প্রভু, রাগ করবেন না। আত্মগ্লানির কোনও কারণ ঘটেনি।
ঘটেনি! বলো কী! সেই আত্মগ্লানি যে আজও আমাকে তাড়া করে।
জানি প্রভু। তাই আজও আপনার কানন কুসুমহীন।
কাব্য কোরো না, ওসব আমার ভাল লাগে না। মেয়েদের সঙ্গে ফুলের তুলনা করা ফুলের পক্ষে অপমান।
বৃদ্ধ পিতা, বেতসী রায় কিন্তু নির্দোষ।
বৈজ্ঞানিক হুংকার দিলেন, নির্দোষ!
চোদ্দো বছরের সেই কিশোরী আপনার বাড়ির সামনে দিয়েই রোজ স্কুলে যেত। আপনি তখন আপনার সামনের বারান্দায় গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বসে থাকতেন। আপনি ভুলে যাবেন না যে, আপনিও তখন ছিলেন অতি সুদর্শন যুবা। বেতসী তাই প্রতিদিন আপনাকে লক্ষ করত। আপনি করতেন না। চিন্তায় কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল আপনার চোখ, মগ্নতায় আবিষ্ট ছিল আপনার মস্তিষ্ক, সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য আপনাকে বাস্তব থেকে সুদূর করে রেখেছিল। সব ঠিক, কিন্তু বেতসীর অসহনীয় রূপ প্রতিদিন আপনার হৃদয়ের বন্ধ দরজায় মৃদু ও ভীরু করাঘাত করে যেত।
ফের কাব্য?
মহাশয়, কাব্যোচিত ঘটনার বিবরণে একটু কাব্যের স্পর্শ না থাকলে গ্রহণযোগ্য হয় না। বাড়াবাড়ি মানেই বুঝি কাব্য?
যথার্থই বলেছেন। কাব্য মানেই বাহুল্য, কাব্য মানেই হল অতিশয়োক্তি, কাব্য মানেই উপচে পড়া হৃদয়াবেগ।
তাই হবে। সেই জন্যই কাব্য আমি পছন্দ করি না।
প্রভু, কঠিন গবেষণা, জটিল অঙ্ক এবং প্রবল বিদ্যা আপনার অন্তরকে খানিকটা শুষ্ক করে তুলেছে বটে, কিন্তু একদা আপনা হৃদয়ের অর্গল ভগ্ন হয়েছিল।
বৈজ্ঞানিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, হ্যাঁ।
দিনের পর দিন বেতসীর দুই অপরূপ চক্ষু আপনাকে লেহন করে যেত, তার রূপের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত আপনার দুর্গের পরিখায়, তার হৃদয় নীরবে নিবেদিত হত আপনার চরণে। হতে হতে একদিন আপনার বর্ম ভেদ হল।
বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে বলেন, ওরে বাপু, অত কাব্য করে বলার কিছু নেই। সোজা কথায় বলে ফেল, পচা শামুকে আমার পা কেটেছিল।
না পিতা, ওরকমভাবে বলবেন না। বেতসী রায়ের রূপ তো দোষের ছিল না, সেও তো ঈশ্বরের দান।
ঈশ্বর! ওহে, তোমরা ঈশ্বর-টিশ্বর মানো নাকি? আমি কিন্তু মানি না।
যারা নিজেদের ঈশ্বরের সমতুল ভাবে তারা ঈশ্বরকে মানতে চায় না। যেখানে অহং প্রবল সেখানে ঈশ্বর বাস করেন না।
ভাল জ্বালা হল রে বাপু! তোমরা ঈশ্বর মানো কেন?
তার কারণ আমরা জ্ঞানমার্গে আপনাদের চেয়ে অনেকটা অগ্রসর জাতি। বিজ্ঞানও এখন অগ্রসর। যতই মানুষ জ্ঞানার্জন করবে ততই অহং বিলীন হবে, এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব ততই অনুভূত হবে।
তোমরাও তা হলে ওই হাওয়ার নাড়ু খেয়ে বসে আছ? তাই তো তোমার গলায় পৈতে দেখছি। আমি তো পৈতে-টৈতে কবে ফেলে দিয়েছি। যত সব কুসংস্কার।
আপনি ফেলে দিয়েছেন বলেই আপনার উত্তরপুরুষদের তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে। এমন কাজ করা আমাদের উচিত নয় যার জন্য উত্তরপুরুষদের দায়ভাগ বহন করতে হয়।
বামুনদের ইতিহাস জানো? সমাজের শোষক, চতুর প্রতারক, অত্যাচারী, হৃদয়হীন, খল, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং ঘৃণ্য একটা শ্রেণী।
প্রকৃত ব্রাহ্মণ তো তা নয়।
আমি ওসব জানতে চাই না। আমি নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে কখনও বোধ করিনি।
বিতর্ক থাক প্রভু। আমরা বেতসীর কথায় ফিরে আসি। অবশেষে একদিন আপনি বেতসীকে অকস্মাৎ লক্ষ করলেন। আপনার কাননে হঠাৎ মর্মরধ্বনি উঠল, পরভৃৎ শিষ দিতে লাগল। আপনি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।
হ্যাঁ মনে হয়েছিল আমার মাথায় বাজ পড়েছে।
পিতা, উপমাটি অযথার্থ নয়। বজ্রাঘাতের সঙ্গে এই মুগ্ধতার কিছু সাদৃশ্য আছে।
বড্ড ধানাই-পানাই করছ হে। সোজা কথাটা বললেই তো হয়।
যে আজ্ঞে। আপনার সমস্যা হল প্রেম কাকে বলে আপনি তা জানতেন না। আপনি যে প্রেমে পড়েছেন তাও আপনি বুঝতে পারছিলেন না। শুধু অস্থির, উচাটন, উদ্বেগ আপনাকে গ্রাস করেছিল। সঙ্গে ভয়ও। কারণ নিজের ভিতরকার পরিবর্তনগুলিকে আপনি অনুধাবন করতে পারছিলেন না।
বাঃ, বেশ বলছ তো। ওরকমই হয়েছিল বটে। আমার চিন্তারাজ্যে যেন বাজপাখির ছায়া।
প্রভু, ওরকম কঠিন বাক্য বলবেন না। বিষয়টি পেলব।
ছাই পেলব।
আপনাদের চক্ষু রোজ মিলিত হতে লাগল। আপনি আরও উন্মন হলেন, আরও চঞ্চল, আরও উদ্বিগ্ন, আরও ভীত। আপনার হৃৎপিণ্ড দামামা বাজাত।
বেঁধে! বেঁধে! অতটা বলার দরকার নেই।
যে আজ্ঞে! রেখেঢেকেই বলছি তা হলে। আদত কথাটা হল আপনারা দুজনেই দুজনকে ভালবেসে ফেলেছিলেন।
মূর্খ! ওকে ভালবাসা বলে না। রূপতৃষ্ণা কি ভালবাসা? কামনা কি ভালবাসা?
তা নয় পিতা, তবে ভালবাসার মধ্যে ওসবও একটু-আধটু থাকে।
ওসবই থাকে। নারীপ্রেম আসলে কাম আর রূপতৃষ্ণা।
আপনি বড় কঠোর সমালোচক।
আমি মধুর মিথ্যেবাদী নই তোমার মতো।
আপনাদের ওই প্রেম আপনাকে এতটাই চঞ্চল করেছিল যে, আপনি একদিন সোজা রাস্তায় নেমে মেয়েটির পথ আটকে দাঁড়ান।
হ্যাঁ। ভ্যানতারা আমি পছন্দ করি না।
কিন্তু প্রভু, প্রেমেরও একটা রচনা আছে। প্রথম দৃষ্টি বিনিময়, তারপর কটাক্ষ, তারপর মৃদু হাস্য, তারপর সন্তর্পণ বাক্যালাপ, তারপর প্রস্তাবনা।
তাই বুঝি! প্রেম করতে সময়ের এত অপব্যবহার এবং শক্তিক্ষয়।
নইলে যে ব্যাপারটা মোহমুদগরের মতো হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক যেমনটি আপনার ক্ষেত্রে হয়েছিল।
বৈজ্ঞানিক লজ্জিত হয়ে বললেন, কাজটা যে ঠিক হয়নি তা অবশ্য স্বীকার করতে হবে।
