আজ রাগ করে গেছে।
রাগ করে কেন?
সামান্য একটু রাগারাগি করেছিলাম।
সোহাগ চুপ করে বসেছিল এতক্ষণ। এবার মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমার গলা আমি এখান থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। ও-ঘরের দরজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও।
মোনা গম্ভীর হয়ে বলল, রাগ করার যথেষ্ট কারণ ছিল বলেই করেছি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম হতেই পারে। আমাকে উপদেশ দিয়ো না।
স্বামী-স্ত্রী হলেই বুঝি ঝগড়া হবে। জেঠিমা আর জেঠুর মধ্যে তো হয় না! এতদিন থেকে এলাম সেখানে একদিনও তো তাদের ঝগড়া শুনিনি।
ওদের সঙ্গে আমার তুলনা করছ? তোমার লজ্জা করে না?
কেন, লজ্জা কীসের? তুলনা করলে কি তোমার প্রেস্টিজে লাগে নাকি?
তোমার জেঠুর ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। হি ইজ ডোমিনেটেড বাই হিজ ওয়াইফ। ওদের স্ত্রৈণ বলে।
বাঃ, বেশ কথা তো! ব্যক্তিত্ব থাকা মানেই বুঝি ঝগড়ুটে হওয়া! ব্রাভো!
শোনো সোহাগ, তুমি যদি আর বাড়াবাড়ি করো তাহলে কিন্তু আমি তোমার চুলের মুঠি ধরে গালে চটাস চটাস করে থাপ্পড় মারব। একেই টেনশন হচ্ছে, তার ওপর…
বুডঢা তাড়াতাড়ি এসে মাকে ধরল, হোয়াই সো অ্যাগ্রেসিভ মা? কাম ডাউন!
শুনছিস না কী বলছে!
শুনছি। কিন্তু এটা হেস্টি হওয়ার সময় নয়। ইট ইজ অলরেডি টুয়েন্টি পাস্ট টুয়েলভ। এবার আমাদের কিছু করা উচিত।
কী করবি তোরা ঠিক কর। আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
তুমি বরং একটু ঠান্ডা জল বা কোল্ড ড্রিংস খাও। মাথা ঠান্ডা করো।
শোওয়ার ঘরে যেতে যেতে মোনা চাপা গলায় বলছিল, একটা লম্পট, চরিত্রহীন লুম্পেন আমাকে ভাজাভাজা করে খেল। ডিসগাস্টিং!
সোহাগ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।
কোথায় যাচ্ছিস দিদি?
ছাদে।
এত রাতে ছাদে?
মাথা গরম লাগছে।
তুই ছাদে! মা বেডরুমে! আমি একা কী করব বল তো! বাবার যে কী হল।
পারহ্যাপস হি হ্যাজ কমিটেড সুইসাইড। এ-বাড়িতে এরকমই একটা কিছু হওয়ার কথা।
যাঃ, কী যা তা বলছিস!
লিভিং টুগেদার ইজ অ্যান আর্ট বুডঢা। আর আমরা সেটাই শিখিনি।
রেগে যাচ্ছিস কেন? লেট আস টক অ্যান্ড সর্ট আউট দি থিংস। বাবা কটার সময় বেরিয়েছে?
ঠিক জানি না। ঘড়ি দেখিনি। পাঁচটার পর।
কিছু বলে যায়নি?
না। হি জাস্ট লেফট।
পোশাক?
যেটা পরনে ছিল। পোশাক ছাড়ার আগেই দে হ্যাড দি ফাইট।
খুব ভায়োলেন্ট কিছু?
দে আর অলওয়েজ ভায়োলেন্ট।
কী নিয়ে ঝগড়া শুনেছিস?
সোহাগ একটু ভেবে মাথা নেড়ে বলল, না। বেডরুম কথাটা কানে এসেছিল। দে পিকাপ এভরিথিং অ্যান্ড এনিথিং ফর এ ফাইট।
বুডঢার বয়স এখনও ষোলো পূর্ণ হয়নি। তার মুখশ্রীতে এখনও নাবালকত্বের ছাপ। চোখ দুটো একটু ছলছল করছে। অসহায়ভাবে বলল, ইট ইজ টুয়েলভ থার্টি অলরেডি। কী করব বল তো!
সোহাগ গোঁজ মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাবাকে আমার খুব সিক মনে হয়েছিল।
শোওয়ার ঘরের দরজা খুলে হঠাৎ মোনা বেরিয়ে এসে বলল, ডোরবেলের শব্দ শুনলাম না?
বুডঢা মাথা নাড়ল, না মা। অন্য কোনও ফ্ল্যাটের আওয়াজ।
ডাইনিং টেবিলেই একটা চেয়ার টেনে ক্লান্ত মোনা বসে পড়ল, ফের বর্ধমানে ফিরে যায়নি তো!
বুডঢ়া বলে, দুর! কী যে বলো! দিদি বলছে বাবাকে সিক দেখাচ্ছিল। আমি ভাবছি রাস্তায় অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল কি না।
কপালটা ডান হাতের দু আঙুলে চেপে ধরে মোনা বলে, আমার মাথা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়।
তুমি শুয়ে থাকো না!
তোরা কী করবি?
বাসুদেব টেবিল পরিষ্কার করছিল। বলল, কিছু ভাববেন না বউদি, আমি নীচে নেমে আশেপাশে খোঁজ নিয়ে আসছি।
বুডঢা বলল, আমিও যাচ্ছি। চলো। দিদি, তুই যাবি?
হ্যাঁ।
মোনা বলল, বাসুদেব, থাক এখন থাক। তাড়াতাড়ি যাও।
তিনজন বেরিয়ে যাওয়ার পর মোনা বেডরুমে এল। লকার থেকে কন্ডোমের প্যাকেটটা বের করল। খুবই শস্তা, দিশি ব্র্যান্ড। এ-জিনিস নিশ্চয়ই কোনও অভিজাত বা রুচিশীল মানুষ ব্যবহার করবে না।
প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সে ভাবতে লাগল।
.
বিলিয়ার্ড টেবিলে একটা বলের সঙ্গে আর একটা বলের ধাক্কা লাগল। মৃদু টক করে একটা শব্দ। একটা বল গড়িয়ে গিয়ে আরও দুটো বলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল দু ধারে। টক টক। দুটো বল গড়িয়ে গিয়ে ধাক্কা মারল আরও দুটো করে বলে। টক টক টক টক। তারপর বলগুলো ছোটাছুটি করতে লাগল চারধারে। এ ওকে ধাক্কা মারছে। ও তাকে। সে একে। টকটক শব্দে জ্বালাতন হয়ে গেল অমল। টেবিল জুড়ে বলের বিশৃঙ্খলা আর টক টক শব্দ। পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। কান চাপা দিতে হাত তুলেছিল অমল। কিন্তু হাতটা আটকে যাচ্ছে কোথায় যেন। তুলতে পারছে না।
কিন্তু হাতটা তুলবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে গিয়েই গভীর আচ্ছন্নতা থেকে চোখ মেলে জেগে উঠল অমল। টের পেল, অসাবধানে সে তার ডান হাতের ওপরেই চেপে বসে আছে।
কোথায় বসে আছে তা বুঝতে একটু সময় লাগল তার। না, সে ঠিক বসেও নেই। একটু কাত হয়ে আছে ডানদিকে। সিটের পাশে তার ঘুমন্ত মাথা গড়িয়ে খাজটায় আটকে রয়েছে। আর তার কানের পাশেই জানালার কাঁচে শব্দ হচ্ছে টক টক।
খুব ক্ষীণ একটা ডাকও শুনতে পেল সে, বাবা! বাবা!
অমল সোজা হয়ে বসল। গাড়ির ভিতরটা ভ্যাপসা, দম বন্ধ করা অবস্থা। সে দরজার লকটা খুলে দিল।
এক ঝটকায় বাইরে থেকে দরজাটা খুলে বুডঢা আর্তস্বরে ডাকল, বাবা! কী হয়েছে তোমার?
কী হয়েছে তা অমলের মনে পড়ল না প্রথমে। কিছুই মনে পড়ল না। বাইরের এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসে শ্বাস টানল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, কিছু হয়নি।
