কী যে করবে অমল তা বুঝতে পারছিল না। এর চেয়ে বিদেশে থাকাই তার ভাল। তার মতো বৌদ্ধিক লোকদের পক্ষে এ-দেশ মোটেই উপযুক্ত নয়। আমেরিকার ইস্ট কোস্ট থেকে রুট এইট্টি ধরে সাড়ে তিন হাজার মাইল গাড়ি চালিয়ে যেতে তার কোনও অসুবিধেই হয়নি। আর এখানে বর্ধমান থেকে কলকাতা যাওয়া যেন মঙ্গলগ্রহ যাওয়ার মতোই কঠিন হয়ে উঠেছে তার কাছে।
লোকে তো যাচ্ছে। তবে সে পেরে উঠছে না কেন? বর্ধমান থেকে কলকাতা কত লোক তো ডেইলি প্যাসেঞ্জারিও করে। ব্যাপারটা তাদের কাছে জলভাত।
সামনের কম্পার্টমেন্টের কাছে একটু এগিয়ে গিয়ে ভিতরটা দেখল অমল। সাংঘাতিক চাপ ভিড় নয়, তবে বেশ কয়েকজন তোক দাঁড়িয়ে আছে। বসার জায়গা নেই।
পিছিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল অমল।
হঠাৎ পিছন থেকে কে এসে তার ডান কনুইটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, আয়, আয়, জায়গা পাওয়া গেছে!
দাদা কমলকে দেখে নিশ্চিন্ত হল অমল। দাদাকে কখনও জীবনে পাত্তা দেয়নি সে। পালে পার্বণে প্রণামও করে না। কথা হয় কালেভদ্রে। কিন্তু এখন মনে হল, দাদা যেন পারের কাণ্ডারী।
জায়গা পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ রে হ্যাঁ, পিছন দিকটায় ফাঁকা থাকে।
কত দূর? গাড়ি ছেড়ে দেবে না তো!
আরে না। এখনও এক মিনিট বাকি।
বাস্তবিকই একটা কামরা ছেড়ে পরের কামরাতেই ভিড় বেশ পাতলা।
উঠে পড়।
অমল উঠে পড়ল। পাশাপাশি না হলেও কাছাকাছিই তিনটে সিটে মোনা, সোহাগ আর বুডঢা বসার জায়গা পেয়েছে। বুডঢার পাশের সিটটা ব্যাগ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে তার জন্য। সিটের পাশে দাঁড় করানো স্যুটকেস।
বাবা, বোসা। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?
একটু লজ্জা পেয়ে অমল বলল, হারাইনি। আসলে এত ভিড়
আমি তো ভাবলাম, তুমি পড়েই রইলে বর্ধমানে।
কমল সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়ে বলল, মালপত্র সব গুনে নিয়েছিস তো বুডঢা?
হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। নামবার সময় কিছু ফেলে নামিস না!
না। তুমি নামো জেঠু, গাড়ি ছেড়ে দেবে।
আমি ঠিক নেমে যাব। ভাবিস না।
গাড়ি নড়ে ওঠার পর কমল দরজার দিকে গেল এবং চলন্ত গাড়ি থেকে টুক করে নেমে পড়ল।
জেঠু তোমার চেয়ে কত বছরের বড় বলো তো বাবা?
একটু অবাক হয়ে অমল বলে, চার বছরের। কেন বল তো!
জেঠু এখনও তোমার চেয়ে অনেক ফিট আছে। তুমি একটু ম্যান্তামারা হয়ে গেছ কিন্তু।
এতগুলো বাংলা কথা একসঙ্গে বুডঢার মুখে কখনও শোনেনি অমল। বিশেষ করে ম্যাস্তামারার মতো শব্দ। সম্ভবত বেশ কয়েকদিন গ্রামে বসবাসের ফলে ওদের ভোকাবুলারিতে গ্রামীণ বাংলারসঞ্চার ঘটেছে। আজকাল সোহাগকেও বেশ বাংলা বলতে শোনো অমল। তার মধ্যে গেঁয়ো শব্দও থাকে। ভাতের পাতে উচ্ছে সেদ্ধ দেওয়ায় রাগ করে একদিন বলেছিল, উচ্ছের নিকুচি করেছে।
মোনা বলে এখানে থেকে ওর কালচার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরপর গেঁয়ো মেয়েদের মতো ঝগড়া করতে শিখবে।
একটু দেরি করে বুডঢার কথার জবাব দিল অমল। হ্যাঁ, আমি যেন এখন কেমন হয়ে গেছি। সামথিং ইজ রং।
পাছে আশেপাশের লোক শুনতে পায় সেইজন্য বুডঢা খুব চাপা গলায় বলে, নাথিং ইজ রং। তোমার একটু ফিটনেস প্রবলেম আছে, আর কিছু নয়। আমাদের যোগ ক্লাসে ভর্তি হয়ে যাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বলছিস?
হ্যাঁ। যোগে মিরাকল হচ্ছে আজকাল।
অমল গভীর অবসাদ বোধ করছিল। সে তেমন কিছু পরিশ্রম করেনি, দৌড়ঝাঁপ করতে হয়নি, মাল টানেনি, সুতরাং এ অবসাদ শরীরের নয় নিশ্চয়ই। এই অবসাদের উৎস রয়েছে তার মনের মধ্যে। কোথায় কোন অতলগহীন মনোরাজ্যে এই অবসাদের শিকড় তা কে বলবে? যোগ ক্লাস কি তার মনকে সারাতে পারবে? না, এসব নিদানকে সে আজ আর বিশ্বাস করতে পারে না।
বাইরে বেলা তিনটের রোদে ক্ষেত-খামারের চিত্র ফুটে উঠছে। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে তা বলার নয়। উদাস চোখে চেয়েছিল অমল। আজকাল তার মনে হয়, এত লেখাপড়া না শিখলেই হত। দরকার ছিল না যান্ত্রিক জগতে ঢুকে পড়ার। প্রয়োজন ছিল না মোটা মাইনের চাকরি বা সুন্দরী স্ত্রী বা কলকাতার ফ্ল্যাট বা স্ট্যাটাস সিম্বলসমূহের। অনেক সহজ জীবনযাপন করতে পারত সে।
সোহাগ আড়াআড়ি ওপাশের সারিতে বসে একটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করছিল। এটাও নতুন ব্যাপার। পথেঘাটে যার তার সঙ্গে ভাব জমানোর অভ্যাস ওর নেই। এবং দিব্যি বাংলাতেই কথা বলে যাচ্ছিল। একটু একটু কানে আসছিল অমলের। ধীরে ধীরে পুরোপুরি বাঙালি হয়ে যাচ্ছে নাকি ওরা? ভাবতে ভাবতে চোখে তন্দ্রা জড়িয়ে এল অমলের। এ সেই মস্তিষ্কহীনের ঘুম। নির্বোধের ঘুম। অনুভূতিহীন মানুষের ঘুম। এই ঘুমটাকে খুব ভয় পায় অমল। আবার ঘুমোয়ও। ভারতের অর্থমন্ত্রীর নামটা তার আজও মনে পড়েনি।
সোহাগ ডাকল, বাবা!
চটকা ভেঙে যায় অমলের।
তার ঘুম মানেই স্বপ্ন। সে দেখছিল একটা কাক তিরবেগে উড়তে উড়তে একটা ইলেকট্রিক তার ভেদ করে চলে যেতে গিয়ে দু আধখানা হয়ে গেল। দুভাগ হওয়া কাকটা তারপর দুটো কাক হয়ে উড়ে যেতে লাগল। তারপরেই দেখল টিকিট নেই বলে টিকিট চেকার তাকে একটা অন্ধকার নির্জন স্টেশনে ট্রেন থেকে ঠেলে নামিয়ে দিয়ে বলল, এটাই শেষ ট্রেন। এবার অন্ধকারে বসে থাকুন, আর কোনওদিন কোনও ট্রেন এখানে আসবে না।
দুঃস্বপ্নই। চটকা ভেঙে যেন বাঁচল অমল। বলল, কী বলছিস?
চা খাবে? লেবু চা?
