতে নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে দেখল। এসব জিনিস মহিম চেনে বটে কিন্তু ব্যবহার জানে না। ঢাকনা খুলে দেখে, ছোট ছোট অনেক বোতাম। শুধু ক্যালকুলেটর ছাড়াও অন্য সব ব্যবহারও আছে নিশ্চয়ই। একবার ইচ্ছে হল বোতামগুলো এক-আধটা টিপে দেখে কী ঘটনাটা ঘটে।
কিন্তু সাহস হল না। কে জানে বাবা আনাড়ির হাতের টেপাটেপিতে খারাপ-টারাপ না হয়ে যায়। কাজের জিনিসটা ফেলে গেছে, হয়তো অসুবিধেয় পড়বে। রতনকে দিয়ে একটা ফোন করিয়ে দিতে পারলে হয়।
রতনকে ডেকে লাভ নেই। এখন সে ঘুমোচ্ছে। আগে গাঁয়ের ছেলেপুলেরাও ভোর-ভোর উঠে পড়ত। আজকাল রাত জেগে সব টি ভি-তে সিনেমা দেখে মাঝরাত অবধি। দু-একদিন মহিমকেও জোর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে হিন্দি, বাংলা সিনেমা দেখানোর চেষ্টা করেছিল। মহিমের বেশিক্ষণ ভাল লাগে না। সিনেমা-টিনেমা একটা বিশেষ বয়সের পক্ষেই বোধহয় ভাল। বয়স গড়িয়ে গেলে ধৈর্যও কমে যায় কিনা।
নিচু হয়ে টেবিলের তলা থেকে বোতলগুলো টেনে আনল মহিম। সব কটায় একই লেবেল আঁটা। ঢাকনা খুলে একটু গন্ধও শুক মহিম। গন্ধ কিন্তু বিকটেল নয়, একটু ঝাঝালো, এই যা। একটা বোতলে দেখল, একটু তলানি পড়ে আছে এখনও। সন্ধ্যাকে ডেকে বোতলগুলো দিয়ে দিলে হয়। ধুয়ে কাসুন্দি-টাসুন্দি রাখতে পারবে। এমনিতে অ্যালকোহল বিশুদ্ধ জিনিস, তাতে জীবাণু বাঁচে না।
