সেই কথাই তো বলছি লা! এটা যে ওর বাবার বাড়ি সেটা বুঝে নেওয়ার জন্যই তো এসেছে। বিষয়সম্পত্তির খোঁজখবর নিচ্ছে। যদি ভাল চাস তো দলিলপত্র একজন ভাল উকিলকে দেখিয়ে রাখ। দলিলে কোন ফাঁকফোকর আছে কে জানে বাবা। কোন দিন থাবা মেরে সব নিয়ে নেবে, তোর তখন হাতে হ্যারিকেন।
বাসন্তী ডাল ফোড়নে ছেড়ে বিরক্তির গলায় বলল, তোমার মাথায় সেই যে পোকা ঢুকেছে আজও তা গেল না।
তোর ভালর জন্যই বলি। বেড়াতে এসে কেউ সৎ মায়ের বাড়িতে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে? এর পিছনে মতলব নেই বলছিস! তুই আহাম্মক বলেই বিশ্বাস করিস ও কথা। খোঁজ নিলে দেখবি, বড়বউ যুক্তি করে পাঠিয়েছে। ছেলে এসে সব দেখে গেল, এর পর একদিন বড়বউ এসে তোকে উৎখাত করবে।
অত সোজা নয় মা। দেশে আইন আছে।
আইন আছে না হাতি। এই তো মহেশের বিধবা বউয়ের জমি তার ভাসুর গাপ করে নিল। পারল কিছু করতে?
কপালে যা আছে তাই তো হবে! আগে-ভাগে ভেবে কী করব বলো! তা বলে আমি তো ছেলেকে তাড়াতে পারি না। এ-বাড়িতে ওর জোর আছে।
সে তুই হাঁদারাম বলে পারিস না। তোর জায়গায় চালাক মেয়েছেলে হলে ও ছেলে পালাতে পথ পেত না। বলি বাছা, বাঙালকেই বা বিশ্বাস কী? সাঁট হয়তো সেও করেছে। তোকে তো আর বউ বলে ভাবে না। তার মতলবও খারাপ হতে পারে।
এবার দয়া করে যাও মা, বসে বসে আমার মাথাটা আর চিবিয়ে খেও না। তোমার এমন সব কথা যে বুক কাঁপে।
আমারও বুক কাঁপে মা, ছেলেপুলে নিয়ে না তুই পথে বসিস। আমি বলি কী, গোপনে গোপনে কিছু কিছু করে জমি বেচে দে। দিয়ে নগদ টাকা হাতে রাখা তোর ছোড়দা বলছিল, খালধারের জমিটা পরাণ দাস কিনতে চাইছে। পাঁচ হাজার করে বিঘে। চার বিঘে বেচলে নগদ বিশ হাজার টাকা আসবে হাতে। টাকাটা হাতে রাখ। অভাবে পড়লে কাজে দেবে।
আর সে বুঝি টের পাবে না? অনেক কুচুটেপনা করেছ, এবার যাও। প্রত্যেক দিন সকালবেলাটায় এসে তুমি আমার মেজাজটা খারাপ করে দিয়ে যাও। বয়স তো হয়েছে, এবার একটু ঠাকুরদেবতার এসে তুমি পার না ঘরে বসে?
জিজিবুড়ি সঙ্গে সঙ্গে ভারী ভালমানুষের মতো বলল, কী ডাল রাঁধলি আজ? সোনামুগ মনে হচ্ছে। ডালের মাথায় একটু কাঁচা ঘি ঢেলে দে তো একবাটি, নিয়ে যাই। দুপুরে ভাতের সঙ্গে খাবোখন।
এখন পারব না মা। পরের দিকে এসে নিয়ে যেও, আর বাটিও এনো। গেল হপ্তায় দু দুটো কাঁসার বাটি নিয়ে গেছ, ফেরত দাওনি।
কে বলল দিইনি?
আমার সব হিসেব আছে।
বুড়ো বয়সে ভুলভাল হতে পারে। দেখবখন খুঁজে।
আর খুঁজেছ। ও বাটি আমার গেছে, এখন থেকে কিছু নিতে হলে নিজের বাসন এনো, এই বলে দিলাম।
আর খুঁড়িস না বাপু, অভাবে পড়লে লোকে কত কী ভাবে। পেটের মেয়ে হয়ে শেষে আমাকে চোরও বলতে লেগেছিস!
মোটেই চোর বলিনি, বাটি দুটো ফেরত দিতে বলেছি, ভারী খাগড়াই বাটি, এ-তল্লাটে অমন জিনিস পাওয়া যাবে না।
আচ্ছা বাপু, খুঁজে দেখবখন।
.
মরণের মনে হচ্ছে ভগবান বলে কেউ নেই। তিন দিন হয়ে গেল, বিকেলের নরম রোদে যখন বাইরের মাঠঘাট তার বয়সি ছেলেদের আয়-আয় করে ডাকে, তখন পবিত্র স্যারের রাগী আর চোয়াড়ে মুখের দিকে বেচারার মতো চেয়ে তাকে বসে থাকতে হয়। তিন দিনে তেমন শাসন না হলেও গোটা দুই গাঁট্টা খেতে হয়েছে তাকে।
আজকাল দাদাকে তার বিশেষ ভাল লাগছে না। তার এই সর্বনাশটা দাদা না করলেও পারত।
কদমগাছটার তলায় গিয়ে ছুটির দুপুরে সে শিবঠাকুরকে কম ডাকাডাকি করেনি দুদিন। কিন্তু শিবঠাকুর বোধহয় নেশাভাঙ করে পড়ে আছেন, কান দেননি তার কথায়।
চিকু বলে, আরে শিবঠাকুর বর দিলেও ভুলে যায়। তার চেয়ে কালীকে বল। কালী হচ্ছে জাগ্রত ঠাকুর। দেখসনা জিবটা কেমন লকলক করে!
কালীও তার কথা শুনবে বলে আর ভরসা হয় না মরণের। সে বলে, ধুর, ভগবান-টগবান নেই।
ভগবানের দোষ কী জানিস? ছোটদের কথা একদম শুনতে চায় না।
তাই হবে বোধহয়। মুশকিল হল, ছোটদের কথা কেউই তেমন শুনতে চায় না।
চিকু বলে, ভগবানদের ঘুষ-টুসও দিতে হয়।
কীরকম ঘুষ?
যার যেমন ক্ষমতা। সোয়া পাঁচ আনা বা পাঁচ সিকে।
সোয়া পাঁচ আনা কত পয়সায় হয়?
তা বলতে পারব না, আনা ফানা তো এখন পাওয়া যায় না। মার কাছে শুনেছি তাই বললাম।
আমিও শুনেছি।
স্কুলে এখন পুজোর লম্বা ছুটি চলছে। তাই দিনমানে কিছু সময় পাওয়া যায়। তাও কমে এসেছে। পবিত্র স্যার মেলা হোম টাস্ক দিয়ে যান রোজ। সকালে আর দুপুরে সেগুলো করতে হয়। এত দিন এসবের বালাই ছিল না।
গত তিন দিন দাদার সঙ্গে প্রায় কথাই বলেনি মরণ। তিন দিন পর দাদা দুপুরে ডাকল।
আয়, রোজ দুপুরে আমার ঘুমোতে ভাল লাগে না। কলকাতায় তো কখনও দুপুরে ঘুমোই না।
দুপুরে তাহলে কী করো?
বাড়িতেই থাকি না। হয় কলেজ থাকে, নয়তো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিট করি, সিনেমা-থিয়েটার এগজিবিশন কত কী থাকে। বাড়িতে আর কতক্ষণ থাকি? এখানে তো সময়ই কাটতে চায় না।
আমার কিন্তু এখানেই বেশ ভাল লাগে। কত কী করার আছে।
সুমন হাসে, তোর করা তো জানি। এ বাড়ির নারকোল পেড়ে দিস, ও বাড়ির সুপুরিগাছে উঠিস।
লজ্জা পেয়ে হাসে মরণ, কী করব, সবাই আমাকে ডাকে যে।
এখন থেকে ওসব কাজ করার জন্য পয়সা নিবি।
মরণ অবাক হয়ে বলে, পয়সা?
কেন নয়? বলবি সুপুরি পাড়তে পাঁচ টাকা, নারকোল দশ।
