চা! বলে কিছুক্ষণ শব্দটার অর্থ বুঝবার চেষ্টা করল সে।
আমরা সবাই খাচ্ছি। বেশ ভাল চা।
প্লাস্টিকের কাপে এক কাপ চা এগিয়ে আসে। প্রচণ্ড গরম লাগছিল আঙুলে। একটু হলেই পড়ে যেত। বুডঢা তার রুমালটা এগিয়ে দিয়ে বলে, এটা দিয়ে ধরো। তোমার অভ্যাস নেই, প্লাস্টিকের কাপের কানায় ধরতে হয়।
মুগ্ধ হয়ে শুনল অমল। কতটা বাংলা বলে গেল বুডঢা।
সোহাগ বলে, ঝালমুড়ি খাবে?
ঝালমুড়ি!
খাও না!
একটু অবাক হচ্ছে অমল। তার ছেলেমেয়েরা আজকাল তো এত সহজ নয় তার কাছে! কলকাতার ফ্ল্যাটে তাদের মধ্যে বাক্যবিনিময়ই হয় না বড় একটা। মাঝে মাঝে মায়ে মেয়েতে তুমুল ঝগড়া হয়, ধুন্ধুমার লেগে যায় স্বামী-স্ত্রীতে। যখন কথা হয় না তখন ফ্ল্যাটে শ্মশানের শান্তি বিরাজ করে।
ঝালমুড়ির ঠোঙা এগিয়ে আসে। ক্ষুধার্তের মতোই খায় অমল। এটাও একটা খারাপ লক্ষণ। তার আজকাল বিচ্ছিরি খিদে পায় এবং হামলে খায়। ফলে তার শরীরে চর্বি জমছে, ওজন বাড়ছে।
বাঁ পাশের লোকটা একটা বাংলা খবরের কাগজ পড়ছে। খবরের কাগজ জিনিসটাকে ভুলেই গিয়েছিল অমল। একটু উঁকি মেরে দেখতে ইচ্ছে করছিল তার, ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা চোখে পড়ে কিনা। তারপর ভাবল, কী লাভ জেনে?
টিকিট কার কাছে রে?
বুডঢা বলল, ট্রেনের টিকিট! আমার কাছে। কেন?
না, ভাবছিলাম দাদা তাড়াহুড়োয় আবার দিতে ভুলে যায়নি তো!
না, না। জেঠু খুব হুঁশিয়ার লোক। টিকিট কেটে ফেরত পয়সা গুনে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
শিডিউলের চেয়ে আধঘণ্টা দেরিতে হাওড়া স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকছে তখন অমলের ফের টেনশন হতে থাকে। দুটো ভারী স্যুটকেস যা টানতে পারার মতো শক্তি তার নেই, একা বুডঢা পারবে কি?
প্রসঙ্গ উঠতেই বুডঢা বলল, ইজি। দু হাতে দুটো ঝুলিয়ে তো নেওয়াই যায়। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ। কেন যে দুটো স্যুটকেসেই চাকা লাগানো আছে।
তাই তো! একদম খেয়াল ছিল না অমলের। এসব সহজ ব্যাপার তার মাথায় থাকে না কেন কে জানে!
বুডঢাই বলল, তাড়াহুড়োর দরকার নেই। ভিড় একটু পাতলা হলেই আমরা নামব।
ঠিক কথা। তবু অমলের ভিতরটায় একটা উচাটন ভাব। যেন সে পিছিয়ে পড়ছে, হেরে যাচ্ছে, পৌঁছতে পারবে না, অনিশ্চয়তা। কেন এরকম হয় আজকাল কে জানে।
বেশি দেরি করলে ট্যাক্সি পাব না।
বুডঢা অবাক হয়ে বলে, হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সির অভাব! কী যে বলো!
এর পরের ঘটনাগুলো তার কাছে পারম্পর্যহীন হিজিবিজি। তারা ভিড় ঠেলে এসে ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াল। হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি ঢুকল কলকাতায়। তারপর কেয়াতলা লেনের ফ্ল্যাটে একসময়ে পৌঁছে গেল তারা। কিন্তু এই গোটা ব্যাপারটা তার কাছে কেমন যেন স্বপ্নদৃশ্যের মতো। রিয়াল নয়। পরাবাস্তব?
বাড়ির কাজের লোক বাসুদেবের ওপর ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল তারা। না দিয়ে গেলে উপায়ও নেই। বাসুদেব বাড়িতে ছিল না। কোথাও বেরিয়েছে। মোন এই ফাঁকে দামি জিনিসপত্রগুলো ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছিল। টি ভি, কম্পিউটার, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি জিনিস ছাড়া গয়নাগাঁটি বা টাকাপয়সা বাড়িতে রেখে যায়নি তারা। কিছু বাসনপত্র তো থাকেই।
ঘরে ঢুকেই কম্পিউটার নিয়ে বসে গেছে সোহাগ। ই-মেইল চেক করছে একমনে। বুডঢা বাথরুমে।
ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল অমল। সামনে কেয়াতলার নির্জন পথ। বিকেলের আলো পড়ে আসছে দ্রুত। কিছুই দেখার নেই নীচে। ওপরে আবহমানকালের স্থির আকাশ। কয়েক কুচি মেঘ ভেসে আছে।
আজ কী বার তা হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করল অমলের। কী বার আজ। হাতঘড়িটার দিকে তাকালেই জানা যাবে। কিন্তু ইচ্ছে করেই তাকাল না সে।
শুক্র? শনি? এমন কী রবি? না, মনে পড়ছে না। সোমবার নয় তো আজ? হতেও পারে। আজ যে কোনও বার হতে পারে।
পিছনে হঠাৎ মোনার গলা পাওয়া গেল। তীব্র, জরুরি গলা, শোনো!
ধীরে মুখ ফেরায় অমল, কী বলছ?
ঘরে এসো, কথা আছে।
অমল এগিয়ে গিয়ে বলে, কী?
বাঁ হাতের মুঠো খুলে একটা জিনিস দেখিয়ে মোনা জিজ্ঞেস করে, এটা কী?
অমল কিছুক্ষণ জিনিসটা চিনতে পারে না। তারপর চিনতে পেরে বলে, কন্ডোম। কেন?
এটা আমাদের বিছানায় এল কী করে?
অমল অবাক হয়ে বলে, তা কী করে বলব!
তুমি জানো না?
অমল মাথা নেড়ে বলে, না।
চাপা হিংস্র গলায় মোনা বলে, আউট উইথ দি ট্রুথ!
৩৬-৪০. মোনা ফুঁসছিল
৩৬.
কিছু বুঝতে না পেরে মোনার মুখের দিকে চেয়ে থেকে অমল বলল, বিছানায় কন্ডোম কী করে এল তা আমি কী করে জানব?
মোনা ফুঁসছিল, চাপা হিংস্র গলায় বলল, তুমি ছাড়া কে জানবে? হোয়েন উই ওয়্যার অ্যাওয়ে, তখন তুমি এই ফ্ল্যাটে একা ছিলে। জবাব তো তোমারই দেওয়ার কথা।
অমল অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না।
এত নীচে তুমি নামতে পারলে? তোমার যদি মেয়েমানুষের দরকার ছিল তাহলে তুমি তো তাদের কাছেই যেতে পারতে! আমার বেডরুমে, আমাদের বিছানায় বাইরের মেয়ে নিয়ে আসতে তোমার ঘেন্না হল না?
অমলের ঘোলা মাথায় যেন জল ঢুকে আছে। বোধবুদ্ধি কাজ করছে না। সে শুধু অবাক হয়ে বলতে পারল, আমি! আমি! তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ মোনা?
সেটা কি অন্যায়? সবাই জানে তুমি লম্পট, কিন্তু তা বলে বেডরুমের স্যাংটিটিটাও বজায় রাখবে না এটা কীরকম?
লম্পট কথাটা তার মাথার মধ্যে দুম দুম করে দেয়ালে দেয়ালে হাতুড়ি মারছে। চরিত্র নিয়ে তার তো বড়াই করার কিছুই নেই। এই আক্রমণের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবেই বা কী করে সে? অমল তাই গুটিয়ে যেতে লাগল নিজের মধ্যে। মানুষ পুরোপুরি গুটিপোকা হতে পারে না কখনও। দুর্গ নেই, প্রাকার নেই, পরিখা নেই তার। অনায়াসে আক্রান্ত আর পর্যুদস্ত হওয়া ছাড়া তার কীই বা করার আছে। অমল তবু মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলে, আমি কিছু করিনি মোনা। আমি কিছুই করিনি…
