এ মাঃ, তাহলে আমাকে ডাকবে কেন? কুমোরপাড়ার ছেলেরাই তো আছে। ওরা পয়সা পেলে পেড়ে দেয়।
তোকে পয়সা চাইতে বলেছি অন্য কারণে, চাইলে আর ডাকবে না।
কিন্তু আমার যে খুব ভাল লাগে।
তোর মা জানে যে তুই অত উঁচু উঁচু গাছে উঠিস?
তোর মা কথাটা খট করে কানে লাগল মরণের। মৃদুস্বরে বলল, একটু একটু জানে। আগে বকত, আজকাল কিছু বলে না।
বাবা জানে?
উরে বাবা।
বাবাকে ভয় খাস খুব?
খুব।
সুমন বলল, গাছে ওঠা খুব সেফ ব্যাপার নয়।
আমি খুব ভাল গাছ বাইতে পারি। বেলগাছের মগডালে উঠে যাই, কিছু হয় না।
লেখাপড়া করতে ইচ্ছে করে না?
পড়ি তো।
সুমন হাসল, কেমন পড়িস তা জানি।
মরণ লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল।
লেখাপড়া করাটা শক্ত কিছু নয়। তোর তো মাথা আছে।
মাস্টারমশাইরা বলে আমার মাথায় গোবর।
গোবর ভাবলে গোবরই হয়।
আমার খুব কলকাতার ইস্কুলে পড়তে ইচ্ছে করে।
কলকাতা! সেখানে গিয়ে কি থাকতে পারবি? কলকাতায় তো গাছ-টাছ নেই।
মরণ লজ্জার হাসি হাসে।
কলকাতায় যাওয়ার শখ হল কেন?
বাঃ, কলকাতায় বড়মা আছে, দিদি আছে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে যায়।
কথাটা বুঝতে না পেরে চেয়ে রইল সুমন। তারপর বলল, তারা কারা?
বাঃ, বড়মা আর দিদি আছে না সেখানে!
বুঝতে একটু সময় লাগল সুমনের। মুখটা মলিন হয়ে গেল তার। ধীর গলায় বলল, আমাদের বাড়ির কথা বলছিস!
হ্যাঁ তো।
খুব নিস্পৃহ গলায় সুমন শুধু বলল, ও।
একটু দমে গেল মরণ। কই, দাদা খুশি হল না তো! বলল না তো, বেশ তো, যাবি আমাদের বাড়ি!
মরণ ভয়ে ভয়ে বলল, কলকাতার স্কুলও তো কত ভাল।
সুমন একটু চুপ করে থেকে বলে, নিজে যদি পড়িস তাহলে স্কুল নিয়ে ভাবতে হবে না।
.
বাঙাল না থাকলে সকালবেলাটায় এবাড়িতে মোটা জলখাবারটা জোটে না। তবে চা-বিস্কুটটা দেয় বাসন্তী। ধীরেনের খই বেশি নয়, জোটে ভাল, না জুটলেও ক্ষতি নেই।
আজও সকালবেলাটায় এসে পড়েছে ধীরেন। অন্য সব বাড়িও আছে, কিন্তু সব বাড়িতে সবসময় জুত হয় না। এই তো সেদিন মহিমদার বাড়িতে গিয়ে ভারী বিপদ হল, সকালবেলায় সেখানে তুমুল কাণ্ড। ওপরতলা থেকে অমলের বিলেতফেরত বউ চেঁচিয়ে সন্ধ্যাকে গালমন্দ করছিল আর সন্ধ্যাও সপাটে চোপা করছিল। দূর থেকে কাণ্ড দেখে সটকে পড়েছিল ধীরেন। এসব তার বাড়িতেও নিত্যি হচ্ছে। আকথা কুকথা শুনে শুনে কানেও সয়ে গেছে সব। তবে অশান্তির বাড়িতে গেলে দু-দণ্ড বসার উপায় থাকে না।
সেদিক দিয়ে বাঙালবাড়ি ভাল। এ বাড়িতে ঝগড়াঝাটি হয় না। আসলে জনও তো নেই তেমন। তবে দু বউ একত্র হলে সে একটা কাণ্ডই হবে বোধহয়।
বারান্দায় বসে গলাখাঁকারি দিয়ে নিজেকে একটু জানান দিল ধীরেন।
কেউ কোনও সাড়া দিল না। দুটো কাজের মেয়ে উঠোন ঝটপাট দিচ্ছে। ভারী ব্যস্ত। তা ধীরেনেরও তাড়া নেই। কাজই বা কী তার? বসে বসে সে উঠোনের রোদ, পেয়ারাগাছের শালিখ, বাঁশের ডগায় কাক, বারান্দার নীচে কুণ্ডলী পাকানো নেড়ি কুকুর– এইসব দেখছিল।
রান্নাঘরের দিক থেকে একটা ঝনঝনে গলার আওয়াজ এল হঠাৎ, ওই যে এয়েছে বাঙালের ধর্মবাপ। এবার যা গিয়ে পিণ্ডি গিলিয়ে আয়।
গলাটা খুব চেনা ধীরেনের। বাসন্তীর মা। গণেশ দাস যখন বিয়ে করতে আতাপুর গিয়েছিল তখন বরযাত্রীদের দলে ধীরেনও ছিল। ঘটাপটার বিয়ে নয়, নমো নমো বিয়ে, মাছটা খাইয়েছিল খুব। সব মনে আছে ধীরেনের। আঠেরো টুকরো মাছ খেয়ে যা একখানা ঢেঁকুর তুলেছিল তার গন্ধ যেন আজও নাকে ভেসে আসে। গণেশদার বউ কিন্তু গাঁয়ের মেয়ে আন্দাজে ভারী লক্ষ্মীমন্ত সুন্দর ছিল দেখতে। হাত পায়ের গড়ন পেটন, মুখের উঁচ সবই ভারী ভাল। বলতে নেই, বউ দেখে ধীরেনের এমন কথাও মনে হয়েছিল, আহা, আমার যদি এমন একখানা বউ হত!
সেই তারই গলা। গণেশদা পটল তুলেছে সেই কবে, দুটো ছেলে আর এই মেয়ে বাসন্তীকে নিয়ে বিধবা হল মনোরমা। ক্রমে ক্রমে মানুষ যে কী থেকে কী হয়ে যায় তা দেখলে ভারী ভয় হয় ধীরেনের।
মনোরমা তাকে শুনিয়েই বলল, ভাগাড়ের শকুন সব এসে জোটেও বাপু। গুচ্ছের গিলবে, ছোঁক ছোঁক করবে, মাথায় হাত বুলিয়ে তোতাই পাতাই করে টাকাপয়সা আঁকবে, হাড়ে হাড়ে চিনি বাপু।
আহা, চুপ করো না মা, শুনবে যে।
শোনানোর জন্যই তো বলছি। সক্কালবেলাটায় কাকে গু খাওয়ার আগেই মড়া কেন মরতে আসে ভেবে দেখেছিস? কোন পিরিতের মানুষ রে! আবার জামাই-আদর করে চা-বিস্কুট সাজিয়ে দেওয়া! চা পাতা, চিনি, দুধ- এসবের দাম জানে না!
পায়ে পড়ি মা, চুপ করো, ওরকম বলতে নেই।
দুদিন চারদিন আসে না হয় কিছু বলতুম না। তা বলে রোজ সকালে এসে থানা গেড়ে বসে কোন আক্কেলে?
ধীরেন কাষ্ঠ বুঝল, শব্দভেদী বাণ তার উদ্দেশ্যেই ছোঁড়া হচ্ছে। ধীরেন উঠে পড়ল। মরণের বাবা শুনলে ভারী দুঃখ পাবে।
তা পায় পাক বাছা, তা বলে স্পষ্ট কথা বলতে আমি ছাড়ব না, তোর বাপ বেঁচে থাকতে কম জ্বালিয়েছে আমাকে? গিয়ে সঁত বের করে হাত কচলে ধানাইপানাই কথা। তারপর এটা দাও, সেটা দাও।
কথাটা মিথ্যে, গণেশদার অবস্থা মোটেই ভাল ছিল না। ধীরেনও বিশেষ যেত-টেত না। কিন্তু প্রতিবাদ করে হবেটাই বা কী? লোকে যা ভাবে তাই বলে। যা ঘটে তা তো বলে না সবসময়।
রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বাসন্তী। ধীরেনখুড়ো কোথায় যাচ্ছেন? বসুন না। ইয়ে, আজ বড্ড রোদ উঠে গেছে মা। আজ বরং যাই। চা হচ্ছে তো। বসুন।
