তুমি তো বেশ বাংলা বলতে পার। আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় বাংলা জানোই না।
মেয়েটা হাসল, বলতে পারি, পড়তে পারি, লিখতেও পারি একটু একটু।
বিদেশে যারা থাকে তাদের ওরকম হয়।
মেয়েটা একটু হাসল। হাসলে এত সুন্দর দেখায় ওকে।
দু চোখে তৃষিতের মতো মেয়েটাকে দেখে নিচ্ছিল পান্না। যেন এক পরি এসে আলগোছে বসেছে তাদের বাড়িতে। একটু পরেই উড়ে যাবে।
তোমরা কি বেড়াতে এসেছ?
মেয়েটা ভ্রূ কুঁচকে বলল, বেড়াতে! তাও বলতে পার, সর্ট অফ এ চেঞ্জ। কলকাতার পলিউশনে আমার অ্যালার্জি হয়। অ্যাজমার মতো। ডাক্তার বলেছে মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে থাকতে হবে।
কিছুদিন থাকবে তো?
না। আই হ্যাভ মাই স্টাডিজ। আজ বাবা আসবে। তারপর আমরা হয়তো ফিরে যাব।
এ-জায়গাটা তোমার ভাল লাগছে না?
ভাল, কিন্তু একটু হ্যাপহ্যাজার্ড। কোনও প্যাটার্ন নেই। আর নেই বলেই আমি ভুল করে তোমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।
ভাগ্যিস নেই। থাকলে তোমার সঙ্গে ভাবই হত না। তুমি কিছু খাবে?
না তো! আই অ্যাম নট হাংরি।
মুখ দেখে পান্নার মনে হল মেয়েটা মিথ্যে কথা বলছে। মুখটা শুকনো, খিদের ছাপ আছে।
তোমরা কি ভাত ডাল খাও?
কেন খাব না? তবে আই প্রেফার চাইনিজ।
উঃ, চাইনিজ আমারও ভীষণ ভাল লাগে। কলকাতায় গেলেই আমি চাইনিজ খাই। তবে অনেকে বলে কলকাতার চাইনিজ নাকি আসল চিনে খাবার নয়।
হ্যাঁ। অন্যরকম।
আমাদের বাড়িতে অনেক রকম আচার আছে। খাবে?
মেয়েটার চোখদুটো একটু উজ্জ্বল হল। মুখে একটু হাসি। বলল, ইউ আর এ রিয়েল চার্মার।
খাবে?
মেয়েটা এক গাল হেসে ঘাড় কাত করে বলল, খাব।
তা হলে এসো, কোন আচারটা খাবে পছন্দ করে দাও।
মেয়েটা লক্ষ্মীর মতো উঠে তার সঙ্গে এল। সহবত জানে। ঘরে ঢোকার সময় চটিজোড়া বাইরে ছেড়ে রাখল।
পান্না যখন তাক থেকে আচারের বয়ম নামাচ্ছে তখন সোহাগ ঘরের চারধারটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। পান্নারা গরিব নয়। তবে ঠাঁটবাটও তেমন কিছু নেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরদোর।
ওয়া! সোনি টু থাউজ্যান্ড মিউজিক সিস্টেম! বিগ সাউন্ড।
পান্না একটু হাসল, হ্যাঁ, বড্ড আওয়াজ ওটার।
ক্যাসেটের কেসটা দেখতে দেখতে সোহাগ বলল, রক মিউজিক, জ্যাজ এসব তুমি শোনো বুঝি?
না বাবা, ওসব আমার দাদা শোনে। আমাকেও জোর করে বসিয়ে শোনায়। আগে কিছু বুঝতাম না, শুনতে শুনতে এখন একটু-আধটু বুঝতে পারি।
তোমার দাদা কোথায়?
ও তো কলকাতায়। যাদবপুরে ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ারিং পড়ে। আচ্ছা, আচার খেলে তোমার আবার অ্যাজমা বাড়বে না তো!
না। আমার অ্যালার্জিটা পলিউশন থেকে হয়। ডাস্ট, স্মোক এইসব থেকে।
পাঁচরকম আচার প্লেটে সাজিয়ে দিয়ে পান্না ভাবল এই ফুলপরিকে আর কী দেওয়া যায়। তার আরও কিছু সাজিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে যে!
এই সোহাগ, তুমি শুধু আচার কী করে খাবে?
সোহাগ অবাক হয়ে বলল, আচারটাই তো খাবার।
পান্তাভাত আছে। খাবে?
সোহাগ হেসে ফেলল, তুমি ভারী সুইট মেয়ে তো!
খেয়েছ কখনও? লেবুপাতা দিয়ে মেখে খেতে বেশ লাগে। খাও না।
সোহাগ লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘাড় কাত করে বলল, দাও।
পান্না এক ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে পান্তাভাত একটা চিনেমাটির বাটিতে করে নিয়ে এল। সঙ্গে লেবুপাতা, নুন।
মাখতে পারবে? না মেখে দেব?
মৃদু হেসে সোহাগ বলে, তুমিই মেখে দাও।
ঘেন্না পেও না কিন্তু। আমার হাত পরিষ্কার। তবু সাবান দিয়ে ধুয়ে আসছি।
যখন সোহাগ খাচ্ছিল তখন খাওয়ার ধরন থেকে তার খিদেটা বুঝতে পারল পান্না। সামান্য পান্তাভাত কত যত্ন করে খাচ্ছে।
একটা ডিম ভেজে দেব তোমাকে? এক মিনিট লাগবে।
সোহাগ মিষ্টি করে হেসে বলে, এর সঙ্গে ডিম ম্যাচ করবে না। ইটস ভেরি টেস্টফুল। তোমার হাতের গুণ আছে।
আমার হাতের কোনও গুণ নেই। পান্তাভাত দিতে হল বলে লজ্জা করছে।
কেন, লজ্জা কীসের? আমরা বিদেশেও পান্তাভাত খেয়েছি। বাবা খুব ভালবাসে কি না। আচ্ছা, তোমার বাড়ির লোকেরা সব কোথায় বলো তো! কাউকে দেখছি না।
আমার জ্যাঠামশাই গৌরহরি চট্টোপাধ্যায় মারা গেছেন তো, আজই তাঁর শ্রাদ্ধ। সব সেই বাড়িতে।
ইউ মিন পারুলের বাড়ি!
অবাক হয়ে পান্না বলে, তুমি চেনো নাকি?
সোহাগ একটু হাসল, চিনি। শি লুকস লাইক এ গডেস।
হ্যাঁ। আমাদের বংশে ওরকম সুন্দরী আর কেউ নেই। তারপর একটু লজ্জা-লজ্জা মুখ করে রাঙা হয়ে পান্না বলে, জান তো একসময়ে তোমার বাবার সঙ্গে পারুলদির বিয়ে হওয়ারও কথা হয়েছিল। সেসব অবশ্য আমার জন্মেরও আগেকার ঘটনা। বিয়েটা হলে আজ তুমি আমার বোনঝি হতে, জানো? আমি হতুম তোমার মাসি।
খুব হাসল সোহাগ, মাসি? তোমার বয়স কত বলো তো!
সতেরো চলছে।
সতেরো প্লাস?
না, ষোলো প্লাস।
আমার সতেরো প্লাস। তোমার চেয়ে আমি বড়। ভেরি ইয়ং মাসি।
ভারী ভালই তো মেয়েটা। একটুও তো দেমাক দেখাচ্ছে না। সন্ধ্যাদিটা যে কী আজেবাজে বলে! তবে মেয়েটার এঁটোকাঁটার বিচার নেই। ভাত খেতে খেতে কতবার যে চুলে হাত দিয়ে পাট করল, কোলের ওপর বাটিটা রাখল। তা হোক, ওরা কি অত সব শিখেছে তাদের মতো?
মাঝে মাঝে একটু উদাস হয়ে যায় মেয়েটা। মুখে একটা বিষণ্ণতা ফুটে ওঠে। ভাত খেয়ে মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে কুলুঙ্গিতে গণেশের মূর্তিটার দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে তার দিকে চেয়ে বলল, দে ওয়্যার ইন লাভ, বাট দে ডিড নট ওয়েড। পারুলের মেয়ে হলে আমি অন্যরকম হতাম। তাই না? কী অদ্ভুত!
