স্টার্ট বন্ধ করে জানালার কাঁচটা নামানোর জন্য হাত বাড়িয়েছিল সে। না, থাক। বাইরের শব্দ আসবে। গায়ের সোয়েটারটা ছেড়ে জামার কয়েকটা বোতাম খুলে দিল এবং এটুকু করতেই যেন ভীষণ পরিশ্রম হল তার। মাথাটা পিছনে হেলিয়ে চোখ বুজে বসে রইল অমল। ঘাম হচ্ছে, বড্ড ঘাম হচ্ছে তার। অল্প অল্প শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘাড়ে পিন ফোঁটার মতো যন্ত্রণা। মাথায় ঘূর্ণিঝড়। বুকে হাতুড়ির ঘা।
মরে যাচ্ছে নাকি? মরে যাওয়ার কথা মনে হতেই সে হাত বাড়িয়ে দরজায় হাতলটা ঘোরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু দরজার হাতলটা অবশ হাতে খুঁজেই পেল না। কাঁচ নামানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে তার অসহায় ভারী হাতটা ঝুলে পড়ে গেল। এভাবেই মরে যায় মানুষ? এত আচমকা! এত তুচ্ছভাবে? একটা অন্ধকার নেমে এল চোখে, চেতনায়। সব মুছে গেল।
ঘরদোর সারতে সারতে অনেক রাত হয়ে গেল মোনর। বাড়িতে না থাকলে যে কত অগোছালো হয়ে যায় সব কিছু! বিছানার চাদর, বেডকভার, বালিশের ওয়াড় সব বদলাতে হল। কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! এই বিছানায় রাতে শুতে হবে ভাবতেও তার বমি আসছিল। বাড়িতে গঙ্গাজল নেই। থাকলে তাও একটু ছিটিয়ে দিত মোনা।
কাজকর্ম শেষ করে যখন ঘড়ি দেখল মোনা তখন রাত সাড়ে দশটা বাজে। কম্পিউটারের সামনে এখনও ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে সোহাগ। বুডঢা বেরিয়েছিল, ফিরে এসে তার ঘরে বসে কার সঙ্গে যেন আধঘণ্টা ধরে টেলিফোনে কথা বলে যাচ্ছে। বাসুদেব রান্না শেষ করে ডাইনিং টেবিলে সব সাজিয়ে রাখছে। অমল এখনও ফেরেনি।
ঘড়ির দিকে চেয়ে একটু ভ্রূ কোঁচকাল মোনা। অমল এত রাত অবধি বাইরে থাকে না। পার্টি বা কাজ থাকলে অন্য কথা। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে নয়। আজ অবশ্য রাগ করে গেছে। রাগ! না, ভুল হল। আজকাল অমল বিশেষ রাগ-টাগ করে না। কেমন নেতিয়ে যায়।
এবার যন্ত্রটা বন্ধ করো সোহাগ। খিদেতেষ্টাও নেই নাকি? বিকেলে তো কিছুই খেলে না।
সোহাগ তার গভীর অন্যমনস্ক মুখটা একবার তার মায়ের দিকে ফিরিয়ে বলল, খাব।
ব্যস! খাব বললেই হবে? হাত মুখ ধোও। আজ আমার একটু বিশ্রাম দরকার। ওঠো।
উঠছি মা। পাঁচ মিনিট।
বুডঢার ঘরে পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল মোনা।
আর কতক্ষণ কথা বলবে? খেতে দিয়েছে। এসো।
হাত তুলে মাকে চুপ করতে বলে টেলিফোনে কথা কইতেই থাকে বুডঢা।
বাথরুমে ঢোকার আগে ফের ঘড়িটার দিকে তাকাল মোনা। পৌনে এগারোটা। সামান্য জ্ব কোঁচকাল সে। পৌনে এগারোটা! অমল ফেরেনি এখনও!
বাথরুমে মোনার একটু সময় লাগে। গিজারের গরম জলে ভাল করে স্নান করল আজ। যখন বেরোল তখন ফের ঘড়ির দিকে চোখ গেল তার। সোয়া এগারোটা।
ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে বুডঢা আর সোহাগ।
বুডঢা বলল, বাবা কোথায় মা?
কী জানি। সন্ধেবেলা তত বেরোল। বুঝতে পারছি না।
এগারোটা তো বেজে গেছে মা।
মোনা একথাটার কোনও জবাব দিল না। সামান্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। এত রাত করার কথা তো নয়!
সোহাগ হঠাৎ বলল, এখনই টেনশন করার দরকার নেই। আরও দশ পনেরো মিনিট দেখা যাক।
বুডঢা বলল, তারপরও যদি না ফেরে?
ফিরবে না কেন? নিশ্চয়ই ফিরবে। তোমরা খাও। কথাটা বলল বটে মোনা, কিন্তু গলায় কোনও জোর পেল না।
সোহাগ সামান্য বিরক্ত গলায় বলল, তোমরা কী নিয়ে আজ ঝগড়া করছিলে বলো তো!
মোনা ফুঁসে উঠে বলে, তা দিয়ে তোর কী দরকার?
তোমাদের মধ্যে যে কেন এত ঝগড়া হয় তা বুঝতে পারি না।
তোর বুঝে দরকার নেই। যখন আমার মতো অবস্থায় পড়বি তখন বুঝবি।
শোওয়ার ঘরে এসে মোনা বিছানায় বসে একটু হাঁফ ছাড়ল। উদ্বেগ বাড়ছে। ঘড়ির কাটা সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে যাচ্ছে। অমল ফিরছে না।
বাসুদেব এসে দরজায় দাঁড়াল, খাবেন না বউদি?
খাব। তোমার বাবু কোথায় গেলেন বলো তো!
আমি তো সাতটায় ফিরেছি। বাবু তো তার আগেই বেরিয়ে গেছেন।
নীচে গাড়ি আছে?
হ্যাঁ। গাড়ি নেননি তো।
আচ্ছা, ঠিক আছে, একবার দরোয়ানদের জিজ্ঞেস করে এসো তো বাবুকে তারা কোন দিকে যেতে দেখেছে।
ঠিক আছে। বলে চলে যাচ্ছিল বাসুদেব।
মোনা তাকে ডেকে বলল, থাক, ওদের জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। আমার খাবারটা একটু পরে দিও।
আচ্ছা।
রাত বারোটায় বুডঢা এসে দরজায় দাঁড়াল।
মা।
ডিমলাইটটা জ্বেলে চোখে হাতচাপা দিয়ে একটু শুয়েছিল মোনা। শরীর পরিশ্রান্ত বলে একটু তন্দ্রার মতোও এসে গিয়েছিল।
চমকে উঠে বলল, এসেছে?
না মা, বাবা এখনও আসেনি। উই মাস্ট ডু সামথিং।
কী করা যায়?
কোথায় যেতে পারে বলে মনে হয় বলো তো! টেলিফোন করে দেখতে পারি।
মোনা একটু চিন্তা করে বলল, সেটা একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে না? লোকে কী ভাববে? তোর বাবার তো কলকাতায় তেমন বন্ধু বা আত্মীয়ও কেউ নেই।
চুপ করে তো বসে থাকা যায় না। হাসপাতাল বা লালবাজারে খোঁজ নেব?
রাত বারোটা বাজে, না?
হ্যাঁ মা।
মোনা উঠে ড্রয়িংরুমে এসে এ-ঘরের ঘড়িটাও দেখল।
সোহাগ এখনও কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। তবে কম্পিউটার অন্ধকার।
লেক-এর ধারটা দেখে আসব মা?
মোনা অন্যমনস্ক চোখে ছেলের দিকে চেয়ে বলে, লেক! এত রাতে কি আর সে লেক-এর ধারে বসে থাকবে? এই ঠান্ডায়!!
কিছু তো করা উচিত। বারোটা বেজে দশ মিনিট।
ভাবছি কোথাও গিয়ে ড্রিংক করে পড়ে আছে কি না।
বুডঢা মাথা নেড়ে বলে, বাবা তো বাইরে ড্রিংক করে না কখনও!
