ধীরেন কাষ্ঠ হেসে বলে, দাঁড়াও বাঙাল, নরেন স্যারের যে অনেক টিউশনি। ব্যাচ ধরে পড়ায়। সে বাড়িতে আসবে না। খাঁইও খুব বেশি। বাড়িতে যদি চাও তাহলে সনাতন মাস্টারকে ধরতে পারো।
বিস্তর আলাপ-আলোচনার পর অবশেষে বদরাগী, কেঠো চেহারার রসকষহীন পবিত্রবাবুকে রাখা সাব্যস্ত হল। কাছেই বাড়ি, মানুষটাও রসিক বাঙালের চেনা। বাইরের ঘরখানা তুলতে গিয়ে একবার রসিকের কাছে হাজার খানেক টাকা হাওলাত করেছিলেন।
পবিত্রবাবু এলেন বেলা এগারোটা নাগাদ। এসেই বললেন, ওর তো ভিতই কাঁচা রয়ে গেছে, খাটতে হবে।
বাঙাল সঙ্গে সঙ্গে বলে, আরে খাটবেন খাটাইবেন তবে না কাম আউগ্যাইব। কত টাকা চান কন।
পবিত্রবাবু গরজ দেখে একটু বেশিই হাঁকলেন। রসিক সঙ্গে সঙ্গে রাজি, আইজই লাইগ্যা পড়েন।
আজ রোববার। রোববারে পড়াই না। কাল থেকে আসব। স্কুলের পর, বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটায়।
মরণ প্রমাদ গুনল। গেল তার ফুটবল, ব্যাটবল, দৌড় ঝাঁপ। ইস্কুলের পরই এসে পড়তে বসতে হবে। চোখে জল আসছিল তার।
রান্নাঘরে গিয়ে ছলোছলো চোখে মাকে বলল, বিকেলে পড়তে হয় বুঝি! আমি কিছুতেই বিকেলে পড়ব না।
ওরে চুপ! চুপ! তোর বাবার কানে গেলে কুরুক্ষেত্র হবে।
জিজিবুড়ি উনুনের ধারে শীতে জড়সড় হয়ে বসা। হাতে দুধে গোলা চায়ের গ্লাস। বিষ চোখে নাতির দিকে চেয়ে বলে, ম্যাস্টার এসে তো সগগে তুলবে। বাপের টাকা তো গাছে ফলেছে কি না, চোখে ভেলভেট দেখছে।
বাসন্তী চাপা গলায় বলে, আঃ, চুপ করো তো মা! ওর বাবা শুনতে পেলে রক্ষে রাখবে না।
বলি ম্যাস্টার কি বইখাতা জলে গুলে খাইয়ে দেবে? বাপেরই বা বিদ্যে কত?
ওর বাপের বিদ্যের খতেন নিচ্ছ কেন? বাবা কি ফ্যালনা?
ফ্যালন কি না জানি না বাপু। তবে বিদ্যেধর বলেও শুনিনি। বড়বাজারের গদিতে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামায়, এইটুকুই জানি।
তাতে কী হল? সেটা করতেও মুরোদ লাগে।
তা সেই বিদ্যেতে লাগিয়ে দিলেই তো পারে ছেলেকে। লেখাপড়া শিখে তো হচ্ছে লবডঙ্কা। বি এ, এম এ পাস ছোঁড়াগুলো ভেরেন্ডা ভাজছে দেখছিস না চারদিকে? আর পবিত্র মাস্টারেরই বা কী ছিরি। কালও তো দেখলুম দুখনের গোয়ালঘর থেকে গামলাভর্তি গোবর নিয়ে যাচ্ছে। ওই কি আবার একটা ম্যাস্টার হল বাপু? নিত্যি আমাশায় ভুগছে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘটি নিয়ে দৌড়োচ্ছে পায়খানায়। ও আবার কী পড়াবে শুনি! গাঁয়ে আর মাস্টার পেলি না!
বাসন্তী একটু দমে গিয়ে বলে, তা মাস্টারের মর্ম আমরা কী জানি বলো! ধীরেনখুড়ো বলল, তাই
আহা, ওই জুটেছে এক ধীরেন ছুঁচো। সারাদিন এ-বাড়ি ও-বাড়ি ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছে আর কার মাথায় কাঁঠাল ভাঙবে সেই মতলব কষছে। বাঙালের সঙ্গে অত গলাগলি কীসের লা ছুঁচোটার? ইনিয়ে বিনিয়ে অভাবের কথা গেয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কি না খবর রাখিস? অত আনাগোনা তো ভাল নয় বাপু!
আহা, ওরকম বোলো না তো৷ ধীরেন খুড়ো তো দুঃখী লোক।
ভেজা বেড়াল। বাঙাল যেমন হদ্দ বোকা, তেমনি তুই। ধীরেনের ছেলেগুলোর খবর রাখিস? একটা জুয়ো খেলে বেড়ায়, অন্যটার ছ্যাঁচড়ামি করে চলে। সাধ করে আবার ছেলের বিয়ে দিয়েছে ধীরেনের বউ মাগী। এখন শাউড়ি-বউতে চুলোচুলি হচ্ছে রোজ। অভাবী লোক হলেই কি আর ভাল লোক হয়? ঝেটিয়ে বিদেয় করে দিবি এর পর আবার এলে।
বাসন্তী কড়াইতে ফোড়ন ছাড়তে ছাড়তে বলে, ওসব আমি পারব না। ধীরেনখুড়োকে মরণের বাবা ভারী পছন্দ করে।
ওই তো বললুম, শালুক চিনেছে গোপালঠাকুর। যেদিন গাঁটগচ্চা যাবে সেদিন বুঝবি। টাকার দেমাকে বাঙালের কি আর মাথার ঠিক আছে! আর ওই খ্যাঁকশেয়ালটাও টাকার গন্ধে গন্ধে রোজ এসে ঢুঁ মারছে। সেদিন এক গোছা রুটি খেল, একদিন আবার ডিম ভাজা দিয়ে চিড়ের পোলাও। রোজই তো এসে সেঁটে যাচ্ছে দেখছি। অন্নসত্র তো আর খুলে বসিসনি! মুখের ওপর সে কথাটা একদিন শুনিয়ে দিবি।
মরণ এসব শুনে-টুনে খুব আশায় আশায় বলে, পবিত্র মাস্টারমশাই ভীষণ রাগী লোক, খুব মারে।
জিজিবুড়ি বলে, তা মারবে না কেন? পরের ছেলের পিঠ তো। হাতের সুখ করলেই হল!
ও মা, বাবাকে বলে দাও না, আজ থেকে আমি নিজে নিজেই পড়ব। খুব ভাল করে পড়ব।
বাসন্তী ছেলের দিকে চেয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, দাদা কী বলল কাল রাতে, শুনিসনি? লেখাপড়া কিচ্ছু হচ্ছে না। দুটো তিনটে বিষয়ে ডাব্বা খেয়ে উঠছ। সেটা কি ভাল দেখাচ্ছে? দাদা কত ভাল ছাত্র! তার ভাই হয়ে
জিজিবুড়ি চাপা গলায় বলে, আহা, ভাই বড় এক মায়ের পেটের কিনা। সৎ ভাই আবার ভাই! কলকাত্তাই চাল মারতে এয়েছে। তা ওইটুকুন ছোঁড়া এখন তোদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাবে নাকি? সে বলেছে বলেই মাথা কিনে নিয়েছে?
বাসন্তী বলে, আচ্ছা, খারাপ কথা কি বলেছে কিছু? ভাইয়ের লেখাপড়া নিয়ে ডাকখোঁজ করা কি খারাপ? তোমার কেন গায়ে জ্বালা ধরছে!
বলি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচা করে ছেলেকে বিদ্যেসাগর বানিয়ে তোর হবে কোন অষ্টরম্ভা? একটা দুটো বিষয়ে ফেল করে তা করুক না। ক্লাসে তো উঠছে ফি বছর! ওর বেশি বিদ্যের দরকারটাই বা কী? আর ও ছোঁড়াই বা এসে গেড়ে বসে আছে কেন কিছু আঁচ করতে পারলি?
তোমার যেমন কথা! গাঁয়ে বেড়াতে এসেছে তাতে দোষের কী হল বলল তো! এটাও তো ওর বাবারই বাড়ি।
