কাঁচুমাচু হয়ে বৃদ্ধ লোকটি বলল, আপনি বিবাহ না করলে আমার জন্ম সম্ভব হত না।
বৈজ্ঞানিক খিঁচিয়ে উঠে বললেন, সম্ভব না হলে হবে না। তাতে আমার কী যায় আসে বাপু? মেয়েমানুষ হল ঝগড়ুটে, হিংসুটে, ন্যাকা, মিথ্যেবাদী, লোভী, চিন্তাশক্তিশূন্য, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং সর্বনাশা। মেয়েমানুষের ছায়া মাড়ানোও পাপ। সুতরাং আমার বিয়ে করার কোনও সম্ভাবনা নেই এবং বংশধরও কেউ হবে না।
বৃদ্ধ মানুষটি বিবর্ণ মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর স্খলিত কণ্ঠে বলল, পিতা, ঠিক এই কারণেই আমরা সময়-ভ্রমণ পারতপক্ষে করি না। যা কিছু ঘটে আছে, ঘটনার যেসব নকশা তৈরি হয়ে আছে তা এই সর্বনাশা সময়-ভ্রমণের ফলে যদি সামান্যতম বিচ্যুত হয় তা হলেই প্রলয় কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। সমস্ত সৃষ্টির ভারসাম্যই কেন্দ্রচ্যুত হয়ে পড়বে। সেই পরিণতির কথা ভাবলেও শরীর শিহরিত হয়। আপনি বিবাহ না করলে
ক্রুদ্ধ বৈজ্ঞানিক তীব্র স্বরে বললেন, তাই বলে কি অস্পৃশ্য মেয়েমানুষকে ঘরে তুলে আনব? নিমকহারাম, বেইমান, পাপিষ্ঠা মেয়েমানুষের কাছে আত্মবিক্রয় করব? সুন্দর মুখের ছলনায় তারা পৃথিবীকে কতবার ছারখার করেছে তুমি জানো? ইতিহাস, পুরাণ, মহাকাব্যাদি পড়নি? মেয়েমানুষের ইতিহাস মানুষের জীবনে কল্পনাস্বরূপ। তারা স্বভাবতই বিশ্বাসঘাতক এবং অকৃতজ্ঞ। ছলাকলা এবং চাতুর্যে পুরুষকে বশীভূত করে তার জীবনীশক্তি শোষণ করে নেয়। মেয়েমানুষ হল পরগাছা এবং মস্ত জঞ্জাল। মেয়েমানুষ না থাকলে পৃথিবী অনেক বেশি বাসযোগ্য হত।
বৃদ্ধ মানুষটি ভয়ে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে করজোড়ে বলল, হে শ্রদ্ধাস্পদ মহাবোধ, হে জ্যেষ্ঠ পিতা, আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন। আপনি ক্রুদ্ধ হলে সৃষ্টির অঙ্ক মিলবে না।
তাতে আমার বয়েই গেল। মেয়েমানুষের কথা শুনলেই আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়।
লোকটি বিনীত কণ্ঠে বলল, জানি প্রভু।
বৈজ্ঞানিক হুংকার দিয়ে বললেন, কী জানো?
আপনার বয়স তখন আঠেরো বছর দুই মাস। সদ্য শ্মশ্রুগুফের উদগম ঘটেছে। আপনি ক্ষীণকায়, গৌরবর্ণ ও অতীব সুপুরুষ ছিলেন। তখনও আপনি ছিলেন চিন্তাশীল, অন্যমনস্ক, বাস্তববোধ বর্জিত, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান। আপনার চিন্তার বিষয় ছিল মহাশূন্য, সময় সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি। বয়সোচিত চিত্তচাঞ্চল্য আপনার ছিল না, নারীর রূপ সম্পর্কে আপনি তখনও সচেতন ছিলেন না। আপনার বিচরণ ছিল মহান এক চিন্তারাজ্যে।
তুমি এই কথা জানলে কী করে?
আমরা সময়-ভ্রমণ করি না বটে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা যন্ত্রদূত পাঠাই। এই যন্ত্রদূতগুলি কখনও কবুতর, কখনও বেড়াল, কখনও বা নেড়ি কুকুরের রূপ ধরে আসে। এদের নিজস্ব ইচ্ছা বা চিন্তাশক্তি না থাকায় এরা ঘটনার ওপর কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। শুধু তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। আপনার পক্ষে এদের চিহ্নিত বা শনাক্ত করা অসম্ভব।
তোমরা তো বেশ সেয়ানা দেখছি। আমার পিছনে কাকে লেলিয়েছিলে? কুকুর না বেড়াল?
একটি নেড়ি কুকুর। আপনার আঠেরো বছর বয়সে একটি নেড়ি কুকুর আপনাকে সর্বদাই অনুসরণ করত।
বৈজ্ঞানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, হ্যাঁ, তার নাম ছিল ভুলু। আমি ভাবতাম কোনও রহস্যময় কারণে সে আমার প্রতি আসক্ত। তাই সর্বদাই পিছু পিছু ঘুরত। রাতে আমাদের বাইরের বারান্দায় শুয়েও থাকত। তবে তাকে কিছু খেতে দিলে খেত না।
সেই ভুলুই আমাদের যন্ত্রদূত।
বৈজ্ঞানিক হঠাৎ একটু লাল হলেন। যেন হঠাৎ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। ক্রোধের বদলে তার একটু একটু লজ্জা করতে লাগল।
বৃদ্ধ মানুষটি করজোড়েই দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ করতে করতে বললেন, পিতঃ, দুশ্চিন্তা করবেন না। আমরা বিস্তারিত বিবরণে যাব না। আপনি একজন মহান বৈজ্ঞানিক ও মহৎ মানুষ। তবু রক্তমাংসের মানুষ তো, প্রকৃতির নিয়মে, বয়োধর্মে চিত্তচাঞ্চল্য ঘটতেই পারে।
থামো, ডেঁপো ছোকরা। আমার মোটেই চিত্তচাঞ্চল্য ঘটেনি। ঘটেছিল বেতসীরই।
বৃদ্ধ মানুষটি বিনীতভাবে চুপ করে রইল।
বৈজ্ঞানিক ফের সলজ্জ মুখে বললেন, কথাটা বিশ্বাস হল না বুঝি?
আপনার সম্পর্কে আমাদের তথ্য অনুমাননির্ভর নয় পিতঃ, তথ্যনির্ভর।
বৈজ্ঞানিক খিঁচিয়ে উঠে বললেন, একটা নেড়ি কুকুরের সাক্ষ্যেই বুঝি কিছু প্রমাণ হয়?
পিতঃ, ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনি আদেশ করলে আমি রসনা সংযত করব।
ওহে বাপু, তোমরা হলে হাড়বজ্জাত, বাইরে ভিজেবেড়ালটি সেজে আছ, আর মনে মনে হাসছ সে আমি জানি।
জিব কেটে লোকটা বলে, না না পিতঃ, আমি হাসছি না।
লজ্জিত মুখে বৈজ্ঞানিক বললেন, ওই একবারই আমার পদস্খলন হয়েছিল।
ব্যথিত মুখে বৃদ্ধ লোকটি বলল, পদস্খলন বলছেন কেন পিতঃ?
বৈজ্ঞানিক দৃপ্ত স্বরে বললেন, পদস্খলন নয়! আমার মতো একজন চিন্তাশীল মানুষ কী করে যে মস্তিষ্কহীন নির্বোধ একটি কিশোরীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল আজও তা ভেবে পাই না।
মহাশয়, আমার স্পর্ধা ক্ষমা করবেন। বেতসী রায় অসহনীয় রূপসী ছিলেন। সেই রূপ অপ্সরাদের থাকে, দেবীদের থাকে। ওই রূপ অনেক বর্ম বেদ করতে পারে, নিরস্ত্র করতে পারে দুর্ধর্ষ বীরকে, তপোভঙ্গ করতে পারে ঋষিরও।
থামো, থামো, অকালপক্ক ছোকরা। রূপ! রূপের গভীরতা তত গাত্ৰচর্মের চেয়ে গভীর নয়। রূপের স্তাবকতা করে মূর্খেরা। সেই বয়সে আমি যে কেন রূপের ফঁদে পড়লাম কে জানে। আজও ভাবলে মনে বৃশ্চিক দংশন হয়।
