ঘরের ভিতর থেকে ঝনঝনে গলাটা বলে উঠল, যেতে চাইছে দে না যেতে। তোর আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না।
ধীরেন একটু দাঁড়িয়ে থেকে ফের বসে পড়ল। গাঁয়ে তার বসবার জায়গা কমে আসছে। লক্ষণটা ভাল নয়, কথাগুলো গায়ে মাখলে তার চলবে না।
.
৩৫.
গাড়িটা ঠিক করে দিয়েছে কমল। সে সব সুলুকসন্ধান জানে। সুবিধেজনক গাড়ি নয়। বহু পুরনো অ্যাম্বাসাডর ল্যান্ডমাস্টার। সিটে বসলেই বোঝা যায়, ফোম রবার চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেছে, স্প্রিং ঠেলে উঠছে ওপরে। নানারকম কাঁচকোঁচ শব্দ তো আছেই। মফস্বলের ভাড়ার গাড়ি এরকমই হয়ে থাকে।
সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে কমল, ধারে বুডঢা। পিছনে একধারে সোহাগ, মাঝখানে মোনা, বাঁ ধারে অমল। সবাই চুপচাপ। শুধু কমলই যা কথা বলছে। সে বোকাসোকা সরল মানুষ, কথা একটু বেশিই বলে ফেলে।
বুঝলি বুডঢা, এ-গাড়িতে চোদ্দজন তোক উঠতে আমিই দেখেছি। কী মদন, চোদ্দজন করে নিস না?
মদন একটু খোটকামুখো অল্পবয়সি ছেলে। তেমন হাসে না, কথাও কয় না। দুবার জিজ্ঞেস করার পর বলল, না নিলে পাবলিক ছাড়বে কেন?
কমল বলল, শুনলি তো! এ-গাড়িতে চোদ্দজন, ভাবা যায়?
বুডঢা বলল, পুলিশে ধরে না?
হাটবার বা মেলা-টেলার দিন কোথায় পুলিশ, কোথায় কে? এখানে ওসব আইনকানুনের বালাই নেই। পুলিশ ধরতে এলে পাবলিকই ঠেঙিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবে। কী বলিস মদন?
মদন জবাব দেয় না।
বুডঢা বলল, ওঃ হাঁটুতে যা গরম লাগছে না!
কমল বলে, লাগবেই তো! ইঞ্জিন থেকে ভাপ আসছে না? পুরনো গাড়ি হলে যা হয়। আজকের গাড়ি নাকি? যখন নিশিবাবু কিনেছিল তখন থেকে জানি। হেসেখেলে পঁচিশ বছর হবে। দিব্যি সাদা রং ছিল গাড়িটার। তখন শুনতুম মরিস গাড়ির পার্টস দিয়ে তৈরি। তাই হবে বোধহয়। দিশি মাল হলে এতদিন চলত না। কী বলিস রে মদন! তুই তো গাড়ির একজন এক্সপার্ট!
মদন জবাব দেয় না।
কমল ওরকমই, ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। সকলকেই খাতির মহব্বৎ করে বেড়ায়। আর সেই জন্যই কেউ পাত্তা দেয় না তাকে। তবে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না কমল। ভাল মানুষদের যে বাজারদর কম সেটা বুঝবার মতো মস্তিষ্ক তার নেই।
খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা চোয়াড়ে চেহারার ছোকরা ড্রাইভারটাকে মোটেই ভাল লাগছিল না অমলের। দাদার ওপরেও বিরক্ত হচ্ছিল সে। কী কাজ গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর? ট্রিপ দিয়ে পয়সা নেবে–এর চেয়ে বেশি সম্পর্ক তো আর নয়।
কমল বেশ বড়াই করে বলল, তোর পচা গাড়িতে যাচ্ছে বলে এদের হেঁজি-পেঁজি লোক ভাবিস না। আমার ভাই মস্ত চাকরি করে। বুঝলি?
মদন বুঝল কিনা কে জানে, তবে উচ্চবাচ্য করল না। দাদাকে একটা ধমক দেওয়ার ইচ্ছে অতি কষ্টে সংবরণ করল অমল।
কমল বলে যাচ্ছিল, ওদের নিজেদেরই তো কত দামি গাড়ি আছে। এস্টিম না কী যেন রে বুডঢা?
এস্টিম।
এস্টিম, বুঝলি? এয়ারকন্ডিশন গাড়ি, গায়ে আমাদের রাস্তাঘাট খারাপ, শরৎকাল পেরিয়েও জলকাদা জমে থাকে, তাই গাড়ি আনে না। নইলে কি আর তোর গাড়িতে চড়ে?
এবার মদন বোধহয় একটু প্রভাবিত হল। বলল, এস্টিম ভাল গাড়ি। দুর্গাবাবুর আছে, চালিয়েছি।
পঞ্চায়েত এবার রাস্তাঘাট সারাবে শুনছি, তখন আনবে, দেখিস।
কমলের কথাটা মিথ্যে নয়। বড় রাস্তা ছেড়ে গাঁয়ের পথে পড়লেই খানাখন্দ, জল কাদা। মোনা তাই কিছুতেই গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসতে রাজি হয়নি। বলেছে, ও বাবা! ও রাস্তায় গাড়ির বারোটা বেজে যাবে।
গাড়ি নিয়ে এলে ঝামেলা অনেক কম হত। দুর্গাপুর রোড ধরলে কলকাতা থেকে বর্ধমান ঘণ্টা দুয়েকের পথ।
তারা কেউ কথা কইছে না। শুধু কমল একা কথা বলে যাচ্ছে। এবার মদনের কাছে সে ভাইয়ের বিলেতে থাকার কথা ফেঁদে বসল। অমলের ভারী লজ্জা করে, রাগও হয়। না শোনার জন্য সে চোখ বুজে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। আজকাল তার যখন-তখন ঘুম এসে যায়। একটু চেষ্টা করলেই এসে যায়। এটা সম্ভবত শুভ লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কবিহীন মানুষদেরই চটপট যখন-তখন ঘুম আসে। কলকাতায় রাস্তায় ঘাটে, পার্কে, রকে দিনের বেলায় সে এরকম সব নিষ্কর্মা, নির্বোধ বহু লোককে ঘুমাতে দেখেছে।
আজও অমলের ঘুম চলে এল।
চটকাটা ভাঙল বর্ধমানে গাড়ি ঢোকার পর। হাজারো রিকশা আর গাড়ির হর্ন, ধুলো, গরম, চেঁচামেচি। গ্রামের চেয়ে শহরে গরম বেশ কয়েক ডিগ্রি বেশি। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে এসে ঢুকলেই সেটা টের পাওয়া যায়। কলকাতায় গরমটা আরও একটু বাড়বে।
দু-তিনটে জ্যাম পেরিয়ে স্টেশন চত্বরে যখন পৌঁছল তারা তখন ডাউন শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস আসতে মিনিট কুড়ি বাকি। কমল ছুটল টিকিট কাটতে। বলে গেল, মালপত্র আমি এসে নামাচ্ছি। তোরা দাঁড়া।
অমল নেমে ড্রাইভারকে দিয়ে লাগেজ বুটটা খোলাল। বিশাল বড় দুটো ফাইবারের সুটকেস ছাড়াও রয়েছে গোটা তিনেক ব্যাগ। মাল বড় কম নয়।
মোনা বলল, উনি তো বলেই গেলেন উনি এসে মাল নামাবেন, তুমি টানাটানি করছ কেন?
অমলের একটু রাগ হল। সামান্যই। মোনার দিকে চেয়ে রুক্ষ গলায় বলে, উনি কিন্তু কুলি নন, আমার দাদা। কথাটা মনে রেখো।
আহা, খারাপ কিছু বললাম নাকি? উনি হয়তো একটা ব্যবস্থা করার কথা ভেবে রেখেছেন।
অমল খুব শক্তিশালী লোক নয়। বড় সুটকেস দুটো নামাতে তাকে রীতিমতো কসরত করতে হচ্ছিল।
