তা হলে কে ঢুকেছিল বেডরুমে? আর কারও তো অ্যাকসেস নেই। বেডরুমে চাবি দেওয়া থাকত। চাবি ছিল শুধু তোমার কাছে। এই জিনিসটা কি তাহলে উড়ে এল বিছানায়?
বেডরুমের খবর আমার জানা নেই। আমি ও-ঘরে একদিনও ঢুকিনি। চাবিটা খুঁজে পেতাম না। বাইরের ঘরে ডিভানটায় পড়ে থাকতাম।
অ্যান্ড দ্যাটস এ লাই। তোমার চোখ বলছে তুমি মিথ্যে কথা বলছ।
তার জীবনের স্থির ও নির্দিষ্ট মহিলাটির চোখে চোখ রাখতে পারছিল না অমল। আজকাল তার এই একটা রোগ হয়েছে, কারও চোখের দিকেই স্পষ্ট তাকাতে পারে না। অস্বস্তি হয়, ভয়-ভয় করে। চোখ নামিয়ে নিয়ে সে মৃদুস্বরে বলল, তোমার সন্দেহ হলে তুমি বাসুদেবকে জিজ্ঞেস করতে পার।
বাসুদেব বাড়ির চাকর। টাকা দিলেই তাকে ম্যানেজ করা যায় বা একবেলা ছুটি দেওয়া যায়। বুঝেছ? তা ছাড়া ওকে জিজ্ঞেস করাটা বিলো মাই ডিগনিটি।
যুক্তিটা অকাট্য। বাড়ির চাকরকে বাবুর চরিত্র নিয়ে জেরা করা যায় না।
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চরিত্র জিনিসটার কোনও মূল্য আছে বলে তার কখনও মনে হয়নি। আজকাল কেউ বড় একটা মূল্য দেয় না। তবে লুকোছাপা যখন আছে তখন ধরে নিতে হবে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন এখনও লোপাট হয়ে যায়নি।
ও-ঘরে সোহাগ কম্পিউটার নিয়ে বসে তার ই-মেল চেক করছে। কম্পিউটারে বসলে তার বাহ্যজ্ঞান থাকে না। দরজাটাও ভেজানো। তবু হয়তো একটা দুটো কথা কানে চলে গেছে। তার চেয়েও ভয়াবহ হল, ঘটনাটা মোন হয়তো ছেলেমেয়ের কাছে বলেই দেবে। আজকাল তার প্রতিশোধস্পৃহা বেড়েছে।
একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার। এক কাপ চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। দু-একটা টেলিফোন করলে ভাল হয়। অমল এসব মৃদু প্রয়োজনগুলিকে আমল না দিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে অনির্দিষ্টভাবে যেন পঞ্চভূতকে বলল, আমি একটু বেরোচ্ছি।
চাপা গলায় মোনা বলল, হ্যাঁ যাও। আর ওসব ব্যাপার বাইরেই মিটিয়ে এসো।
একটু দাঁড়িয়ে অমল ফের এগোতে যাচ্ছিল।
মোনা মৃদু স্বরে বলল, মিথ্যেবাদী কোথাকার! বেডরুমে ঢোকোনি। তাহলে জামাপ্যান্ট কোথায় পেলে? ওয়ার্ডরোব তো আমাদের বেডরুমে।
অমল দরজার কাছ থেকে ফিরে বলল, তুমি ভুলে যাচ্ছ, বুডঢার ওয়ার্ডরোবেও আমার কয়েকটা জামাপ্যান্ট রাখা আছে।
তুমি বেডরুমে ঢুকতে না কেন?
চাবিটা কোথায় রাখতাম মনে পড়ত না। মাঝেমধ্যে এমনিতেই তো আমি ডিভানে শুই। আফটার এ ফিউ ড্রিংকস।
তুমি মিথ্যেবাদী। ইউ আর লায়িং।
শোওয়ার ঘরে কন্ডোম, এ রহস্যকাহিনীর ভিলেন বানিয়ে এখন তাকে আরও কয়েকদিন ছিবড়ে করে ছাড়বে মোনা। তার কিছুই করার নেই। নানা প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত সময়ে শব্দভেদী বাণে বিদ্ধ হতে হবে তাকে। আজকাল তার অনুভূতি ভোতা হয়ে যাচ্ছে, মান অপমানের বোধও কমে গেছে অনেক। তবু মোনা যখন তাকে আক্রমণ করে তখন তার বুকের মধ্যে দমাস দমাস শব্দ হয়। মনে হয়, দুম করে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
কান মাথা দুটোই এখন ঝাঁ ঝাঁ করছে। গরম আর অস্থির লাগছে ভীষণ। বুকের মধ্যে সেই অদ্ভুত শব্দ। মাথা নিচু করে সে হলঘরে বেরিয়ে এল।
বাইরের হলঘরটা খুব বড়। ইংরেজি এল অক্ষরের মত। খাঁজের অংশটায় কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে বসে আছে সোহাগ। মগ্ন। এ সময়ে ওর বাহ্যজ্ঞান থাকে না। ইন্টারনেট এক সাংঘাতিক নেশা। হেরোইনের চেয়ে কম মারাত্মক নয়। ওরা ভাইবোন রাতের পর রাত জেগে সার্ফিং আর চ্যাট করে। টেলিফোনের বিল বেড়ে যায়।
অমল নিঃশব্দে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সোহাগ মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমরা কি এতক্ষণ ঝগড়া করছিলে?
থতমত খেয়ে অমল বলে, না তো।
বিরক্তির গলায় সোহাগ বলল, ওখান থেকে ফিরে আমার মনটা এখনও ভাল আছে। দয়া করে আমার মনটা আবার চটকে দিয়ো না। তোমরা যত ঝগড়া পাকাবে তত আমার মনটা বিগড়ে যাবে। আজকাল তোমাদের ঝগড়া আমি সহ্য করতে পারি না।
অমল আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো কোনও কথাই খুঁজে পাচ্ছিল না। একবার গলাখাঁকারি দিল। মুখ একবার খুলে ফের বন্ধ করে ফেলল। না, কথা দিয়ে শুধু কথা দিয়ে আজকাল সে কাউকেই কিছু বোঝাতে পারে না। বোঝানোর কিছু নেই তার।
তোমাদের মধ্যে কেন যে এত আকচাআকচি হয় বুঝি না বাবা। বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করো কেন? কী হয় তোমাদের? ইগো প্রবলেম?
সোহাগ যদি মোনার কথাগুলো শুনে থাকে তবে ভারী লজ্জার কথা। অমলের ভিতরে একটা হিজিবিজি অনুভূতি পাকিয়ে উঠছে। মাথার ভিতরে অদ্ভুত সব পাগলাটে ভাব আসছে। আজকাল তার সন্দেহ হয়, পাগল হয়ে যাচ্ছে কিনা।
সে আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে লিফট ধরে নেমে এল নীচে।
চমৎকার সিলভার গ্রে রঙের দামি গাড়ি তার। গায়ে ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে।
গাড়িতে উঠে স্টিয়ারিং হুইলের সামনে ঝুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে মাথাটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করল সে। মাথার ভিতরে ঘূর্ণিঝড়ে যেন নানা কুটোকাটা, ধুলোবালি, আবর্জনা পাক খাচ্ছে। পূর্বাপর কিছু মনে পড়ছে না তার। কান গরম, মাথা গরম, ঘাড়ে তীব্র ব্যথা। সে কি অজ্ঞান হয়ে যাবে! ভীষণ ঘাম হচ্ছে যে তার!
কোনওরকমে কাঁপা হাতে চাবি ঢুকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে এ-সি মেশিনটা চালু করে দিল। কিন্তু তেলের কাটা নেমে এসেছে প্রায় ই-এর ঘরে। তার মানে তেল ফুরিয়ে এসেছে। অথচ যাওয়ার আগের দিন সন্ধেবেলা সে দশ লিটার তেল নিয়েছিল গাড়িতে। জ কুঁচকে সে চেয়ে রইল ড্যাশবোর্ডের দিকে। এ-সি বন্ধ হয়ে যাবে। তেলের কাঁটা নেমে যাচ্ছে।
