মাথা নাড়ে পারুল, কিছু খারাপ তো দেখছি না।
বাইরে থেকে বুঝবেন না। ভীষণ ফ্রাস্ট্রেটেড, ডিপ্রেসড। হয়তো মনে মনে ওর সব কিছুর জন্য আমাকেই দায়ি করে। কারও কারও কপাল থাকে ওরকম, ভিকটিম অফ সারকামস্ট্যান্সেস। আমি হলাম তাই। অনেক কথা বলে ফেললাম আপনাকে। কিছু মনে করবেন না।
পারুলের একটা অপরাধবোধ হচ্ছিল। এদের অশান্তির জন্য কোনও না কোনওভাবে সে দায়ি নয় তো!
মোনা বিষণ্ণ গলায় বলে, আমাদের কোনও প্রবলেম নেই, অথচ কত প্রবলেম যে রোজ অকারণে তৈরি হয় কে জানে।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে উঠল। বলল, সোহাগ সকালে আমার কাছে গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল জানেন?
না তো!
সেটা খুব মজার ব্যাপার। ওর খুব ইচ্ছে দিনকতক আমার কাছে থাকবে। শুনে আমার খুব মায়া হয়েছিল। কেন যে আমাকে ওর এত পছন্দ কে জানে! যাই হোক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কলকাতায় যেতে রাজি করিয়েছি।
থ্যাংক ইউ। ওকে কলকাতায় ফেরত নিয়ে যেতে আমরা হিমসিম খাচ্ছি। কিছুতেই যেতে চায় না। আজও ভাবছিলাম অনেক বকাঝকা করতে হবে বোধহয়।
না, বকবার দরকার নেই। ও যাবে।
কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব।
সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল মোনার চোখে।
ফিরে আসতে আসতে সে ভাবছিল, মোনা সব জানে। তাদের প্রেম, দেহগত সম্পর্ক–এত সব জেনেও কী করে তাকে অপছন্দ না করে পারে? খুব সূক্ষ্মভাবে হয়তো আরও একটা ব্যাপার মোনার মধ্যে কাজ করে। সে যে এক কামুক পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তার ভিতরে হয়তো মেয়ে হিসেবে মোনা একটা জয়ের আনন্দ খুঁজে পায়। কিংবা এসব নাও হতে পারে। হয়তো অন্য কিছু, যার মাথামুন্ডু পারুল জানে না। তবে ভারী অসহায় লাগে তার।
পারুলদের বাড়ি এখন ফাঁকা। তার বাবা জেদ করে ভাইয়েদের অংশ কিনে নিয়ে যে বিশাল বাড়িতে তার মাকে অধিষ্ঠিত রেখে গেছে তাতে থাকার মতো যথেষ্ট লোক কখনওই ছিল না। এখন তো আরও নেই। মা কীভাবে যে এ বাড়িতে একা দিনের পর দিন কাটায় তা ভাবতেই পারে না পারুল।
মাঝের দালানের মস্ত বৈঠকখানায় এনে অমলকে বসাল সে। এ ঘরে খুব দামি মোটা গদির সোফা সেট সাজিয়ে রাখা। আগেকার দিনের সব বাঘ আর হরিণের মুণ্ডু দেয়ালে মাউন্ট করা। কাশ্মীরি জালি কাজের কাঠের পার্টিশন। খুব আধুনিক রুচিসম্মত ছিমছাম ব্যাপার নয়, একটু যেন লোক-দেখানো জাদুঘর-জাদুঘর ভাব। তা হোক, এ-ঘরটায় তার বাবার গন্ধ আর স্পর্শ আছে।
এক ধরনের বিষণ্ণ উদাসীন চাউনি নিয়ে বসে আছে অমল। কথা নেই, কৌতূহল নেই, পারুলের দিকেও চাইছে না।
কিছু খাবে অমলদা?
অমল ঘোর অন্যমনস্ক চোখ তুলে বলে, উঁ?
কিছু খাবে? সকালে তো জলখাবার খাওনি!
অমল হঠাৎ একটু হেসে বলল, খাব! হ্যাঁ, আমার তো খুব খিদে পেয়েছে! টের পাইনি এতক্ষণ।
সে কী! খিদে টের পায় না নাকি মানুষ?
মানে, একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কী একটা যেন খুব দরকার। কী যেন ভাবছিলাম বলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আচ্ছা মানুষ যা হোক, বোসো একটু। সকালে আমাদের বাড়িতে লুচি-টুচি হয়। বলে আসি।
অমল ঘাড় কাত করে বলে হ্যাঁ। লুচি আর বেগুনভাজা।
তাই হবে।
পারুল বেরিয়ে এল ঘর থেকে। সেই কৈশোরকালে সে এ লোকটিকে ভালবেসেছিল। আজ যেন সেটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। কী করে যে ভালবেসেছিল সেটাই আজ বুঝতে কষ্ট হয়।
আসলে মানুষ কখনওই আর একটা মানুষের সবটুকু ভালবাসতে পারে না। অমলের মেধা, স্মার্টনেস ইত্যাদিই হয়তো সম্মোহনের কাজ করেছিল তার কাঁচা মনে। আজ তার চিহ্নমাত্র নেই। শুধু একটু
অনুকম্পা আছে, করুণা আছে, মায়াও থাকতে পারে।
তোর সঙ্গে ও কে এল রে, অমল নাকি?
রান্নাঘরের বারান্দায় মা।
হ্যাঁ। অমন ঝড়ো কাকের মতো চেহারা কেন ওর? কী হয়েছে? মাথার চুল তো কাকের বাসা।
অমলদা আজকাল ওরকমই হয়ে গেছে। কী যেন ভাবে বসে সবসময়ে।
বউয়ের সঙ্গে নাকি বনিবনা নেই! সেদিন সন্ধ্যা এসে অনেক কথা বলে গেল। বউটা কেমন, জানিস?
ভালই তো মা। বেশ ভাল। বুদ্ধি বিবেচনা আছে। খারাপ নয়।
ও মা! তা হলে বনে না কেন? আজকাল বউগুলোই এসে যত ঘোঁট পাকায়। বউ যদি ভাল হয় তাহলে আর ভাবনা কী?
বাঃ, বেশ ভাল কথা তো মা? মেয়েরা ঘোঁট পাকায় আর পুরুষরা বুঝি সব লক্ষ্মীছেলে!
তাই তো। পুরুষদের আবার দোষঘাট কী? পুরুষেরা সংসারের কূটকচালি বোঝেও না, ঘোঁটও পাকায় না। মেয়েরাই তো নষ্টের মূল।
বেশ মা, বেশ পক্ষপাতিত্ব তোমার!
বলাকা হাসেন। বলেন, আচ্ছা আর ঝগড়া করতে হবে না তোকে। কী হয়েছে ছেলেটার বলবি
সে তো জানি না। তবে কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে, খুব অন্যমনস্ক, ওর বউ বলে খুব নাকি ডিপ্রেশনে ভোগে।
বেচারা! কত মেডেল-টেডেল পেয়ে শেষে এই দুর্দশা!
বামুনদিকে দিয়ে লুচি বেগুনভাজা আর এক কাপ চা পাঠিয়ে দাও তো ও-ঘরে।
দিচ্ছি। কিন্তু তোর কি খিদে পায় না নাকি? রাতে যা খেয়েছিলি সব তো উগরে দিয়েছিস।
ও বাবা, খাওয়ার কথা বোলো না তো! শুনলেই গা বিড়োয়।
ওরে, নিজের কথা ভেবে নয় না-ই খেলি। পেটেরটার কথা ভাব। তুই শুঁটকি মেরে থাকলে ওটাও যে শুকিয়ে যাবে। মায়ের খাওয়াই তো ওদের খাওয়া।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পারুল বলল, তা হলে ঝাল-টাল দিয়ে কিছু একটা করে দাও।
বেশি ঝাল খাওয়াই কি ভাল এ সময়ে?
