কেন, ঝালে কী দোষ করল? মুখে রুচি নেই যে!
ঝাল খেলে পেটেরটারও যে ঝাল লাগবে।
উঃ, কত কথাই যে জানো! তাহলে নতুন রকমের কিছু করে দাও। চেনা খাবার মুখে তুলতে ইচ্ছে করে না।
বামুন মেয়ে কি আর নতুন রান্না কিছু জানে? আচ্ছা দেখছি, আমার মাথা থেকেই যদি কিছু বেরোয়। তোর বাবা তো নানারকম খেতে ভালবাসত, তারই কোনও একটা ভেবেচিন্তে বের করি। বাঙাল রান্না খুব ভালবাসত। দেখি একটা বাঙাল দেশের পদই বেঁধে, উতরোয় কি না। এখন বরং দুটো শুকনো মুড়ি খা।
সে আর একা নয়। একা নয়। তার গর্ভে অনাগত সন্তান তাকে ডাকে, তার শরীর শুষে খায়, তার অন্ধকার গর্ভে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ভাবলেই রোমাঞ্চ হয়।
ঘরে ঢুকে পারুল দেখে, ঠিক যেভাবে অমলকে বসিয়ে রেখে গিয়েছিল সেই একইভাবে বসে আছে সে। নড়েনি, চোখের পলকও ফেলেনি বোধহয়। যেন পাথরের মূর্তি।
অমলদা।
উ!
কী এত ভাবছ?
অমল হাসল। বলল, কী যে ভাবি বলতে পারি না পারুল। ভাবনার কোনও মাথামুন্ডু নেই।
এত ভাবো কেন?
বললাম তো মাথাটা আমার বশে নেই।
মা বলছিল তোমার চেহারাটা ঝড়ো কাকের মতো হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, সেটা আমিও টের পাই।
অনেকদিন চুল কাটোনি, দাড়িও কামাওনি বোধহয় দিন দুয়েক।
হ্যাঁ। ওসব ভালই লাগে না।
তা হলে কী ভাল লাগে?
কিচ্ছু না। বাঁচতেও ভাল লাগে না।
ওসব বলতে নেই অমলদা। ইচ্ছে করলেই মরা যায়। সহজেই। কিন্তু বাঁচাটাই শক্ত।
হ্যাঁ, আমারও বড় কঠিন মনে হয় বেঁচে থাকাটাকে। বড্ড কঠিন।
.
৩৪.
মরণের লেখাপড়া নিয়ে বাসন্তী বা রসিক বাঙাল কারওই তেমন কোনও মাথাব্যথা ছিল না এতদিন। বাসন্তী লেখাপড়ার মর্ম তেমন বোঝে না। তবু তাড়না করতে হয় বলে তাড়না করে। আর রসিকের বক্তব্য একটু অন্যরকম। একদিন দুঃখ করে বলেছিল, আমার বড় পোলাখান হইল গুড বয়। হ্যায় লেখাপড়া শিখ্যা বিলাত আমেরিকায় যাইব। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য লইয়া তার কোনও মাথাব্যথা নাই। তাই ভাবত্যাছি দোকানখান মরণন্যারেই দিয়া যামু। বুইঝ্যা চলতে পারলে খাইয়াপইর্যা থাকতে পারব।
বাসন্তীরও অমত ছিল না। তার বাপের বাড়িতেও লেখাপড়ার চর্চা নেই, সে নিজেও বেশি দূর পড়েনি। কাজেই মরণকে নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না তার।
কিন্তু সুমন এসে হিসেবের একটু ওলটপালট ঘটিয়ে দিল। এক রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে সে তার বাবাকে বলল, মরণের জন্য একজন টিউটর রাখা দরকার।
বাঙাল ইলিশমাছের ঝোল দিয়ে সাপুটে ভাত মাখছিল। মুখ তুলে বলল, নাকি?
হ্যাঁ। আমি ওর বইখাতা সব নেড়েচেড়ে দেখলাম, ওর প্রগ্রেস বেশ খারাপ। টিউটর ছাড়া ও কিন্তু ভাল করতে পারবে না। অঙ্কে ইংরিজিতে বেশ কাঁচা।
রসিক সাহা সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল, আরে বান্দরটা তো লেখাপড়াই করে না। আমিও থাকি না এইখানে। বান্দরটা তো ধরারে সরা পাইছে। তারাপদ নামে এক ছ্যামড়া তো ইংরাজি পড়াইত। হ্যায় নাকি অখন সময় পায় না।
সেইজন্যই বলছি, ওকে ভাল দেখে একজন টিউটর রেখে দাও।
রসিক সাহা সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে উঠে বলে, ঠিকই তো কইছস! আমার মাথায় তো কথাটা আসে নাই! কাইলই মাস্টার ঠিক করতে হইবো। যত টাকা লাগে, বেস্ট মাস্টার চাই।
টেবিলের অন্য ধারে সিঁটিয়ে বসে ছিল মরণ। গেল তার সব সুখ আর আনন্দ। গেল তার টো টো করে ঘুরে বেড়ানো। পড়াশুনোর চেয়ে কষ্ট আর কীসে আছে। তার গলায় ভাতের গ্রাস আটকে রইল কিছুক্ষণ।
রসিক সাহা বাসন্তীর দিকে চেয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় হেঁকে বলল, কও তো এইখানকার বেস্ট মাস্টার কে আছে। কাইলই খবর দিয়া আনাইতে হইবো।
বাসন্তী ভয় খেয়ে বলে, ভাল মাস্টারের খবর কি আর আমি জানি! কাল সকালে খবর নেবোখন।
আহা, সব ব্যাপারেই তোমরা বড় ঢিলা। আইজ রাইতেই খবর পাঠাইয়া দাও। কাইল সক্কালেই য্যান মাস্টার আইয়া হাজির হয়।
বাসন্তী শুকনো মুখে বলে, রাত দশটা যে বেজে গেছে। এখন কাউকে খবর পাঠালেই কি আসবে? কাল রবিবার আছে, কাল সকালেই খবর নেবোখন।
কার কাছে খবর নিবা?
সে অনেক লোক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না।
রসিক দমিত না হয়ে মরণের দিকে কটমট করে চেয়ে বলে, এই বান্দর, তর ইস্কুলে ইংরাজি পড়ায় কে?
মরণ ভয়ে ভয়ে বলে, ক্ষেত্রমোহনবাবু।
ক্ষ্যাত্রমোহন! কাইল সকালেই গিয়া ডাইক্যা আনবি। আর অঙ্ক করায় কে?
কালীবাবু।
তারেও ধইরা আনবি।
আচ্ছা।
বাঙাল অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় বলতে লাগল, কথাটা যে ক্যান আমার আগে মনে হয় নাই! ঠিকই তো, মাস্টার না হইলে কি আইজকাইল চলে? বান্দরটা তো হেই লাইগ্যাই দুই তিন সাবজেক্টে ফেল মাইরা মাইরা ক্লাসে ওঠে।
পর দিন সকালেই খোঁজখবর হতে লাগল। উত্তেজিত রসিক সাহা যার কথা শোনে তাকেই রেখে ফেলে আর কি।
সুমন বাপকে শান্ত করে বলল, এখনই বেশি টিউটর রাখার দরকার নেই। মোটে তো ক্লাস সিক্স। একজন হলেই চলবে। উঁচু ক্লাসে উঠলে সাবজেক্টওয়াইজ টিউটর রাখলেই হবে।
ধীরেন কাষ্ঠ সকালে এসেই ফেরে পড়ে গেল।
খুড়া, এইখানে ভাল মাস্টার কে আছে কন তো! একটু কড়া ধাতের শক্ত মাস্টার। আমার ছোট পোলাটা তো জাহান্নামে যাইত্যাছে।
তটস্থ ধীরেন কাষ্ঠ বলে, তার আর ভাবনা কী! পূর্ণশশী স্কুলের নরেন মাস্টারকে রাখো। অঙ্ক ইংরিজিতে তুখোড়, কত গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করছে।
তারেই লইয়া আহেন।
