মদন তাকে আপনি সরুন, আমি দেখছি বলে এক ঝটকায় স্যুটকেস দুটো নামিয়ে দু হাতে নিয়ে বলল, চলুন, প্ল্যাটফর্মে দিয়ে আসছি।
এই লোকটা তার চেয়ে বলবান, একথা ভেবে অমল হঠাৎ একটু ঈর্ষা বোধ করল। তার মস্তিষ্ক প্রখর, সোনার মেডেল-টেডেল পেয়েছে, তবু কত লোকের কাছে কতভাবে সে একজন হেরো।
টিকিটঘরের সামনে সুটকেস দুটো নামিয়ে মদন ভাড়া নিয়ে চলে গেল। স্টেশনটায় গিজগিজ করছে। ভিড়। ট্রেনে জায়গা পাওয়া নিয়ে সমস্যা হতে পারে।
অমল একটা স্বগতোক্তির মতো বলল, একটা কুলি নিলে হয়।
বুডঢা কাঁধ কঁকিয়ে বলে, কুলি! কুলির কী দরকার? আমি একাই পারব।
অমল মৃদু হতাশার গলায় বলে, পারবি না। ওভারব্রিজ পার হতে হবে।
জানি। ঠিক পারব।
কমল টিকিট কেটে এনে বলল, সেকেন্ড ক্লাসই কাটলাম, বুঝলি?
অমল বিরক্ত হয়ে বলে, কেন, সেকেন্ড ক্লাস কাটলে কেন? তোমাকে যে বললাম, এ সি চেয়ারকার কাটতে।
মুশকিল কী জানিস, এ সি মোটে একটা কামরা। সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আর সেকেন্ড ক্লাস হলে অনেক সুবিধে। করিডোর ট্রেন, একটা কামরায় সিট না পেলে আর একটায় চলে যেতে পারবি।
কিন্তু ভিড় থাকলে মালপত্র নিয়ে ওঠা প্রবলেম হবে না?
কোনও অসুবিধে নেই। এ সি-তেও উঠতে পারিস। টিকিট কনভার্ট করে নিলেই হবে।
এ-দেশে এই যে যাতায়াতজনিত নানা অসুবিধে এসব অমলের ঠিক ধাতে সয় না। লড়াকু লোকেরা এসব ঝঞ্ঝাট হাসিমুখে সয়ে বয়ে নিতে পারে। কিন্তু সে লড়াকু লোক নয়। সামান্য সমস্যাই তার কাছে বিরাট হয়ে দাঁড়ায়। টেনশন বাড়তে থাকে।
এখানে ট্রেনটা কতক্ষণ দাঁড়ায় বলতে পারো?
দু মিনিট।
মাত্র?
দু মিনিট কি কম সময়?
আবার একটা টেনশন তৈরি হল অমলের। মাত্র দু মিনিটে কি তারা চারজন, দুটো বড় স্যুটকেস, ব্যাগ-ট্যাগ সমেত ভিড়ের ট্রেনে উঠতে পারবে? ধাক্কাধাক্কি হবে না?
স্যুটকেস দুটো কমল আর বুডঢা ভাগাভাগি করে নিল।
কত নম্বর প্ল্যাটফর্ম?
কমল মাথা নেড়ে বলে, এখনও অ্যানাউন্স করেনি। এখন ওভারব্রিজে উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তিন বা চার নম্বরে দেয়। দুটোই আলাদা প্ল্যাটফর্ম তো!
ঈর্ষাকাতর চোখে অমল দেখল, কমল আর বুডঢা ভারী স্যুটকেস দুটো নিয়ে দিব্যি ওভারব্রিজে উঠে যাচ্ছে।
না, সে পারবে না। তার গায়ে অত জোর নেই।
ওভারব্রিজের ওপরে এসে মাঝামাঝি জায়গায় তাদের দাঁড় করিয়ে কমল বলল, এখানেই দাঁড়াও সবাই।
অমল দেখল ওভারব্রিজের ওপর বিস্তর লোক দাঁড়িয়ে আছে, কোন প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দেবে সেই অপেক্ষায়।
ডিসগাস্টিং! কোন প্ল্যাটফর্ম সেটা পর্যন্ত আগে জানানো যায় না! এটা কি একটা সিস্টেম? দেশটা যে কী ভাবে চলে কে জানে!
বিড়বিড় করে বললেও অমলের কথা কমলের কানে গেল। সে ভাইকে খুশি করার জন্য বলল, ঠিকই তো! এদেশের কি আর সাধে অত অবনতি! তবে তুই ভাবিস না, ঠিক তুলে দেব। লোকাল ট্রেনে গেলে একটু সময় লাগে বটে, কিন্তু কোনও টেনশন থাকে না। দিব্বি হেসে খেলে হাত-পা ছড়িয়ে যাওয়া যায়।
অমল ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, তোমাদের লোকাল ট্রেনকেও জানি। হকারের চেঁচানিতে মাথা ধরে যায়। তার ওপর চারদিকে নোংরা, ভিখিরির উৎপাত। তিনজনের সিটে ঠেলে চারজন বসবে, বিড়ি ফুকবে, বারবার টাইম জিজ্ঞেস করবে।
কমল সেঁতো হাসি হেসে বলে, হ্যাঁ, খুবই বিচ্ছিরি।
মাইকে কী একটা ঘোষণা হচ্ছিল, গমগমে শব্দের দরুন তার এক বর্ণ বুঝতে পারল না অমল। কিন্তু কমল সোল্লাসে বলে উঠল, চার নম্বরে দিয়েছে! চল, চল, ট্রেন ঢুকল বলে।
ফের টেনশন শুরু হয় অমলের। মালপত্র ওঠানো, নিজেরা ওঠা, জায়গা পাওয়া ইত্যাদি কত যে অনিশ্চয়তা তার ঠিক নেই। এ সময়ে খানিকটা হুইস্কি খেয়ে নিলে হত। কিন্তু সেটা বোধহয় শোভন হবে না।
দুদ্দার করে সিঁড়ি ভেঙে তোক নামছে। তার মানে এরা বেশির ভাগই ওই ট্রেনেই উঠবে। তার মানে ফের টেনশন। এত সব বলবান, তৎপর, উদ্যোগী, রগচটা, ঠেলেঠেলিতে ওস্তাদ মেয়ে-পুরুষের সঙ্গে তারা পেরে উঠবে কি?
লোকের ভিড়ে পিছিয়ে পড়ছিল অমল। সবার আগে স্যুটকেস নিয়ে কমল, তার পিছনে আর একটা স্যুটকেস সহ বুড, একটু পিছিয়ে সোহাগ আর মোনা, সবার শেষে অমল। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে নেমে দুরন্ত লোকজনের ভিতরে কাউকেই দেখতে পেল না অমল। আগের দিকে গেল না পিছনে তাও জানে না সে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে লোকজনের দিশাহীন ধাক্কায় টাল খেয়ে চোখ থেকে চশমাজোড়াই, খসে পড়ছিল তার। অতি কষ্টে সামলে নিল।
প্ল্যাটফর্মে নামতে না-নামতেই সে দূরে গাড়ির মুখ দেখতে পেল। ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে।
তার ডান কাঁধে একটা চামড়ার বড়সড় ব্যাগ, বাঁ হাতে অ্যাটাচি কেস। কোন দিকে যাবে তা বুঝতে– পেরে অমল কিছুক্ষণ হতভম্ব মাথায় দাঁড়িয়ে থাকল। ছেলেবেলায় একবার রথের মেলায় বাবার হাত ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল অমল। কী কান্না তার। অবিকল সেরকমই একটা অনুভূতি হচ্ছে এখন। সে কি হারিয়ে গেল।
সামনে চলন্ত দেয়ালের মতো ট্রেনটা ঢুকে পড়ছে। চাকার গম্ভীর শব্দে যেন বিপদের পূর্বাভাষ। লোকজন জান কবুল করে হামলে পড়ছে দরজায় দরজায়। নামা-ওঠার মর্মান্তিক ঠেলাঠেলি। এই বিপুল উদ্যম তার নেই।
মাত্র দু মিনিট সময়। ট্রেন ছেড়ে দেবে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ওদের খুঁজে বের করা অসম্ভব। তাহলে কি ট্রেনটা ছেড়ে দেবে সে? নাকি উঠবে পড়বে? সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কী কঠিন! আচমকা মনে পড়ল, দাদা টিকিট কেটেছিল বটে কিন্তু সেটা তার হাতে দেয়নি। সম্ভবত মোনাকে দিয়েছে। কিন্তু মোনাকে যদি খুঁজে না পায় সে এবং যদি ট্রেনে উঠে পড়ে তাহলে নিশ্চয়ই টিকিট চেকার তাকে ধরবে।
