হতাশায় বৈজ্ঞানিক মাথা নাড়লেন। নিজের লম্বা চুল হাত দিয়ে সটান করলেন, দাড়ি আঁচড়ালেন আঙুল দিয়ে। তারপর ঘরময় পায়চারি করতে লাগলেন। তার অস্থির চটিজুতোর শব্দ চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে উদাস চক্ষে বৈজ্ঞানিক কিছুক্ষণ তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। ওই যে নক্ষত্রমণ্ডলী, ওইসব বস্তুপুঞ্জ যদি সরিয়ে নেওয়া যায় তা হলে এই অসীম অন্ধকার শূন্যতায় সময় বলে কিছু কল্পনা করা যায় কি? না, সেটা অসম্ভব। ওই স্থির পরিবর্তনশীল অন্ধকার পরিসরের কাছে সব ধারণাই মিথ্যে হয়ে যায়। দূরত্ব, সময়, গতি, বিবর্তন সব কিছু।
একটা শব্দ শুনে বৈজ্ঞানিক ফিরে দাঁড়ালেন। ঘরের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। বৃদ্ধ মানুষ, তার খালি গা, গলায় শুভ্র উপবীত, পরনে পরিষ্কার এক থান ধুতি, মস্তক মুণ্ডিত।
অবাক বৈজ্ঞানিক বললেন, আপনি কে? কী করে এ-ঘরে ঢুকলেন?
লোকটি সাষ্টাঙ্গে তাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বললেন, পিতা, আমার এবং আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন।
বৈজ্ঞানিক অপ্রস্তুত। প্রণাম-টনাম নেওয়ার অভ্যাস নেই তার। তার ওপর লোকটি যথেষ্ট বৃদ্ধ। তার চেয়েও অন্তত বিশ-পঁচিশ বছরের বড়। বাবার বয়সি মানুষের প্রণাম অস্বস্তিকর বইকী!
বৈজ্ঞানিক বললেন, প্রণাম করছেন কেন? আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আমারই তো আপনাকে প্রণাম করার কথা। তবে আমি প্রণামে বিশ্বাস করি না।
লোকটি শশব্যস্তে বলল, ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন! আপনি আমাদের পরম প্রণম্য। পরম শ্রদ্ধার পাত্র। পিতা, আপনার দর্শনলাভে আমি ধন্য।
বৈজ্ঞানিক বিরক্ত ও বিস্মিত। বললেন, আপনি আমাকে পিতা সম্বোধন করেছেন! আশ্চর্য! আপনিই তো আমার বাবার বয়সি!
লোকটি জিভ কেটে বলে, হিসাবমতো আপনি আমার চেয়ে একশো আশি বছরের বড়।
বৈজ্ঞানিকের বিস্ময়ে কথা সরল না। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, একশো আশি বছর! আপনি কি পাগল?
লোকটি মাথা নেড়ে বলে, না পিতা, আমি পাগল নই। আমি আপনার অধস্তন সপ্তম পুরুষ।
বৈজ্ঞানিক হাঁ করে চেয়ে রইলেন। ব্যাপারটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। কিন্তু তিনি বৈজ্ঞানিক। বৈজ্ঞানিকের মন সর্বদাই যুক্তিযুক্ত পথ ধরে চলে। তার মস্তিষ্কে হঠাৎ একটা উদ্ভাস ঘটল। তবে কি লোকটা তার আবিষ্কৃত ওই সময়-সুড়ঙ্গ ধরে এসে হাজির হয়েছে? তিনি কি তা হলে গবেষণায় সাফল্য লাভ করেছেন? আনন্দে বৈজ্ঞানিক নিজের লম্বা চুল মুঠোয় চেপে ধরে বললেন, তা হলে কি আপনি আমার যন্ত্রের ভিতর দিয়ে এলেন?
পিতা, আমাকে আপনি-আজ্ঞে করে বলবেন না। আমি আপনার প্রপৌত্রের পৌত্র।
ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বটেই বাছা, তুমি তো দুধের শিশু আমার কাছে। আমার গবেষণা তা হলে সফল!
লোকটির মুখ একটু ম্লান হল। হাতজোড় করে বলল, আপনার গবেষণা শতকরা একশো ভাগ সফল বলতে পারলে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু পিতা, ঘটনাটা তা নয়।
নয়?
না পিতা। আপনার গবেষণা সম্পূর্ণ সফল না হলেও ব্যর্থ হয়েছে এমন কথা বলা যায় না।
তার মানে কী বাছা?
আপনার গবেষণা সফল না হলেও চেষ্টা বৃথা যায়নি। অতীত বা ভবিষ্যৎকে বর্তমানে ফলিত করতে পারলেও আপনার বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
সেটা কী রকম?
আমাদের গবেষণাগারে সময় পাড়ি দেওয়ার যন্ত্রে আপনার নিরলস চেষ্টার একটা সংকেত পৌঁছেছে। আমরা বুঝতে পেরেছি অতীতের কেউ আমাদের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে।
তারপর?
আমরা–অর্থাৎ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকর্মীরা সময় নামক বাধা বা প্রাচীর অতিক্রম করার কৌশল জানতে পেরেছি। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে–অর্থাৎ অত্যন্ত প্রয়োজন না হলে আমরা কখনওই সময়কে অতিক্রম করার চেষ্টা করি না।
কেন করো না?
কাজটা বিপজ্জনক পিতা। অতীত বিপজ্জনক। পৃথিবীর অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একটি অতি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর পরিকল্পিত হয়ে আছে। তার সামান্য একটুখানি বিচ্যুতি ঘটালেই পুরো ছকটা ভীষণভাবে ওলটপালট হয়ে যাবে। সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে লহমায়। ইতিহাস মুছে যাবে।
বলো কী হে?
পিতা, আপনার অনুমান মিথ্যা নয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই গতি ও পরিবর্তন মাত্র। গীতার শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করুণ। মুখ ব্যাদান করে অর্জুনকে শ্রীভগবান বিশ্বরূপ প্রদর্শন করে বলেছিলেন, যা ঘটার তা ঘটেই আছে, তুমি কেবল নিমিত্তমাত্র হও, অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের মুখের গহ্বরে ভবিষ্যৎকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। অর্থাৎ ভবিষ্যৎও বর্তমানই, ঠিক তো? বর্তমান না হলে অর্জুন তা প্রত্যক্ষ করতে পারতেন না!
হ্যাঁ, বোধহয় ঠিক।
আপনার প্রজ্ঞা আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আপনার এই গবেষণা সম্পূর্ণ সফল না হলেও তা আমাদের গবেষণায় বিশেষ ইন্ধন সরবরাহ করেছে। বলতে গেলে এ ব্যাপারে আপনি আমাদের পথিকৃৎ।
বাপু হে, আদত কথাটা বলো। আমার টাইম মেশিন যদি সফল না হয়ে থাকে তা হলে তুমি এলে কী করে?
পিতা, ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনার মৃদু সংকেত আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ার পর আমরা অনেক পরামর্শ করে অবশেষে আমাদের যন্ত্রের সাহায্যে আপনার কাছে একজন প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই। আমি আপনার বংশধর বলে বিশেষজ্ঞরা আমাকেই আপনার কাছে পাঠিয়েছে।
ভ্রূ কুঁচকে বৈজ্ঞানিক ঘৃণাভরে বললেন, বংশধর! আমার বংশধর! কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? আমি তো বিয়েই করিনি! এবং করার কোনও ইচ্ছেও নেই। চিন্তাশীল এবং কর্মব্যস্ত লোকের পক্ষে মেয়েমানুষ এক মস্ত ঝঞ্জাট।
