সোহাগ! সোহাগের কী হয়েছে?
পারুল মাথা নেড়ে বলল, কিছু হয়নি। ও আসলে কলকাতা যেতে চাইছে না।
হ্যাঁ জানি।
কেন যেতে চায় না বলো তো?
ও কলকাতা পছন্দ করে না।
শুধু তাই?
ও আমাদেরও পছন্দ করে না। সোহাগ ইজ এ প্রবলেম চাইল্ড।
তোমরা ওকে বুঝতে পারো না, না?
না।
সেটা শুধু তোমাদের প্রবলেম বলে ভাবছ কেন? এটা তো আজকাল সব বাবা-মা আর তাদের সন্তানের প্রবলেম।
জেনারেশন গ্যাপের কথা বলছ?
তা ছাড়া আর কী?
সোহাগের বোধহয় আরও কিছু জটিলতা আছে যেটা আমি বুঝতে পারি না।
ওকে একটু ছেড়ে দাও, দড়ি আলগা করো, দেখবে প্রবলেম হবে না।
আমি তো সংসারের মালিক নই পারুল। আমার কথায় সব তো হয় না। সংসার মানেই নিরন্তর বোঝাপড়া, কনফ্রনটেশন, আপসরফা, বিতর্ক, মতান্তর, সম্পর্কের নানা সরল ও জটিল অঙ্ক কষে যাওয়া। সিদ্ধান্ত নেওয়া তো সোজা নয়!
অত শক্ত কথা বুঝতে পারি না।
সুখী মানুষের বুঝবার কথাও নয়।
আমি সুখী কি না কী করে বুঝলে?
তোমার সুখী হওয়ারই তো কথা পারুল!
তাই বা কেন?
তোমার মুখশ্রী দেখলেই বোঝা যায় তোমাকে দিনরাত খারাপ খারাপ চিন্তা করতে হয় না।
তুমি বুঝি খারাপ চিন্তা করো?
হ্যাঁ পারুল। মাথাটা আজকাল আমার বশে নেই। খারাপ চিন্তা, বিটকেল চিন্তা, অদ্ভুত চিন্তা, পাগলাটে চিন্তায় মাথা সবসময়ে গরম হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, পাগল হয়ে যাব।
যাঃ, ও সব ভাবতে নেই, এসো, আমাদের বাড়িতে এক কাপ চা খেয়ে যাও।
সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে অমল বলে, চলো।
পারুল আগে আগে হাঁটতে হাঁটতে বলল, তোমার কি পুরনো দিনের কথা মনে করে খারাপ লাগে অমলদা?
অমল একটু ভেবে বলে, পুরনো দিন! মানে সেইসব দিনের কথা যখন তুমি আর আমি?
হ্যাঁ।
খুব মনে পড়ে।
সেইজন্যই কি ওরকম হয়?
তা তো জানি না।
আমি তোমাকে বিয়ে করিনি বলে তোমার ইগোতে খুব লেগেছিল নিশ্চয়ই।
হ্যাঁ পারুল, লেগেছিল।
তুমি আমাকে ভুলতে তাড়াহুড়ো করে বিয়েও করেছিলে?
হ্যাঁ পারুল।
আমিই কি তোমার অশান্তির কারণ অমলদা?
না পারুল, আমার তা মনে হয় না।
আমার ওই একটা ভয় আছে। তোমাদের সম্পর্কের মধ্যে যদি আমি কাঁটা হয়ে থাকি তা হলে দুঃখের ব্যাপার হবে।
তোমাকে মোনা কিছু বলেনি তো পারুল?
পারুল মাথা নেড়ে বলল, না।
আশ্চর্যের বিষয় পারুল মোনর ভিতরে কোনও বিদ্বেষ বা ঘেন্না লক্ষ করেনি আজ অবধি। পরিচয় অবশ্য বেশি দিনের নয়। মেলামেশাও যৎসামান্য। তবু তার মধ্যেও কি কিছু বোঝা যেত না?
একটু আগেই সোহাগকে নিয়ে মোনার ঘরে পৌঁছে দিচ্ছিল পারুল।
দরজা খুলে তাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে মোনা বলল, আরে! আসুন, আসুন। এত ভোরে যে!
এসে অসুবিধে করলাম না তো!
না, না, কী যে বলেন! ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম।
কথার মধ্যে একটুও কৃত্রিমতা নেই, চোখে ছুরিছেরা ঝলসে উঠল না, গলায় কোনও কাঠিন্য প্রকাশ পেল না। অথচ মহিলা জানেন, পারুলের সঙ্গে তার স্বামীর অ্যাফেয়ার ছিল।
তাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজের মেয়ের দিকে একবার চেয়ে মোনা বলল, ও আপনাকে ধরে এনেছে বুঝি?
পারুল মৃদু হেসে বলল, কে কাকে ধরে এনেছে তা বলা যাবে না। দুজনেই দুজনকে ধরে এনেছি।
এসে ভাল করেছেন। আজ আমরা কলকাতা ফিরে যাচ্ছি।
শুনেছি।
কবে যে আপনার সঙ্গে ফের দেখা হবে কে জানে। আপনি কি এখন এখানে থাকবেন?
পাগল? জামশেদপুরে আমার অনেক কাজ। খুব বেশি হলে আর হয়তো দিন পনেরো। মা বড় একা, হয়ে পড়েছেন, তাই থাকা। ছেলেমেয়েদের স্কুল খুলে যাবে, আমার স্বামীও একা রয়েছেন।
সকলেরই এক সমস্যা। সোহাগ তো কিছুতেই কলকাতায় যেতে রাজি নয়। এ জায়গাটা ওর ভাল লাগে। শহরের পলিউশনে ওর প্রবলেমও হয়। কিন্তু তা বলে তো আর অনন্তকাল এখানে পড়ে থাকতে পারে না।
পারুল মৃদু একটু হেসে বলল, সোহাগ একটু অন্য ধরনের।
মোনা মেয়ের দিকে ফের তাকাল একবার। বলল, শুধু অন্যরকম বললে কিছুই বলা হয় না। একদম পাগল একটা। সব সময়ে ওকে নিয়ে চিন্তা হয় আমার।
সকলের কি একরকম হওয়া ভাল? আমরা সবাই এক এক রকমের পাগলই তো!
একটু-আধটু হলে চিন্তা ছিল না। কিন্তু ও বড্ড ডাকাবুকো। ভয়ডরও কম। আর আনপ্রেডিক্টেবল।
সেটা কয়েকদিনে টের পেয়েছি।
একটু চা করে আনি?
চায়ের কথায় নাক কোঁচকাল পারুল। চায়ের গন্ধ তার আজকাল সহ্য হয় না। মাথা নেড়ে বলে, চা থাক।
আপনার কি শরীরটা খারাপ? খুব রুখু দেখাচ্ছে আপনাকে। অ্যান্ড স্টিল ইউ আর বিউটিফুল।
আপনারা আমাকে যে কী চোখে দেখেন কে জানে। আমি তত সুন্দরী নই কিন্তু।
মোনা তার দিকে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে একটু চেয়ে থেকে বলল, আমার ছেলে মেয়ে সবাই আপনার ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমিও, কী জানি কেন, আমাদের ওপর হয়তো আপনার একটা হিপনোটিক স্পেল কাজ করে।
সেটাই তো আমার পক্ষে লজ্জার ব্যাপার।
তা কেন? এতে লজ্জা পাওয়ার তো কিছু নেই। সোহাগ, তুমি একটু বাইরে যাবে?
যাচ্ছি। বলে সোহাগ নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।
মোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি সব জানি, জেনেও আপনাকে কখনও হিংসে করতে পারিনি, আপনার ওপর রাগও হয়নি কখনও।
পারুল লজ্জায় একটু লাল হল। তারপর বলল, সেটা এত অস্বাভাবিক যে বিশ্বাস হতে চায় না। আপনি বড্ড ভাল।
আমাকে কেউ ভাল বলে না।
কেন বলে না?
তা তো জানি না। অন্যের চোখে ভাল হতে গেলে নিজেকে যতটা বদলাতে হয় ততটা কি বদলাতে পারি, বলুন? আর নিজেকে বদলাবই বা কেন? সোহাগের বাবাকে তো দেখছেন! কী মনে হয় আপনার?
