না প্রভু, কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি। আপনি দুহাতে বেতসীর দুই কাঁধ চেপে ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিলেন, তোমাকে আমার দরকার… তোমাকে আমার দরকার… তোমাকে আমার দরকার…
কুণ্ঠিত বৈজ্ঞানিক বললেন, অ্যাপ্রোচটা একটু রাফ ছিল বটে, কিন্তু সোজা কথাটা তো ওটাই।
হ্যাঁ প্রভু। তবু মোদ্দা কথাটা এসব ক্ষেত্রে একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে হয়। বেতসী ঝাঁকুনি খেয়ে ভয়ে আর ব্যথায় কেঁদে ফেলেছিল এবং দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি কিছুতেই বুঝতে পারলেন না যে, আপনার প্রস্তাবটায় খারাপ কী ছিল।
বাস্তবিক তাই।
এরপর ওই মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য আপনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সম্ভব অসম্ভব নানা পন্থা নিতে শুরু করেন। আপনি মেয়েটির বাড়িতে হানা দিয়ে তার বাবার কাছে বেতসীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। আপনার দুর্বিনীত কথাবার্তায় বেতসীর বাবা চটে যান এবং প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর আপনি লোক লাগিয়ে বেতসীকে চুরি করার মতলব আঁটেন। অথচ সামান্য কূটকৌশল ও একটু ধৈর্য অবলম্বন করলে ব্যাপারটা কত সহজেই ঘটে যেত।
ওসব নিষ্কর্মারা পারে। আমার অত ধৈর্য নেই।
তবু আপনি কিন্তু তখন বেতসী-পাগল। যত প্রত্যাখ্যান আসে তত আপনি ক্ষিপ্ত থেকে ক্ষিপ্ততর হয়ে ওঠেন। বেতসীকে সর্বত্র আপনি অনুসরণ করতেন। এক বিয়েবাড়িতে ভিড়ের মধ্যে আপনি তার হাতও চেপে ধরেছিলেন।
আহা, আবার অত ডিটেলসে যাচ্ছ কেন?
আচ্ছা প্রভু, এটুকুই থাক।
বৈজ্ঞানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মেয়েরা নির্বোধ। তাই ওই মেয়েটি আমার হৃদয়ের বার্তা বুঝতেই পারল না।
যথার্থই প্রভু। হৃদয়ের বার্তা বোঝার সাধ্য কজনেরই বা থাকে, তাই মেয়েটি আপনার কাছ থেকে পালাতে থাকে। এবং বোধহয় রাহুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যই মাত্র পনেরো বছর বয়সেই মেয়েটি পাত্রস্থ হতে রাজি হয়ে যায়। আপনি উন্মাদের মতো সেই বিয়ের আসর ভাঙচুর করতে গিয়ে প্রহৃত হন। আপনার কিছুদিন হাজতবাসও হয়েছিল।
ইয়ে, ওসব পুরনো কথা থাক। বিয়ে-টিয়ে আমি আর করছি না বাপু।
তাই কি হয় প্রভু? আপনি বিয়ে না করেন তা হলে সৃষ্টি স্থিতি লোপ পাবে। তাই আমার ওপর হুকুম হয়েছে আপনি রাজি না হলে আপনাকে কালের সরণি বেয়ে সেই আঠারো বছর বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
বলো কী?
আপনি রাজি হবেন?
বৈজ্ঞানিক হঠাৎ মৃদু একটু হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, না। একবার ঘটে-যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
তা হলে কী বার্তা নিয়ে ফিরে যাব প্রভু?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈজ্ঞানিক বললেন, কী একটা কথা আছে যেন, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা, না?
হ্যাঁ প্রভু।
তাই হবে বাপু। ঘিনপিত ঝেড়ে ফেলে, তোমাদের মুখ চেয়ে বরং বরণমালায় ফাঁসিই হোক আমার।
প্রণাম, প্রভু, প্রণাম।
.
রাতে ঘুম হয়নি। ভোররাত অবধি ডায়েরিতে কাহিনীটা লিখে অমল কিছুক্ষণ বসে বসে ভাবল। কী লিখছে সে এসব? কেন লিখছে?
ভোরের আলো ভাল করে ফোটার আগেই সে র্যাপার মুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। আজ কলকাতায় ফিরে যাবে তারা। একটু ঘুরেফিরে গ্রামটা দেখে নিতে হয়। কলকাতায় এমন অঢেল সময় আর পরিসর নেই। কলকাতা তার ভালও লাগে না আর। প্রচুর টাকা মাইনের চাকরিও তাকে আকর্ষণ করে না। কেন যে এসব হচ্ছে!
অনেকটা হাঁটল অমল। হেঁটে হেঁটে বাসরাস্তা অবধি চলে গেল। দোকানে বসে ভঁড়ে চা খেল দুবার। লোকজনের যাতায়াত দেখল। অর্থহীন সময় বয়ে যাচ্ছে। কর্মহীন সময়। আসলে সময় বলে তো কিছু নেই। আছে গতি ও অবস্থান। আছে অবস্থানগত পরিবর্তন। সব ঘটে আছে, পর্যায়ক্রমে সেগুলি সামনে আসে বা পিছনে সরে যায়।
সে যখন পারুলকে ভালবাসত, কিংবা পারুল তাকে, সেটা কি অতীত? নাকি সেটাও বর্তমান, কিন্তু পরিদৃশ্যমান নয়। ঘটনাটা এখনও ঘটছে, শুধু তা দৃশ্যমান নয়। পৃথিবীর জন্ম ও মৃত্যু, মহাজগতের জন্ম ও মৃত্যু সবই একই সঙ্গে ঘটে আছে। শুধু তা খণ্ড খণ্ড করে দেখা যাচ্ছে–এই যা।
গভীর অন্যমনস্কতায় ফিরে আসছিল অমল। চেনা রাস্তায় পা তাকে নিয়ে যাচ্ছে মাত্র, সে কিছু দেখছে না। চলছে।
অমলদা।
চোখ তুলে অমল হঠাৎ দেখল কুড়ি বছর আগে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনে পারুল।
.
৩৩.
পারুল! বলে থমকে গেল অমল। শুধু পানয়, থমকাল তার হৃৎপিণ্ড, তার সত্তা, তার স্মৃতি, তার সময়।
না, পৃথিবীর বহুবার আবর্তন, বহু সূর্য প্রদক্ষিণ, ঘড়ির কাঁটায় ঘুরে যাওয়া বা ক্যালেন্ডার পালটে গেলেও সেই বিশ বছর আগেকার জায়গাতেই থেমে আছে তারা। সময় বলে তো কিছু নেই, তাই বয়স বলেও কিছু হয় না।
পারুল একটু হেসে বলল, এত সকালে কোথায় বেরিয়েছ?
অমলের বিভ্রম কাটেনি এখনও। সে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ বছর আগেকার সেইসব দিনকে প্রত্যক্ষ করছে। সামনে কিশোরী পারুল।
খুব থতমত খাওয়া মুখে অমল চারদিকে চেয়ে একবার দেখে নিল। তারপর বলল, এই একটু বেরিয়েছিলাম।
মর্নিং ওয়াক?
তাই হবে বোধহয়।
আমি তো তোমাদের বাড়ি থেকেই আসছি।
অবাক অমল বলে, আমাদের বাড়ি থেকে?
হ্যাঁ।
ও।
পারুল ফের একটু হেসে বলে, জিজ্ঞেস করলে না কেন?
অমল এখনও প্রকৃতিস্থ নয়। কিছু বলতে পারছে না যেন। বলল, কেন?
তোমার পাগল মেয়েটাকে পৌঁছে দিয়ে এলাম।
